আইএমএফসহ দাতাদের কাছ থেকে বাড়তি ঋণ পাওয়ার চেষ্টা করছে বাংলাদেশ
বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বসন্তকালীন ছয় দিনব্যাপী বৈঠকে অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে ১৪ সদস্যের প্রতিনিধিদল যোগ দিয়েছে। আজ বৈঠক শেষ হচ্ছে।
চলমান জ্বালানিসংকট মোকাবিলাসহ বাজেট সহায়তার জন্য বর্ধিত ঋণ পাওয়ার চেষ্টা করছে বাংলাদেশ। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলসহ (আইএমএফ) প্রায় সব উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার সঙ্গে আলোচনাও হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনে চলমান আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বসন্তকালীন বৈঠকে অংশ নিয়ে গতকাল শুক্রবার বাংলাদেশের অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ কথা জানান।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট জ্বালানিসংকটের এই সময়ে সহযোগিতা চেয়ে সবার সঙ্গেই আলোচনা করা হয়েছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘সবাই পর্যবেক্ষণ করছে বাংলাদেশ কীভাবে এ সংকট মোকাবিলা করছে। বাংলাদেশকে সহায়তা করার ব্যাপারে আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক, এডিবি—সবার দৃষ্টিভঙ্গিই ইতিবাচক। আমরা একটা প্যাকেজ আশা করছি এবং প্যাকেজের আকার কী হবে, সে জন্য অপেক্ষা করছি।’
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘আইএমএফসহ উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলো বিএনপির অর্থনৈতিক ইশতেহার সম্পর্কে অবগত।
আলোচনা চলছে, আরও আলোচনা হবে। আজকেই যে সব আলোচনা শেষ হবে না, তা অনেকে বুঝতে চান না। আইএমএফের দল ঢাকায় আসবে। আমরা আশা করছি একটা বর্ধিত প্যাকেজ পাব।’
আলোচনা চলছে, আরও আলোচনা হবে। আজকেই যে সব আলোচনা শেষ হবে না, তা অনেকে বুঝতে চান না। আইএমএফের দল ঢাকায় আসবে। আমরা আশা করছি একটা বর্ধিত প্যাকেজ পাব।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক নিয়েও অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক এখন ভিন্ন মাত্রায়। যুক্তরাষ্ট্র থেকে জ্বালানি, খাদ্যপণ্য ইত্যাদি আমদানি বাড়িয়েছে বাংলাদেশ। অন্যদিকে তথ্যপ্রযুক্তি (আইসিটি) খাতে বিনিয়োগ করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। এ খাতে দেশটি থেকে কারিগরি সহযোগিতা নেওয়ার ব্যাপক সুযোগ আছে।
বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বসন্তকালীন ছয় দিনব্যাপী বৈঠকে অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে ১৪ সদস্যের প্রতিনিধিদল যোগ দিয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান, অর্থসচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান প্রমুখ।
বৈঠক শুরু হয়েছে ১৩ এপ্রিল, যা আজ শনিবার শেষ হবে।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, বর্ধিত ঋণসহায়তার বিষয়ে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলো ইতিবাচক। আইএমএফের পাশাপাশি অন্য সংস্থাগুলো হচ্ছে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), জাপান আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (জাইকা), ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি) ইত্যাদি। বর্ধিত ঋণসহায়তা বা প্যাকেজের আকার হতে পারে ৩০০ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি।
অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় একশ্রেণির লোক ২০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি দেশ থেকে নিয়ে গেছে। ব্যাংকগুলো সমস্যায় পড়েছে। এগুলোতে কীভাবে তহবিল জোগান দেওয়া যায়, তা নিয়েও উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।
আইএমএফের সঙ্গে বর্তমানে বাংলাদেশের ৫৫০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচি চলমান। ৪৭০ কোটি ডলার দিয়ে এ কর্মসূচি শুরু হয় ২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি। মাঝখানে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২০২৫ সালের জুনে ৮০ কোটি ডলার বাড়ানো হয়। আইএমএফ থেকে এ পর্যন্ত পাঁচ কিস্তিতে বাংলাদেশ পেয়েছে ৩৬৪ কোটি ডলারের ঋণসহায়তা।
বাকি আছে ১৮৬ কোটি ডলার, যা থেকে ষষ্ঠ কিস্তির ১৩০ কোটি মার্কিন ডলার ছাড় পাওয়ার কথা ছিল গত ডিসেম্বরে। কিন্তু গত বছরের অক্টোবরে অনুষ্ঠিত আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক বৈঠক শেষে তৎকালীন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, এ কিস্তি ছাড়ের আলোচনা আইএমএফ নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে করবে।
কিস্তি ছাড় প্রসঙ্গ
আইএমএফের এশিয়া ও প্যাসিফিক বিভাগের পরিচালক কৃষ্ণ শ্রীনিবাসন গত ২৪ মার্চ ঢাকায় এসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করে গেছেন। অর্থ বিভাগের সূত্রগুলো জানায়, ওই সময় কৃষ্ণ শ্রীনিবাসন ইঙ্গিত দিয়ে গিয়েছিলেন প্রতিবছর বসন্তকালীন বৈঠকের পর পরই এপ্রিল মাসে যে আইএমএফের পর্যালোচনা মিশন দুই সপ্তাহের জন্য ঢাকায় আসে, এবার তা আসবে মে মাসে। ফলে আইএমএফের জুনের পর্ষদে কিস্তি ছাড়ের প্রস্তাব উত্থাপিত হওয়ার সুযোগ কম। জুলাইয়েও আইএমএফের পর্ষদ বৈঠক রয়েছে। জুলাইয়ের বৈঠকে যাতে কিস্তি ছাড়ের প্রস্তাব ওঠে, এবারের বসন্তকালীন বৈঠকে আইএমএফকে সেই অনুরোধ করেছে বাংলাদেশ।
বসন্তকালীন বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, ব্যাংক খাতের সংস্কার, একক ভ্যাট হার চালু করা, কর ছাড় কমিয়ে আনাসহ রাজস্ব খাতের সংস্কারের পরিকল্পনা জানতে চেয়েছে আইএমএফ। ঋণ অনুমোদনের পর ২০২৩ সালে আইএমএফ শর্ত দিয়েছিল যে জিডিপির তুলনায় রাজস্ব আদায় প্রতিবছর দশমিক ৫ শতাংশ হারে বাড়াতে হবে। বাংলাদেশ তা পারেনি। বর্তমানে ভ্যাট হার আছে ৫, ৭ দশমিক ৫, ১০ এবং ১৫ শতাংশ। আইএমএফ চায় একক ভ্যাট হার।
ওয়াশিংটনে গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশি সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সংস্থাটির এশিয়া ও প্যাসিফিক বিভাগের পরিচালক কৃষ্ণ শ্রীনিবাসন জানান, আর্থিক, রাজস্ব ও বিনিময় হার—এ তিন খাতেই বাংলাদেশের এখনো সংস্কারের অনেক কাজ বাকি।
ঋণের কিস্তি ছাড়ের বিষয়ে জানতে চাইলে কৃষ্ণ শ্রীনিবাসন বলেন, কিস্তি ছাড়ের বিষয়ে আলোচনা চলছে। এ–বিষয়ক তথ্য পরে জানানো হবে। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের সামনে থাকা চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে গত মাসে ঢাকায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ অন্যদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। বলেছি, শক্তিশালী সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে আসা সরকারের পক্ষেই উচ্চাভিলাষী সংস্কারকাজ হাতে নিতে পারে। তারা আমাদের কথা শুনেছে। এখন আমরা দেখব তারা কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানায়।’
কৃষ্ণ শ্রীনিবাসন বলেন, এশিয়ার অন্য দেশগুলোর মতো বাংলাদেশও জ্বালানি ধাক্কায় প্রভাবিত হয়েছে। এ কারণে নীতি–সহায়তা এবং কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা চলছে। এ আলোচনা কীভাবে, কতটা এগোয়, তা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।
‘কিছু একটা গিট্টু লেগে গেছে’
দুই সংবাদ সম্মেলনের তথ্য জানিয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনের কাছে জানতে চাইলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, আইএমএফের ঋণ কর্মসূচিটা চলমান রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে অন্য উন্নয়ন সহযোগীরাও আইএমএফের মূল্যায়নকে বিবেচনায় নিয়ে থাকে। অর্থমন্ত্রী ও আইএমএফ—কারও কাছ থেকেই ঋণ কর্মসূচি চালু থাকা এবং পরের কিস্তি ছাড় নিয়ে স্পষ্ট কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এপ্রিলে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় না হওয়া, সম্প্রতি মুদ্রা বিনিময় হারে অদৃশ্য চাপ, ব্যাংক রেজোল্যুশন আইনে বিশেষ ধারা আরোপ করা, রাজস্ব আদায়ে অগ্রগতি না থাকা—এ সব বিষয়ে বাংলাদেশ শর্ত পূরণ করতে পারেনি উল্লেখ করে জাহিদ হোসেন বলেন, ‘কোন কোন বিষয়ে উভয় পক্ষ একমত, তা আমরা এখনো জানি না। হয়তো অর্থমন্ত্রী দেশে ফিরে এসে জানাবেন। তবে আমার মনে হয় কিছু একটা গিট্টু লেগে গেছে। এই পরিস্থিতিতে বর্ধিত ঋণ পাওয়ার কতটা সম্ভাবনা আছে তা এখনো স্পষ্ট নয়।’