ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা আগামী ১ জানুয়ারি, প্রস্তুতি শুরু

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)
প্রথম আলোকে নির্ভরযোগ্য সূত্র হিসেবে পেতে হলেএখানে ক্লিক করুন

আগামী ১ জানুয়ারি শুরু হতে যাচ্ছে ৩১তম ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা (ডিআইটিএফ)। ১৯৯৫ সাল থেকে ডিআইটিএফ আয়োজিত হচ্ছে। দীর্ঘদিন আগারগাঁওয়ে এই মেলা আয়োজন করা হলেও ২০২২ সাল থেকে তা নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জের পূর্বাচলে যৌথভাবে আয়োজন করে আসছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)।

এবার ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি বাংলাদেশ-চায়না ফ্রেন্ডশিপ এক্সিবিশন সেন্টারে প্রধান অতিথি হিসেবে এ মেলার উদ্বোধন করবেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। আর বিশেষ অতিথি থাকবেন বাণিজ্যসচিব শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরী এবং বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) প্রশাসক মো. ফজলুল হক। ইপিবি সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

মাসব্যাপী এবারের মেলা আয়োজনের জন্য গত ২৯ অক্টোবর ছয়টি খাতে পণ্য সরবরাহ, বিভিন্ন সেবা ও অবকাঠামোগত কাজের দরপত্র আহ্বান করেছে ইপিবি। এসব কাজের মধ্যে রয়েছে মেলার অবকাঠামো নির্মাণ, সাজসজ্জা, নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা ও প্রচার-প্রচারণা।

দরপত্র বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী গত মঙ্গলবার থেকে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে দরপত্র নেওয়া শুরু করেছে ইপিবি। দরপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময় ১৭ নভেম্বর বিকেল চারটা। ১৮ নভেম্বর বেলা ১১টায় দরদাতাদের উপস্থিতিতে দরপত্র খোলা হবে।

ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাসান আরিফ গতকাল বুধবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘এবারের মেলায় বিদেশিদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধিতে বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোর সঙ্গে আমরা জুম প্ল্যাটফর্মে বৈঠক করেছি। চিঠিও দিয়েছি তাদের। এবার বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর ভালো সাড়া পড়বে বলে আমরা বিশ্বাস করি।’

প্রতিবছর বাণিজ্য মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে একটি পণ্যকে ‘বর্ষপণ্য’ বা ‘প্রোডাক্ট অব দ্য ইয়ার’ ঘোষণা করা হয়। ২০২৬ সালের জন্য পেপার অ্যান্ড প্যাকেজিং ছিল বর্ষপণ্য। এবারের বর্ষপণ্য ঠিক করা হয়েছে কি না, তা জানতে চাইলে ইপিবি ভাইস চেয়ারম্যান বলেন, এখনো না। তবে কাজ চলছে।

ছয়টি ভাগে মেলার কাজ

ছয়টি লটে মেলার বিভিন্ন কাজ ভাগ করা হয়েছে। প্রথম লটে রয়েছে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আয়োজন ও সংশ্লিষ্ট সরবরাহের কাজ। এর মধ্যে আমন্ত্রণপত্র, স্মারকগ্রন্থ, গাড়ির স্টিকার, ভিআইপি ও সাধারণ পাস, ফোল্ডার, লেটারহেডসহ বিভিন্ন সামগ্রীর নকশা, মুদ্রণ ও সরবরাহ করার কাজ রয়েছে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠান উপলক্ষে বাংলাদেশ সচিবালয়সহ রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থান, সড়ক, সড়কদ্বীপ, চত্বর ও ফুটওভারব্রিজে সাজসজ্জা ও প্রচারসামগ্রী স্থাপন করতে হবে। বাংলাদেশ-চায়না ফ্রেন্ডশিপ এক্সিবিশন সেন্টারে (বিসিএফইসি) উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মঞ্চ, আসনব্যবস্থা, আলোকসজ্জা, সাজসজ্জা, স্থিরচিত্র ও ভিডিও ধারণের কাজও এ লটের অন্তর্ভুক্ত। দেশি-বিদেশি অতিথিদের জন্য উপহারসামগ্রী সরবরাহের কাজও রয়েছে।

দ্বিতীয় লটে রয়েছে মেলার মূল অবকাঠামো নির্মাণ ও সাজসজ্জার কাজ। এর মধ্যে প্রদর্শনী হলের ভেতরে ও বাইরে স্টল, প্যাভিলিয়ন, খাবারের দোকান, বিভিন্ন বুথ এবং অস্থায়ী নামাজের স্থান নির্মাণ করা হবে। এ ছাড়া মেলা সচিবালয়ের সাজসজ্জা, টেবিল-চেয়ার সরবরাহ এবং সীমানাপ্রাচীরের টিন দিয়ে আবৃত করার কাজ রয়েছে।

বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের প্রচার এবং ইপিবির কার্যক্রম তুলে ধরতে একটি প্রদর্শনী স্থাপনা নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে দ্বিতীয় লটে। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে আহত ও শহীদদের স্মরণে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ গ্যালারি বা প্যাভিলিয়ন নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি জ্যেষ্ঠ নাগরিকদের বসার জায়গা, কফি কর্নার ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। মেলার প্রধান ও ভিআইপি ফটক নির্মাণ এবং পুরো প্রাঙ্গণের সৌন্দর্যবর্ধন ও আলোকসজ্জার কাজও এ লটের আওতায় থাকবে।

তৃতীয় লটে রয়েছে মেলা চলাকালে প্রদর্শনী হল, টয়লেট, উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ, সামনের সড়ক ও গাড়ি পার্কিং এলাকার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা। আবর্জনা সংগ্রহ ও অপসারণের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় বর্জ্যের ঝুড়ি সরবরাহ করতে হবে।

