বাজেটের লক্ষ্যমাত্রা আরও বাস্তবসম্মত হওয়া উচিত: ফাহমিদা খাতুন  

ফাহমিদা খাতুন, নির্বাহী পরিচালক, সিপিডি

প্রস্তাবিত বাজেটে যেসব লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে, তা আরও বাস্তবসম্মত হওয়া প্রয়োজন ছিল বলে মনে করে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। কারণ হিসেবে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবতসম্মত না হলে পূরণ করা যায় না। বাজেটের শৃঙ্খলা বিনষ্ট হয়।

এ বিষয়ে দুটি উদাহরণ দেন ফাহমিদা খাতুন। যেমন রাজস্ব আদায়; প্রতিবছরই উচ্চ রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়, কিন্তু তা অর্জন করা সম্ভব হয় না। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে রাজস্ব আহরণ হয়েছে লক্ষ্যমাত্রার অনেক কম, এখন লক্ষ্যমাত্রা পূরণে বাকি তিন মাসে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব সংগ্রহ করতে হবে। আগামী অর্থবছরের যে লক্ষ্যমাত্রা, তাতে ৭ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। এই লক্ষ্যমাত্রা কিন্তু প্রকৃত আহরণের ওপর প্রবৃদ্ধি নয়; সেটা হলে প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে আরও অনেক বেশি।

আজ বৃহস্পতিবার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের প্রতিক্রিয়ায় এসব কথা বলেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন।

রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হলে রাজস্ব ও মুদ্রা নীতির মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। ফাহমিদা খাতুন বলেন, তখন সরকারকে অন্য উৎস, বিশেষ করে ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হবে। এর প্রভাব পড়বে মূল্যস্ফীতিতে।

রপ্তানির ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে ২ দশমিক ০২ শতাংশ নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। অথচ বার্ষিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৯ দশমিক ২০ শতাংশ। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে বাকি ২ মাসে কতটা রপ্তানি করতে হবে, তা চিন্তা করাও কঠিন। অর্থাৎ এই লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবসম্মত নয়। এর ওপর আগামী অর্থবছরের প্রাক্কলন করতে হবে। ফলে এক বছরের প্রাক্কলন ঠিক না থাকলে পরের বছরও তা ঠিক থাকে না।

সরকারের ঘাটতি পূরণ প্রসঙ্গে ফাহমিদা খাতুন বলেন, সরকার যদি ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নেয়, তাহলে বেসরকারি খাতে ঋণের সংকট হতে পারে। যদিও সরকার বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করতে চাচ্ছে। এই পরিস্থিতিত তিনি মনে করেন, ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার চেয়ে বিদেশি ঋণ নিলে ভালো। প্রস্তাবিত বাজেটে বিদেশি ঋণের লক্ষ্যমাত্রাও বাড়ানো হয়েছে।

ফাহমিদা কাতুন আরও বলেন, এমন সময় বাজেট দেওয়া হয়েছে, যখন সমস্যা কেবল প্রবৃদ্ধি নয়; বরং স্থিতিশীলতা, আস্থা ও সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা প্রয়োজন। কিছু লক্ষ্য সামনে রেখে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে গতি ফিরিয়ে আনতে।

ফাহমিদা খাতুন বলেন, সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। বাজেটে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়গুলো প্রাধান্য পেয়েছে। সেই সঙ্গে প্রস্তাবিত বাজেটে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের মূল বিষয়গুলোর প্রতিফলন ঘটেছে।

বাজেটের সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামো নিয়ে কথা বলেন ফাহমিদা খাতুন। বাজেটে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৭ দশমিক ৫ শতাংশ এবং প্রবৃদ্ধির হার ৬ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০২৫–২৬ অর্থবছরের তুলনায় তা অনেকটাই বেশি। এই লক্ষ্যমাত্রা উচ্চাভিলাষী মনে হতে পারে। তবে আমাদের জনসংখ্যা ও অর্থনীতির আকার বিবেচনা করলে তা সম্ভব হতে পারে, যদিও সে জন্য কিছু পূর্ব শর্ত পূরণ করতে হবে।

যেমন বেসরকারি বিনিয়োগ ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং সেই সঙ্গে রপ্তানির পালে হাওয়া লাগানো। সেই সঙ্গে সংস্কার চালিয়ে যেতে হবে। এখন যে বিনিয়োগ পরিস্থিতি ,আর্থিক খাতের পরিস্থিতি ও জ্বালানিসংকট, তাতে এই লক্ষ্য অর্জন করা বেশ চ্যালেঞ্জিং বলে মনে করেন ফাহমিদা খাতুন।

ফাহমিদা খাতুন বলেন, মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশ নামিয়ে আনাও চ্যালেঞ্জিং হবে। চলতি অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের মতো। এক বছরের মধ্যে তা দেড় শতাংশীয় পয়েন্ট কমিয়ে আনা কঠিন কাজ। সে জন্য কিছু পূর্ব শর্ত পূরণ করতে হবে।

মূল্যস্ফীতি কমাতে হলে মুদ্রার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা, খাদ্য সরবরাহব্যবস্থা উন্নত করা ও জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা উন্নত করতে হবে বলে মত দেন ফাহমিদা খাতুন। সেই সঙ্গে মুদ্রানীতিতে প্রজ্ঞার পরিচয় দিতে হবে। এখন সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি চলছে। এই বাস্তবতায় বিনিয়োগ বাড়াতে হলে নীতি প্রণয়নে বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে হবে। রাজস্ব নীতির সঙ্গে সমন্বয়ের প্রয়োজন আছে।

রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে জোর দেন ফাহমিদা খাতুন। বিশ্ববাজারে জ্বালানির যে দাম, তা বড় চ্যালেঞ্জ। দাম এই অবস্থায় থাকলে আর শর্ত পূরণ করা গেলে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

প্রস্তাবিত বাজেটের বেশ কিছু বিষয়ের প্রশংসা করেন ফাহমিদা খাতুন। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, সৌর প্যানেল ও বৈদ্যুতিক যানবাহনে যে করছাড় দেওয়া হয়েছে, তা ইতিবাচক। সেই সঙ্গে দক্ষতা উন্নয়ন, কৃষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগে যে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, তা উল্লেখযোগ্য।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান।