সিইপিএ সইয়ে দুই দেশ একমত
কোরিয়ায় ৮ হাজার ৪২৮টি পণ্য শুল্কমুক্ত রপ্তানির সুযোগ তৈরি হচ্ছে
চুক্তি করার ব্যাপারে উভয় দেশ একমত। তবে দিনক্ষণ ঠিক হয়নি। আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং ও মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর চুক্তি হবে।
এক বছরের কম সময়েই বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (সিইপিএ) করা নিয়ে দর-কষাকষি আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়েছে। চুক্তি সই হবে আরও পরে। যেদিন চুক্তি কার্যকর হবে সেদিন থেকে বাংলাদেশের ৮ হাজার ৪২৮টি তথা ৯৭ শতাংশ পণ্যই দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে। অন্যদিকে বাংলাদেশের বাজারে একই ধরনের প্রবেশাধিকার পাবে দক্ষিণ কোরিয়ার ৮৭ শতাংশ অর্থাৎ ১ হাজার ৫৪টি পণ্য।
ঢাকায় সচিবালয়ে আজ মঙ্গলবার এক ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশের বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির এবং দক্ষিণ কোরিয়ার বাণিজ্যমন্ত্রী হান-কু ইয়েও এক যৌথ ঘোষণায় এ তথ্য জানান। এ সময় বাণিজ্যসচিব মো. আতাউর রহমান খান, অতিরিক্ত বাণিজ্যসচিব আয়েশা আক্তার, দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধান দর-কষাকষিকারী পার্ক গিউন-ওহ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেন, বর্তমান সরকার মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতিগুলোর একটির সঙ্গে এ ধরনের একটি উচ্চমানের সিইপিএ করার দর-কষাকষি শেষ করতে পেরেছে। চুক্তি হওয়ার পর বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, জুতা, ওষুধ, হিমায়িত খাদ্য, সিরামিক পণ্য, হোম টেক্সটাইলসহ বিভিন্ন পণ্য দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে প্রতিযোগিতামূলকভাবে প্রবেশ করতে পারবে। দক্ষিণ কোরিয়া থেকেও বাংলাদেশে আমদানি হবে শিল্প যন্ত্রপাতি, লোহা ও ইস্পাত, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, প্লাস্টিক, রাসায়নিক, কাগজজাতসহ নানা পণ্য।
বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতির আবার এক ট্রিলিয়ন (এক লাখ কোটি) মার্কিন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। সে লক্ষ্য অর্জনে উচ্চ প্রবৃদ্ধি, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সিইপিএ।
দক্ষিণ কোরিয়ার বাণিজ্যমন্ত্রী হান-কু ইয়েও বলেন, বাংলাদেশ ও কোরিয়ার অর্থনৈতিক সম্পর্কের ইতিহাস ৫৬ বছরের। এত দিন সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দু ছিল মূলত বস্ত্র খাত। এখন সময় এসেছে সম্পর্ককে প্রযুক্তি, সরবরাহ ব্যবস্থা, শিল্প সহযোগিতা ও বিনিয়োগের মতো নতুন খাতে সম্প্রসারণের। তিনি বলেন, সিইপিএ কার্যকর হলে কোরীয় কোম্পানিগুলোর বাংলাদেশে বিনিয়োগের আগ্রহ আরও বাড়বে।
— দক্ষিণ কোরিয়া ১ হাজার ৫৪টি বা ৮৭% পণ্য বাংলাদেশে শুল্কমুক্ত রপ্তানি করতে পারবে। — বাংলাদেশ ১১১টি উপখাতে ও দক্ষিণ কোরিয়া ৯৫টি উপখাতে সেবা বাণিজ্যের সুযোগ পাবে।
পণ্য বাণিজ্যের পাশাপাশি সেবা খাতেও দুই দেশ উল্লেখযোগ্য বাজার উন্মুক্ত করতে সম্মত হয়েছে বলে ব্রিফিংয়ে জানানো হয়। বাংলাদেশ কোরিয়ার জন্য ৯৫টি উপখাত উন্মুক্ত করবে। বিপরীতে দক্ষিণ কোরিয়া বাংলাদেশের জন্য সেবা বাণিজ্যের সুযোগ দেবে ১১১টি উপখাতে। এতে প্রযুক্তি স্থানান্তর, দক্ষ জনশক্তির অংশগ্রহণ এবং বিনিয়োগ সহযোগিতা আরও জোরদার হবে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ১৩৯ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি। এর মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ায় ৪৯ কোটি ১৭ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ। অন্যদিকে সে দেশ থেকে বাংলাদেশ আমদানি করে ৯০ কোটি ডলারের পণ্য। অর্থাৎ বাংলাদেশ ৪১ কোটি ডলারের বাণিজ্যঘাটতির মুখে রয়েছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী আবদুল মুক্তাদির বলেন, স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের প্রাক্কালে বৈশ্বিক বাণিজ্য সক্ষমতা ধরে রাখতে এ চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।
দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সিইপিএ করার প্রথম আলোচনা অনুষ্ঠিত হয় ২০২৫ সালের ২২ থেকে ২৭ আগস্ট সে দেশের রাজধানী সিউলে। বাংলাদেশে দুই দফা ও দক্ষিণ কোরিয়ায় তিন দফা আলোচনা এবং অনলাইনেও প্রায় ৪০টি বৈঠক শেষে উভয় দেশ সিইপিএ করার দিকে এগোচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা ভালো নয়। ওই চুক্তিতে ‘বাংলাদেশ শ্যাল’ এসেছে ১৩১ বার আর ‘ইউএস শ্যাল’ আছে ৬ বার, অর্থাৎ চুক্তিটি বাংলাদেশের স্বার্থের প্রতিকূলে। সে জন্য বাংলাদেশের দর-কষাকষিকারীদের দক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন আছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সিইপিএ করতে এত তাড়াহুড়া কেন, এমন প্রশ্নের জবাবে আবদুল মুক্তাদির বলেন, ‘আমরা দিন-রাত পরিশ্রম করে দুই বছরের কাজ ছয় মাসে করেছি। চুক্তিটি গোপনীয় হবে না। চুক্তিটি যে ভালো হচ্ছে, উন্মুক্ত হওয়ার পরই সবাই তা বুঝতে পারবেন।’
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘উভয় দেশের সিইপিএ কবে হবে, তা এখনো ঠিক হয়নি। চুক্তি সইয়ের আগে উভয় দেশই আইনগত দিক যাচাই করবে। বাংলাদেশের কথা যদি বলি, আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষে তা যাবে মন্ত্রিসভায়। চুক্তি হবে মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর।’