লোকসানে কৃষক, আলুর আবাদ কমছে

  • বর্তমানে খুচরা বাজারে ভোক্তা প্রতি কেজি আলু কিনছেন ৩০ টাকায়। যদিও কৃষক এর অর্ধেক দামও পাননি।

  • গত বছরের এই সময়ে খুচরা বাজারে প্রতি কেজি আলুর দাম ছিল ৩০ থেকে ৫০ টাকা।

আগাম জাতের আলু তুলছেন কিষানি। জমিতেই পাইকারি বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ১৫ থেকে ১৬ টাকায়। ফাইল ছবি: ভক্তিপুর, মিঠাপুকুর,ছবি: মঈনুল ইসলাম

কুয়াশা মোড়ানো শীতের সকাল। এ সময় মো. আবুল কালামের থাকার কথা ছিল মুন্সিগঞ্জের বিস্তীর্ণ আলুখেতে। নিড়ানি দেওয়া কিংবা সার ছিটানোয় ব্যস্ত থাকার কথা ছিল তাঁর। কিন্তু ৬৫ বছর বয়সী এই কৃষকের দিন কাটছে রাজধানীর মিরপুরের রাস্তায় রাস্তায়। ভ্যানে করে বেকারি পণ্য বিক্রি করছেন তিনি। আলু চাষে বড় লোকসানের পর নিজের শেষ সম্বল জমিটুকু বাঁচাতে কৃষিকাজ ছেড়ে দিয়েছেন আবুল কালাম। এখন তিনি ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ী।

গত ১৫ ডিসেম্বর সকালে আবুল কালাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘কয়েক দফা আলুতে শুধু লোকসান দিয়েছি। সর্বশেষ দুই লাখ টাকা হারিয়ে এখন জমি বাঁচাতে চাষবাস ছেড়ে দিলাম। ভ্যান চালিয়ে বেকারি পণ্য বিক্রি করে যা পাই, তাতে অন্তত নিশ্চিত লোকসান নাই।’

আবুল কালামের এই গল্প আজ দেশের হাজার হাজার আলুচাষির গল্প। গত মৌসুমে বাম্পার ফলন হলেও বাজার ব্যবস্থাপনার ত্রুটি আর ন্যায্যমূল্য না পেয়ে লোকসানে পড়েন কৃষক। ফলে চলতি মৌসুমে সারা দেশে আলুর আবাদ কমেছে। দেনা শোধে অনেক কৃষক অন্য পেশায় নাম লেখাচ্ছেন। আবাদ কমিয়ে দিয়েছেন কেউ কেউ, কেউবা ভিন্ন ফসল ফলাচ্ছেন।

উৎপাদন খরচও উঠছে না কৃষি বিপণন অধিদপ্তর ও ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য বিশ্লেষণ করলে আলু চাষে খরচ ও বিক্রির হিসাবের ফারাক পাওয়া যায়। প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে কৃষকের খরচ হচ্ছে ১৫ থেকে ২০ টাকা। এর সঙ্গে হিমাগার ভাড়া বাবদ যোগ হচ্ছে আরও ৬ টাকা ৭৫ পয়সা। অথচ চলতি জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে হিমাগার পর্যায়ে পাইকারি আলু বিক্রি হয় মাত্র ৫ থেকে ৮ টাকায়। অর্থাৎ আলু বিক্রি করে কৃষকের হিমাগারের ভাড়ার টাকাই উঠছে না। তবে গতকাল রোববার পর্যন্ত হিমাগারের মজুত আলু অনেকটাই কমে এসেছে। বাজারে কেজিতে আলুর দামও বেড়েছে ১০ টাকা।

বর্তমানে খুচরা বাজারে ভোক্তা প্রতি কেজি আলু কিনছেন ৩০ টাকায়। যদিও কৃষক এর অর্ধেক দামও পাননি। গত বছরের এই সময়ে খুচরা বাজারে আলুর দাম ছিল ৩০ থেকে ৫০ টাকা। সরকারের পক্ষ থেকে ২০২৫ সালে আলুর গড় বাজারমূল্য ২২ টাকা নির্ধারণ করা হলেও বাস্তবে কৃষক উৎপাদন খরচও পাননি।

মোকামে উঠেছে মৌসুমের নতুন আলু। মহাস্থান মোকাম, শিবগঞ্জ, বগুড়া
ফাইল ছবি: প্রথম আলো

আলু চাষে আগ্রহ কমছে

ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় কৃষকেরা আলু চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত মৌসুমে দেশে ৪ লাখ ৯৪ হাজার হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ হয়েছিল। কিন্তু চলতি মৌসুমে জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত আবাদ হয়েছে ৪ লাখ ৬৭ হাজার হেক্টর। গত বছরের তুলনায় অন্তত ২৪ হাজার হেক্টর জমিতে এবার আলু চাষ হয়নি।

উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রাতেও এর প্রভাব পড়েছে। গত মৌসুমে ১ কোটি ২৯ লাখ ৯০ হাজার মেট্রিক টন লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে উৎপাদন হয়েছিল ১ কোটি ১৫ লাখ ৭৩ হাজার মেট্রিক টন। চলতি মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ধরা হয়েছে ১ কোটি ১৩ লাখ ৬৫ হাজার মেট্রিক টন। আবাদ কমে যাওয়ায় এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়েও সংশয় রয়েছে।

মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ার কৃষক নাজির হোসেনের অবস্থা আরও করুণ। গত মৌসুমে দুই একর জমিতে ২১ হাজার ২৩০ কেজি ফলন পেয়েছিলেন তিনি। হিমাগার ভাড়াসহ তাঁর মোট খরচ হয়েছিল সাড়ে তিন লাখ টাকা। বাজার পড়ে যাওয়ায় পুরো আলু বিক্রি করতে পেরেছেন মাত্র ২৭ হাজার টাকায়। অর্থাৎ কেজিপ্রতি তিনি পেয়েছেন মাত্র ১ টাকা ২৭ পয়সা। ব্যাংকঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে নাজির হোসেন এবার আলুর আবাদ করার সাহস পাননি।

রংপুরের তারাগঞ্জ এলাকায় অনেক কৃষক আলুর পরিবর্তে তামাক চাষে ঝুঁকছেন। তামাকের বাজার নিশ্চিত থাকায় বাধ্য হয়ে তাঁরা এই ক্ষতিকর ফসলের দিকে ঝুঁকছেন। স্থানীয় কৃষক আনারুল হক বলেন, আলুর দাম বাড়লে সরকার তদারক করে, কিন্তু লোকসানের সময় কৃষকের পাশে কেউ থাকে না।

কুমিল্লার বুড়িচংয়েও একই চিত্র। সেখানে গত এক বছরে আলুর আবাদ কমেছে ৭৫১ হেক্টর। ঝুঁকি এড়াতে কৃষকেরা আলুর বদলে মিষ্টি কুমড়া বা অন্য সবজি চাষ করছেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মিজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, মূলত দাম নিয়ে শঙ্কা এবং কম সময়ে অধিক লাভজনক সবজি চাষে আগ্রহ বাড়ায় কৃষকেরা আলু চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন।

‘ভর্তুকি হিসেবে দেওয়া উচিত’

দেশের ৩৮৪টি হিমাগার ও ৫৩৯টি ‘মডেল ঘর’–এ গত মৌসুমে ৩১ লাখ ৬১ হাজার টন আলু সংরক্ষণ করা হয়েছিল। জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে হিমাগারগুলোতে প্রায় ১ লাখ ৮৭ হাজার টন আলু অবিক্রীত ছিল। ভাড়ার টাকা না ওঠায় অনেক কৃষক আলু হিমাগারেই ফেলে আসেন।

দেশে আলুর বার্ষিক চাহিদা প্রায় ১ কোটি টন। তবে সঠিক সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের অভাবে মোট উৎপাদিত আলুর ১৫ থেকে ২০ শতাংশই নষ্ট হয়ে যায়, যা বড় অপচয়।

কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান মনে করেন, পরিকল্পনাহীন উৎপাদন এবং বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাই এই সংকটের মূল কারণ। তিনি বলেন, ‘সরকার যদি উৎপাদিত আলুর অন্তত ১০ শতাংশ কিনে সরাসরি সংরক্ষণ করত, তবে কৃষক ও ভোক্তা উভয়ই লাভবান হতো। এ ছাড়া আলু সংরক্ষণে হিমাগার ভাড়ার অর্ধেক ভর্তুকি হিসেবে দেওয়া উচিত।’

বিশ্বের অনেক দেশ উৎপাদিত আলুর ১০ শতাংশ পর্যন্ত রপ্তানি করছে উল্লেখ করে জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, ‘আমরা ১ শতাংশের অর্ধেকও রপ্তানি করতে পারছি না। আলু উৎপাদন ঠিক রাখতে হলে প্রক্রিয়াজাত শিল্পে সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্যে বিশেষ সুবিধা দিলে কৃষকেরা তামাক বা অন্য পেশায় না গিয়ে মাঠেই থাকবেন।

[প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন প্রথম আলোর মুন্সিগঞ্জ, রংপুরের তারাগঞ্জ ও কুমিল্লা প্রতিনিধি]