চলনবিলের দেশি মাছের খোঁজে পাইকাররা

চলনবিলের দেশি মাছছবি: প্রথম আলো

‘নদী-নালা, খাল-বিল, এই নিয়ে চলনবিল’—লোকমুখে প্রচলিত এই বাক্য বলে দেয় চলনবিল অঞ্চলের মানুষের জীবনে বিল আর মাছের স্থান ঠিক কোথায়। এখানকার মাছ নিয়মিত বিক্রি হয় চাটমোহরের ঐতিহ্যবাহী বাজারগুলোতে। সেখান থেকে পাইকাররা কিনে নিয়ে আসেন শহরের বড় বাজারগুলোতে।

ভোরের আলো ফুটতেই বিলের আশপাশের গ্রামগুলোতে শুরু হয় এক অন্য রকম কর্মযজ্ঞ। শহরের মানুষ যান্ত্রিক জীবনের ফাঁকে যে খাঁটি দেশি মাছের আসল স্বাদ হাতড়ে বেড়ান, তার চিত্রপট প্রতিদিন ভোরে রচিত হয় এই বিলের পাড়ে। চলনবিল প্রায় ৪৭টি ছোট-বড় বিলের এক বিশাল অববাহিকা ও অনন্য মিঠাপানির জলাভূমি। পাবনা, নাটোর ও সিরাজগঞ্জ জেলাজুড়ে বিস্তৃত এই বিলের তলদেশ পলি জমে এবং অপরিকল্পিত অবকাঠামোয় সংকুচিত হলেও এটি দেশীয় মাছের অন্যতম বড় প্রজনন ক্ষেত্র।

জেলের খলসিনা আর দধি জালে আটকা পড়া জ্যান্ত পুঁটি মাছের লাফালাফি দেখলে যেকোনো ভোজনরসিকের চোখ জুড়িয়ে যাবে। ডালায় উঁকি দিলে দেখা মেলে চলনবিলের ঐতিহ্যবাহী মৎস্যভান্ডারের এক খণ্ডচিত্র। সেখানে সগর্বে উপস্থিত থাকে তরতাজা শিং, মাগুর, টাকি আর লিকলিকে বাইম।

গ্রামীণ লোককথায় শোনা যায়, চলনবিলের সেই বিখ্যাত রাক্ষুসে বোয়ালের গল্প। প্রবীণদের মুখে মুখে ফেরে, বিলের গভীর ‘কুম’ বা গর্তে লুকিয়ে থাকা বিশালকায় বোয়াল একসময় আস্ত হাঁস গিলে খেত। মাঝে মাঝে জেলের জালে এখনো দেখা মেলে রূপকথার সেই বড় শোল কিংবা রুপালি আঁশের চিতলের। তবে বিলের রাজা এখন মূলত পুঁটি, যার আধিক্যই সবচেয়ে বেশি। একসময় এই বিলে জেলের জালে হরহামেশাই ধরা পড়ত রাজকীয় বাগাড়, সুস্বাদু মধু পাবদা, রাক্ষুসে গজার ও কালবাউশের মতো দুষ্প্রাপ্য মাছগুলো।

এই তাজা মাছ শহরের মানুষের পাতে তুলে দেওয়ার পেছনের কারিগরদের জীবনটাও কোনো উপন্যাসের চেয়ে কম নয়। ভোর না হতেই চাটমোহরের বিভিন্ন মোড়ে অস্থায়ী বাজারে ডালা সাজিয়ে বসেন জেলেরা। মো. রাজু হোসেন, মো. আলী ও মো. আবুল কাশেমের মতো জেলেরা সারা রাত জেগে কুড়ুলিয়া বিলে খলসিনা, চায়না জাল আর দধি জাল পেতে এই মাছ ধরেন। ভোর হতেই তাঁদের ধরা জ্যান্ত মাছগুলো পরম যত্নে ভ্যানে তুলে নেন চালক মো. ইউনুস আলী। তিনি বলেন, ‘জেলেরা তো সারা রাইত কষ্ট কইরা মাছ ধরে। ফজর হলেই আমি তাগো মাছগুলা ভ্যানে কইরা বাজারে আগায় দিই। এতে মানুষেরাও তাজা মাছ পায়, আর জেলেগোও বেচাকেনা ভালো হয়।’

১৪৬০ বিঘার বিশাল সরকারি খাসজমি বিল কুড়ুলিয়া। এই জলাভূমিকে ঘিরেই আবর্তিত হয় আশপাশের তিন গ্রামের মৎস্যজীবীদের অর্থনীতি। জেলেপাড়ায় বসে বিলের বর্তমান সভাপতি মো. রায়হান আলীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায় জেলেদের টিকে থাকার সংগ্রামের কথা। তিনি জানান, এই জেলেগ্রামে ৪০০ থেকে ৪৫০টি পরিবার বাস করে। তাদের জীবন-জীবিকা সম্পূর্ণ বিলের মাছের ওপর নির্ভরশীল।

বিলের বর্তমান মাছের অবস্থা নিয়ে কিছুটা শঙ্কিত জেলেরা। রায়হান আলী বলেন, জোলার (খাল) পানি যাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিলের গভীরতা এখন অনেক কমে গেছে। পাঁচ-ছয় বছর ধরে কচুরিপানার উপদ্রব আর আশপাশের কৃষিজমির কীটনাশক মিশ্রিত পানি বিলের পরিবেশ নষ্ট করায় মাছের উৎপাদন কমেছে।