কাচের বোতলে চারা উৎপাদন, বাণিজ্যিক কৃষির নতুন যাত্রা

সারি সারি কাচের বোতলে গাছের চারার পরিচর্যা করেন কৃষি কর্মকর্তারা। সম্প্রতি মাদারীপুর হর্টিকালচার সেন্টারেছবি: প্রথম আলো

কাচের ছোট্ট একটি বোতল। ভেতরে সবুজ রঙের ক্ষুদ্র একটি উদ্ভিদ। খালি চোখে দেখলে সেটিকে গবেষণাগারের সাধারণ কোনো পরীক্ষার নমুনা বলেই মনে হতে পারে। অথচ কয়েক মাস পর এই ক্ষুদ্র টিস্যুই রূপ নেয় হাজার হাজার রোগমুক্ত চারায়। সেগুলো নিয়েই শুরু হয় বিভিন্ন ফুল, ফল ও শোভাবর্ধক উদ্ভিদের বাণিজ্যিক চাষাবাদ।

চারা উৎপাদনের এই ব্যবস্থাকে বলা হয় টিস্যু কালচার প্রযুক্তি, যার মাধ্যমে দেশেই এখন কলা, আনারস, স্ট্রবেরি, ড্রাগন ফল, অর্কিড, লিলিয়াম, জারবেরা, স্টেভিয়া ও পেঁপেসহ উচ্চমূল্যের বিভিন্ন ফল, ফুল ও শোভাবর্ধক উদ্ভিদের রোগমুক্ত চারা উৎপাদিত হচ্ছে। ফলে কৃষকেরা তুলনামূলক কম দামে উন্নত মানের চারা পাচ্ছেন। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি দেশের বাণিজ্যিক কৃষিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে এবং আর্থিক সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে।

এ নিয়ে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু নোমান ফারুক আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘সারা বিশ্বেই বাণিজ্যিক কৃষিতে টিস্যু কালচার প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার হচ্ছে। বাংলাদেশও সেই পথে এগোচ্ছে। আধুনিক কৃষির বিকাশ এবং রোগমুক্ত চারা তৈরি ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে এ প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বাড়াতে হবে। কারণ, অল্প জায়গায় লাখ লাখ রোগমুক্ত চারা উৎপাদনে এর বিকল্প নেই।’

দেশেই মিলছে বিদেশি জাত

দেশে এখন জি-৯ জাতের কলা, এমডি-২ আনারস, স্ট্রবেরি, ড্রাগন, জারবেরা, লিলিয়াম, অর্কিড, স্টেভিয়া ও পেঁপের চারা উৎপাদিত হচ্ছে। আগে এসব চারা ভারত, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা হতো।

মাদারীপুর হর্টিকালচার সেন্টার ২০২৫–২৬ অর্থবছরে দেশে সর্বোচ্চ দুই লাখ তিন হাজারের বেশি চারা বিক্রি করেছে। এতে সরকারের আয় হয়েছে ৫২ লাখ ৩৩ হাজার টাকা।

মাদারীপুর হর্টিকালচার সেন্টারের প্রধান আশুতোষ কুমার বিশ্বাস প্রথম আলোকে বলেন, ‘শুধু ফলের চারা বিক্রি করলে আয় সীমিত থাকে। তাই আমরা ফুল ও শোভাবর্ধক গাছের চারার উৎপাদনও বাড়িয়েছি। এখানকার লিলিয়াম চারা এখন পঞ্চগড় পর্যন্ত যাচ্ছে।’

* বছরে প্রায় এক কোটি রোগমুক্ত চারা উৎপাদনের লক্ষ্য।
* জি-৯ কলার প্রতিটি ছড়িতে মিলছে ৩০০-৩৫০টি কলা।
* হর্টিকালচার কেন্দ্রগুলো থেকে গত অর্থবছরে সরকারের আয় সাড়ে ৭ কোটি টাকা।

