সর্বনিম্ন রাজস্ব আয় কেন

অর্থ মন্ত্রণালয়ের মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি বিবৃতি অনুযায়ী, বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত মাত্র ১০ দশমিক ৯ শতাংশ। এর চেয়ে কম আয় কেবল শ্রীলঙ্কার—৮ দশমিক ৯ শতাংশ। অথচ নেপালে এই হার ২৪ দশমিক ২ শতাংশ, ভারতে প্রায় ২০ শতাংশ, এমনকি মিয়ানমারের কর–জিডিপি অনুপাত প্রায় সাড়ে ১৬ শতাংশ। তবে ইউরোপের দেশগুলোতে গড়ে এই হার ৪৭ শতাংশ। 

বাংলাদেশের মানুষ কর দেন কম। কর ফাঁকির পরিমাণ অনেক বেশি। কর ফাঁকির টাকা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেশে থাকে না, পাচার হয়ে যায়। প্রভাবশালীদের কর ফাঁকি বন্ধে সরকারের পদক্ষেপ নেই বলা যায়। বরং বারবার কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়ার মাধ্যমে সরকার কর ফাঁকিকে একপ্রকার উৎসাহ দিয়েই আসছে। এ ছাড়া রয়েছে নানা ধরনের কর–ছাড়। সরকারি হিসাবেই বাংলাদেশ যত পণ্য আমদানি করে, তার ৪৪ শতাংশ থেকেই কোনো আমদানি শুল্ক পায় না। এসব ক্ষেত্রে শুল্ক ছাড় দেওয়া আছে। পাশাপাশি গবেষণায় দেখা গেছে, আমদানি-রপ্তানির মাধ্যমেই বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি অর্থ পাচার হয়। সব মিলিয়ে একদিকে বাংলাদেশ রাজস্ব আদায় করতে পারছে না, অন্যদিকে রাজস্ব ফাঁকিও ঠেকাতে পারছে না।

সরকারের ব্যয়ও সর্বনিম্ন

সরকারের আয় যেমন কম, ব্যয়ও তেমনি কম। অর্থ মন্ত্রণালয় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের সরকারি ব্যয় হচ্ছে জিডিপির মাত্র ১৩ শতাংশ। ভারতে এই হার ২৮ দশমিক ৮ শতাংশ, ভিয়েতনামে ২০ দশমিক ৪ শতাংশ, মালয়েশিয়ায় ২২ দশমিক ৩ শতাংশ, যুক্তরাষ্ট্রে এই ব্যয় ৩৬ দশমিক ৮ শতাংশ, সুইডেনে ৪৯ দশমিক ৪ শতাংশ আর ফ্রান্সের সরকারি ব্যয় জিডিপির তুলনায় ৫৭ শতাংশ। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, সরকারের পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষের জন্য বিপুল ব্যয়ের কথা বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে তা অনেক কম। আবার প্রতি অর্থবছরে সরকার যা ব্যয় করে, তার বড় অংশই পরিচালন ব্যয়। সরকারি খাতে বেতন, ভাতা, পেনশন, সুদ পরিশোধ, সাহায্য ও মঞ্জুরি এবং ভর্তুকিতেই প্রায় সব অর্থ খরচ করা হয়। বাকি অর্থ ব্যয় হয় উন্নয়ন প্রকল্পে।

সরকারের এই ব্যয়ের গুণগত মান নিয়েও আছে নানা প্রশ্ন। অপচয় ও আত্মসাতেরও আছে অনেক অভিযোগ। উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয়ও দফায় দফায় বাড়ানো হয়। আরও আছে অন্য দেশের তুলনায় বেশি ব্যয়ে অবকাঠামো নির্মাণ। কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের সংখ্যাও অনেক। সব মিলিয়ে সরকারি ব্যয় নিয়েও আছে নানা প্রশ্ন। একদিকে সরকারের ব্যয়ের ক্ষমতা কম, তার ওপর আছে অপচয়ের অভিযোগ। 

সরকারি ব্যয়ের একটি বড় অংশ ব্যয় হয় ভর্তুকি খাতে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে সরকার ভর্তুকি খাতে বরাদ্দ রেখেছিল প্রায় ৮৩ হাজার কোটি টাকা। ভর্তুকির বড় খাত হচ্ছে কৃষি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত। সার কৃষি খাতের ভর্তুকির অংশ। আবার বিদ্যুৎ, কৃষি উপকরণ, উন্নত মানের বীজ কিনতেও কৃষকদের ভর্তুকি দেওয়া হয়। বিদ্যুৎ খাতের মধ্যে আছে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং জ্বালানি খাতের মধ্যে আছে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি। এ ছাড়া প্রণোদনা দেওয়া হয় পাট ও পোশাক রপ্তানি খাত এবং দেশে প্রবাসী আয়ে। চলতি অর্থবছরে এরই মধ্যে এসব খাত থেকে ভর্তুকির চাহিদা দ্বিগুণ হয়ে গেছে। একদিকে বিশ্ববাজারে এসব পণ্যের দাম বেড়ে গেছে, অন্যদিকে ডলারের দাম ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ায় আমদানি খরচ অনেক বেশি বেড়ে গেছে। ফলে সরকার পড়ে গেছে বিপাকে। 