চতুর্থ লটে মেলার প্রচারের জন্য প্রামাণ্যচিত্র, প্রচারমূলক ভিডিও, টেলিভিশন বিজ্ঞাপন ও অন্যান্য ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি এবং সরবরাহের কাজ রাখা হয়েছে। ফেসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম, এক্স, লিংকডইনসহ বিভিন্ন মাধ্যমে অর্থের বিনিময়ে প্রচার চালাতে হবে। প্রচারের ফলাফলের পাশাপাশি পরিসংখ্যানও ইপিবিকে দিতে হবে।

পঞ্চম লটে রয়েছে মেলার সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কাজ। এ জন্য প্রশিক্ষিত বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ, সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন ও পরিচালনা, আর্চওয়ে ও হাতে বহনযোগ্য ধাতব বস্তু শনাক্তকরণ যন্ত্র স্থাপন এবং যানবাহন তল্লাশির সরঞ্জাম সরবরাহ করতে হবে।

ষষ্ঠ লটে রয়েছে সমাপনী অনুষ্ঠান আয়োজনের কাজ। এর মধ্যে রয়েছে মঞ্চ নির্মাণ, আলোকসজ্জা, শব্দব্যবস্থা, এলইডি পর্দা, ছবি ও ভিডিও ধারণ, আমন্ত্রণপত্র তৈরি এবং সেরা প্যাভিলিয়ন, স্টল ও রেস্তোরাঁর জন্য ট্রফি ও সনদ সরবরাহের কাজ।

ইপিবির বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, প্রতিটি লটের জন্য আলাদা দরপত্র জমা দিতে হবে। দরপত্রের কাগজপত্র ইপিবির প্রশাসন শাখা, টিসিবি ভবন, কাওরান বাজার থেকে সংগ্রহ করা যাবে। প্রতিটি লটের দরপত্র দলিলের মূল্য এক হাজার টাকা, যা ফেরতযোগ্য নয়। দরপত্র জমা দেওয়ার ঠিকানা ইপিবির প্রশাসন শাখা। আরও বলা হয়, কর্তৃপক্ষ কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই যেকোনো দরপত্র বা সব দরপত্র বাতিল করতে পারবে।

মেলা থেকে ‘ঢাকা’ বাদ দেওয়ার উদ্যোগ ছিল

২০২৫ সালের ১৮ আগস্ট অনুষ্ঠিত ইপিবির ১৪৮তম পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে ডিআইটিএফের নাম বদলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের তৎকালীন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল এ বছর থেকে ডিআইটিএফের নাম হবে ঢাকা বাণিজ্য মেলা (ডিটিএফ)। অর্থাৎ মেলার নাম থেকে ‘আন্তর্জাতিক’ শব্দটি বাদ যাবে।

ডিআইটিএফের নাম পরিবর্তনের বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় তখন সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়েছিল, দেশি-বিদেশি ক্রেতা-বিক্রেতা নিয়ে ডিআইটিএফ আয়োজনের লক্ষ্য ছিল বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সরাসরি অংশগ্রহণের মাধ্যমে গুণগত মানসম্পন্ন পণ্য ও প্রযুক্তি প্রদর্শন এবং স্থানীয় বাজারের সঙ্গে তাদের পরিচিত করানো।

আরও বলা হয়েছিল, অনেক বিদেশি প্রতিষ্ঠান দূতাবাস বা সরকারি প্রতিনিধিদলের মাধ্যমে অংশগ্রহণ না করে স্থানীয় এজেন্ট বা ব্যক্তির মাধ্যমে অংশ নিচ্ছে। ফলে পণ্য ও সেবার মান যাচাই করা যাচ্ছে না। অনেক সময় মানহীন বা স্থানীয়ভাবে বিদেশি ব্র্যান্ড নামেও উপস্থাপন করা হচ্ছে। বিদেশি ব্র্যান্ড বা উৎপাদকেরা সরাসরি না থাকায় ক্রেতারা প্রতারিত হচ্ছেন এবং প্রদর্শনীর আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। তবে অন্তর্বর্তী সরকারই পরে সরকার এমন সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ হচ্ছে ডিআইটিএফে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ কম থাকে, বিদেশি ক্রেতা ও আমদানিকারকদের উপস্থিতি প্রত্যাশিত পর্যায়ে থাকে না। এ ছাড়া একই ধরনের পণ্যের অসংখ্য স্টল থাকে এবং নতুন পণ্য ও উদ্ভাবনী পণ্যের প্রদর্শনী থাকে কম। এ মেলা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিবর্তে বরং স্থানীয় কেনাবেচার কেন্দ্রে পরিণত হয়।

বাংলাদেশ তৈরি পোশাক উৎপাদক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান প্রথম আলোকে বলেন, ডিআইটিএফ নামেই আন্তর্জাতিক। এখানে প্রতিবছর অনেক স্টল বসে, মানুষ কেনাকাটা করে। বলা যায়, এ মেলা অনেকটা সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে। ফলে চলতে থাকুক।

ডিআইটিএফ নিয়ে কোনো পরামর্শ আছে কি না, তা জানতে চাইলে বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, ‘এ মেলা থেকে সামান্য যেসব রপ্তানি আদেশ আসে, তা থেকে রপ্তানি কতটুকু হয় চিন্তার বিষয়। দায়িত্বে থাকলে মেলাটিকে আন্তর্জাতিক রূপ দিতে বৈচিত্র্যপূর্ণ রপ্তানি পণ্য উৎপাদকদের বিনা মূল্যে এখানে বসতে দিতাম।’