খুচরা বিক্রেতাদের কর প্রত্যাহারের দাবি

আগামী অর্থবছরের বাজেটে প্রস্তাবিত করের ন্যায্যতা বিষয়ে গবেষণা সংস্থা সিপিডি আয়োজিত সংলাপে অতিথিরা। আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টার ইনেছবি: প্রথম আলো।

প্রস্তাবিত বাজেটে খুচরা বিক্রেতাদের পণ্য সরবরাহের ওপর দশমিক ২ শতাংশ হারে অগ্রিম কর আরোপ করা হয়েছে। এ নিয়মে প্রতি ১ হাজার টাকায় ২ টাকা অগ্রিম কর কেটে রাখা হবে। এই কর প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ী নেতারা।

ব্যবসায়ী নেতারা মনে করেন, দেশের অনানুষ্ঠানিক খাতের বিশাল অংশের খুচরা বিক্রেতাদের কোনো কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) বা ব্যবসা শনাক্তকরণ নম্বর (বিন) নেই। ফলে এই কর আদায় করতে গেলে বড় ধরনের জটিলতা তৈরি হবে।

ব্যবসায়ীরা আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় বাজেটে কর ন্যায্যতা বিষয়ে আয়োজিত এক সংলাপে এমন অভিমত দেন। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) রাজধানীর মহাখালীতে ব্র্যাক সেন্টার ইনে এ সংলাপ আয়োজন করে। এতে সহযোগিতা করেছে ক্রিশ্চিয়ান এইড।

অনুষ্ঠানে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর আরোপিত টার্নওভার কর ও অগ্রিম কর আদায়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন মেট্রো চেম্বারের সভাপতি কামরান টি রহমান। তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতির প্রায় ৮৫ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতের। এই বিপুলসংখ্যক খুচরা বিক্রেতার কোনো টিআইএন নেই। তাদের সঙ্গে পণ্য লেনদেনের সময় যদি শূন্য দশমিক ২ শতাংশ হারে অগ্রিম কর কেটে রাখা হয়, তবে কার নামে সেই টাকা জমা দেওয়া হবে—তা নিয়ে জটিলতা তৈরি হবে। বর্তমান ১ শতাংশ টার্নওভার করের পাশাপাশি এই বাড়তি অগ্রিম করের বোঝা আনুষ্ঠানিক খাতের করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত খরচের চাপ তৈরি করবে।

পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘তৈরি পোশাক রপ্তানির জন্য স্থানীয় বিক্রেতাদের কাছ থেকে বিভিন্ন জিনিস কেনা হয়। ওই পণ্য রপ্তানির সময় সরকার কর নিচ্ছে। তাহলে খুচরা বিক্রেতাদের ওপর আরোপিত শূন্য দশমিক ২ শতাংশ কর আমাদের (রপ্তানিকারক) থেকে কেন নেবে। আমরা কেন কর সংগ্রাহক হব? আমরা এ দায়িত্ব নিতে চাই না।’

এ ছাড়া ঠিকায় কাজের ওপরে করারোপের বিরোধিতা করে মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘যাদের কাজ থাকে না, শ্রমিকদের ধরে রাখার জন্য কোনো রকমে বেঁচে থাকার সংগ্রাম করে, তারা ঠিকায় কাজ (সাব-কন্ট্রাক্ট) করে। তাদের ওপর যদি ৫ বা ৩ শতাংশ কর চাপানো হয়, তবে কেউ আর ঠিকা কাজের তথ্য দেখাবে না, গোপন করবে। আমরা দাবি করেছিলাম, এটিকে মাত্র ১ শতাংশ হারে নিষ্পত্তি করা হোক।’

অন্যদিকে এনবিআরের কর নীতি সদস্য মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী বলেন, যাঁরা নিয়মিত কর দিচ্ছেন, তাঁদের ওপর যেন করের অতিরিক্ত চাপ না বাড়ে, সে জন্য কর ভিত্তি সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তার অংশ হিসেবে পণ্য সরবরাহকারী ও খুচরা বিক্রেতাদের কর ভিত্তির আওতায় নিয়ে আসা হচ্ছে, যা হাজারে মাত্র ২ টাকা। এই অঙ্ক এত কম যে এখান থেকে বড় কোনো কর আসবে এমন না। মূল উদ্দেশ্য হলো, সবাইকে একটি ব্যবস্থার মধ্যে যুক্ত করা।

‘অলাভজনক প্রতিষ্ঠানে কেন কর’

বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রির (বিসিআই) জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি প্রীতি চক্রবর্তী বলেন, অতীতে মেডিকেল কলেজগুলোর ওপর ১৫ শতাংশ কর ছিল। প্রস্তাবিত বাজেটে তা কমিয়ে ১০ শতাংশ করায় কিছুটা স্বস্তি এসেছে। তিনি অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের ওপর কর চাপানো নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। বলেন, এসব প্রতিষ্ঠান ব্যাংক থেকে কোনো ঋণ পায় না। অথচ তাদের ওপর করের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা অত্যন্ত অন্যায্য।

এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেসের পরিচালক স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলেন, ব্যক্তিগত আয়করের ক্ষেত্রে ৫ শতাংশের স্ল্যাবটি ফিরিয়ে আনা খুবই প্রয়োজন ছিল। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত করদাতাদের জন্য এটি স্বস্তিদায়ক হতো। দেশে করপোরেট কর হার একসময় ধাপে ধাপে কমিয়ে ২৫ শতাংশে আনা হয়েছিল, যা এখন আবার বেড়ে সাড়ে ২৭ শতাংশে ঠেকেছে। কার্যকর করহার হিসাব করলে এটি আরও অনেক বেশি হয়। এত উচ্চ করহারের কারণে দেশে মূলধন পাচারের ঝুঁকি বাড়ে, যা কর্মসংস্থান ও নতুন বিনিয়োগের জন্য বড় বাধা।

করের সুফল যেন সাধারণ মানুষ পায় এবং করদাতারা যাতে হয়রানির শিকার না হন, সে জন্য উপজেলা পর্যায়ে ‘ট্যাক্স ক্যাম্প’ বা কর মেলা আয়োজনের পরামর্শ দেন এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদ।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতের উন্নয়নে নতুন বাজেটে ঋণের সহজলভ্যতার কোনো কার্যকর পরিবর্তন দেখা যায়নি বলে মন্তব্য করেন ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি রিজওয়ান রাহমান।

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।