ডলারের মূল্যবৃদ্ধি এবং ইউক্রেনের ওপর রাশিয়ার হামলার কারণে অর্থনৈতিক সংকট বেড়েছে বিশ্বের প্রায় সব দেশেরই। বিশেষ করে জ্বালানিনিরাপত্তা নিয়ে সংকট প্রায় সবার। উন্নত অনেক দেশই জ্বালানি ও পরিবহন খাতে ভর্তুকি দিচ্ছে। সাধারণ মানুষের ওপর চাপ যাতে না বাড়ে, সে কারণে ব্যয়ের একটি অংশ সরকার নিজেই বহন করছে। কিন্তু আর্থিক সামর্থ্যের অভাবে বাংলাদেশ তা–ও করত পারছে না। আবার সরকার জ্বালানি নিরাপত্তাকেও খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি। আমদানিনির্ভর করে রেখেছে এই খাতকে। এর দায়ও বহন করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।

চাপ বাড়ছে মানুষের 

সদ্য বিদায়ী ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ শতাংশ, যা গত ৪০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যবস্থা ফেডারেল রিজার্ভ (ফেড) আগ্রাসীভাবে নীতি সুদহার বাড়িয়েছে। এতে বছরের শেষের দিকে মূল্যস্ফীতি কমে এলেও অর্থনীতিতে মন্দার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বলছে, ২০২৩ সালে বিশ্ব অর্থনীতির গড় প্রবৃদ্ধি (মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি) ২ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে আসবে। পরিস্থিতি খারাপ হলে ২ শতাংশের নিচেও চলে আসতে পারে। তারপরও বিশ্ব অর্থনীতি এখন মন্দা বরণ করে নিতেও প্রস্তুত, কিন্তু মূল্যস্ফীতিকে কিছুতেই মানা হবে না বলে বিভিন্ন দেশ নীতি নিয়েছে। 

কিন্তু বাংলাদেশের নীতি যেন ঠিক উল্টো। এখানে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং বাড়ানোর সব আয়োজনই করা হচ্ছে। আর এ কাজ করছে সরকার নিজেই। এর সর্বশেষ উদাহরণ হচ্ছে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়ানো। তা-ও করা হয়েছে সরকারের নির্বাহী আদেশে, তড়িঘড়ি করে। এর আগে বেড়েছে জ্বালানির দাম। এসবই হচ্ছে মূল্যস্ফীতি আরেক দফা বাড়ানোর প্রধান প্রধান হাতিয়ার। 

গত বছরের আগস্টে সরকার হঠাৎ করে জ্বালানি তেলের দাম ৪২ থেকে ৫১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দিয়েছিল। এর প্রভাবে জুলাই মাসে দেশের যে মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ, সেপ্টেম্বরে তা বৃদ্ধি পেয়ে হয় ৯ দশমিক ১০ শতাংশ। এরপর অবশ্য বিবিএস মূল্যস্ফীতি ক্রমেই কমিয়ে নানা রকম বাহবা নিচ্ছে। যদিও কমেছে খুবই সামান্য।

যেমন ১৭ জানুয়ারি একনেকের বৈঠকে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করেছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়। সেখানে বলা হয়েছে, ‘আমরা সবাই জানি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ববাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছে, যার ফলে সারা বিশ্বে এবং আমাদের দেশে অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে মূল্যস্ফীতি বেশ বেড়ে গেছে। তবে আমরা এই দোলাচল ভালোভাবেই সামাল দিয়েছি বলে প্রতীয়মান হয়। সামষ্টিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ সূচক মূল্যস্ফীতি নভেম্বর মাসের ৮.৮৫% থেকে কমে ডিসেম্বরে ৮.৭১% এ নেমেছে। বিগত বছরের আগস্ট থেকে টানা পাঁচ মাস মূল্যস্ফীতির নিম্নমুখিতা বিশেষভাবে লক্ষণীয়।’ 

মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১০ শতাংশ। সেখান থেকে কমে হয়েছে ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। কমেছে মাত্র দশমিক ৩৯ শতাংশীয় পয়েন্ট। তাতেই সরকারি ভাষ্যে বাংলাদেশ মূল্যস্ফীতির চাপ ‘ভালোভাবেই সামাল’ দিয়েছে। অথচ যুক্তরাষ্ট্র একই সময়ে মূল্যস্ফীতি প্রায় ৯ শতাংশ থেকে কমিয়ে (আগের বছরের একই সময়ের তুলনায়) সাড়ে ৬ শতাংশে নামিয়ে এনেও বলছে, সংকট কাটেনি। সুতরাং মূল্যস্ফীতি কমাতে তারা আগ্রাসী মনোভাবই বজায় রাখবে। 

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, টানা পাঁচ মাস ধরে মূল্যস্ফীতি কমানোর বিশাল এই সাফল্য ধরে রাখা যাবে কতটা। কেননা, ১২ জানুয়ারি বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয় ৫ শতাংশ। আর ১৮ জানুয়ারি গ্যাসের দাম বেড়েছে রেকর্ড পরিমাণে। বিশেষ করে শিল্প খাতে ব্যবহার করা হয়, এমন গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে ৮৮ থেকে ১৭৮ শতাংশ পর্যন্ত। এর বড় প্রভাব পড়বে শিল্প খাতে, উৎপাদন ব্যয়ে। উৎপাদন খরচ বাড়লে এর প্রভাব পড়বে উৎপাদন ব্যয়ে। পণ্যমূল্য বৃদ্ধি মানেই নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপ। সুতরাং ধরেই নেওয়া যায় সীমিত আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ওপর আরেকটি চাপ আসছে। 

মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়বে

চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের জন্য সরকারের মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য সাড়ে ৬ শতাংশ। অন্যদিকে গত অক্টোবরে আইএমএফেরও প্রাক্কলন ছিল ২০২৩ সালে বিশ্বে গড় মূল্যস্ফীতি আগের বছরের ৮ দশমিক ৮ শতাংশ কমে হবে সাড়ে ৬ শতাংশ, আর ২০২৪ সালে আরও কমে হবে ৪ দশমিক ১ শতাংশ। কিন্তু সরকার যেভাবে বিদ্যুৎ, তেল ও গ্যাসের দাম বাড়াচ্ছে, তাতে এই লক্ষ্যমাত্রা বাংলাদেশের পক্ষে বাস্তবে কি অর্জন করা যাবে—এটাই এখন বড় প্রশ্ন। 

সবশেষে ১৫ জানুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন বছরের নতুন মুদ্রানীতির ঘোষণা দিয়েছে। সেখানে নীতি সুদহার বা রেপো হার সামান্য বাড়ালেও তার প্রভাব পড়বে না শিল্প ঋণের ক্ষেত্রে। কেননা, সুদহার আগের মতোই ৯ শতাংশ রাখা হয়েছে। মুদ্রা সরবরাহের লক্ষ্যও বাড়ানো হয়েছে। আবার আমানত কমে যাওয়ায় সরকার টাকা ছাপিয়ে মুদ্রা সরবরাহ ঠিক রাখতে চাইলে তাতেও বাড়বে মূল্যস্ফীতি। সুতরাং বলা যায়, মূল্যস্ফীতি বাড়ানোর সব আয়োজনই সরকার একের পর এক করে রাখছে। 

আইএমএফ বনাম অর্থ পাচার

আইএমএফের ৪৫০ কোটি ডলারের ঋণ চূড়ান্ত অনুমোদন হতে পারে ৩০ জুন। তারপরই আনুষ্ঠানিকভাবে আইএমএফের দেওয়া শর্তের কথা জানা যাবে। তবে আলোচনা পর্যায়ে ভর্তুকি কমানো, রাজস্ব আয় বৃদ্ধি, আর্থিক খাতের সংস্কার, খেলাপি ঋণ হ্রাস, বেসরকারি ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার বিষয়গুলো উঠে এসেছে। এর মধ্যে কেবল ভর্তুকি কমানোর পদক্ষেপই সরকার জোরেশোরে বাস্তবায়ন করছে। প্রশ্ন হচ্ছে, সরকার সাধারণ মানুষের ওপর যেভাবে চাপ বাড়াচ্ছে, একই ধরনের চাপ সেই সব প্রভাবশালীর ওপর দিতে পারবে কি না। বিশেষ করে যাঁরা ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি, কর ফাঁকি দেন নিয়মিত, অর্থ পাচার করে বাড়ি কিনেছেন দুবাই, লন্ডন বা নিউইয়র্কে, একচেটিয়া মালিকানা ধরে রেখেছেন বেসরকারি ব্যাংক খাতে কিংবা বেনামে ঋণ নিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করে বহাল তবিয়তে আছেন। সংশয় এখানেই। 

দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ এ নিয়ে প্রথম আলোকে বলেন, আইএমএফের কাছ থেকে সাহায্য নেওয়ার একটা সুবিধা হলো এর মাধ্যমে আর্থিক খাতের নিয়মানুবর্তিতা বাধ্যতামূলকভাবে গ্রহণ করা যায়। অতীতেও আমরা এভাবে অনেকগুলো প্রয়োজনীয় সংস্কার করেছি, যেগুলো নিজেরা করতে গেলে রাজনৈতিক বিরোধিতা আসে, কিন্তু আইএমএফের বরাত দিয়ে এগুলো করা অনেক সোজা। যদিও আইএমএফের অধিকাংশ পরামর্শ নিজেদেরই করা উচিত ছিল। এখন আইএমএফের বরাত দিয়ে যদি তা করা যায়, উপরি কিছু অর্থও যদি পাওয়া যায়, সেটা আমাদের জন্য ভালো। কিন্তু অর্থের দিক থেকে, পুঁজি পাচারের কারণে যে রক্তক্ষরণ হচ্ছে, সেটা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যদি বিদেশে পুঁজি পাচার বন্ধ করতে পারতাম, তাহলে সেই অর্থ আসলে আইএমএফের দেওয়া ঋণের তুলনায় তেমন কিছুই না।