কাচের বোতলেই হাজার চারার জন্ম

সম্প্রতি মাদারীপুরের টিস্যু কালচার ল্যাবে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে সাদা অ্যাপ্রন ও মাস্ক পরে জীবাণুমুক্ত পরিবেশে কৃষিবিজ্ঞানীরা কাজ করছেন। সারি সারি কাচের বোতলে সংরক্ষিত রয়েছে ক্ষুদ্র উদ্ভিদ টিস্যু।

ল্যাবের দায়িত্বে থাকা কৃষিবিদ মো. এনামুল ইসলাম জানান, প্রথমে নির্বাচিত মাতৃগাছ থেকে টিস্যু সংগ্রহ করে জীবাণুমুক্ত পরিবেশে বিশেষ পুষ্টিমাধ্যমে রাখা হয়। এরপর কয়েক ধাপে কোষ বিভাজনের মাধ্যমে একটি মাত্র টিস্যু থেকেই হাজার হাজার চারা তৈরি হয়। পরে সেগুলো কৃষকের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

মাঠে মিলছে সুফল

মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার কৃষক আবদুল কাদের দেড় বিঘা জমিতে জি-৯ জাতের কলার বাগান করেছেন। তাঁর বাগানের প্রতিটি ছড়িতে ২৫০–৩০০টি কলা ধরেছে। দেশি জাতের কলার ছড়ায় সাধারণত ১৩০–১৬০টি কলা ধরে।

কৃষক আবদুল কাদের বলেন, জি-৯ জাতের একটি চারার দাম ৩০ থেকে ৪০ টাকা। একেকটি ছড়া এত বড় হয় যে বাঁশে বেঁধে কাঁধে করে আনতে হয়। ভালো ফলনের কারণে আশপাশের অনেক কৃষকও এখন এ জাতের কলা চাষে আগ্রহী হচ্ছেন।

এদিকে উদ্যোক্তারাও নতুন প্রযুক্তিতে উৎপাদিত চারা লাগিয়ে বাণিজ্যিকভাবে লাভবান হওয়ার চেষ্টা করছেন। যেমন মো. রেজওয়ানুল ইসলাম বগুড়ার শাজাহানপুরে ‘গ্রিন ওয়ান’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। তিনি প্রায় দেড় হাজার জারবেরা গাছ লাগিয়েছেন। এ জন্য তাঁর ব্যয় হয়েছে ৪২ হাজার টাকা। এখন প্রতি সপ্তাহে ১২ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকার ফুল বিক্রি হয় তাঁর।

রেজওয়ানুল ইসলাম বলেন, এখন দেশি চারা ৩৫ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। আগে ভারত থেকে আনতে ৬০ টাকা লাগত।

বছরে কোটি চারা উৎপাদনের লক্ষ্য

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ‘টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি কাম হর্টিকালচার সেন্টার স্থাপন ও উন্নয়ন প্রকল্প’-এর আওতায় বর্তমানে মাদারীপুর, বগুড়া ও ময়মনসিংহে তিনটি আধুনিক টিস্যু কালচার ল্যাব চালু রয়েছে। এ ছাড়া দেশের আটটি জেলায় নতুন ল্যাব নির্মাণের কাজ চলছে। প্রতিটি ল্যাবের বার্ষিক চারা উৎপাদনের ক্ষমতা ১০ থেকে ১২ লাখ।

সবগুলো ল্যাব পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে বছরে প্রায় এক কোটি রোগমুক্ত চারা উৎপাদন সম্ভব হবে। গত এক বছরে তিনটি ল্যাবে ২ লাখ ১২ হাজার চারা উৎপাদিত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৯৩ হাজার চারা কৃষক ও উদ্যোক্তার কাছে সরবরাহ করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি চাহিদা জি-৯ কলা, জারবেরা ও স্ট্রবেরির চারার।

প্রকল্পটির পরিচালক তালহা জুবাইর মাসরুর বলেন, মাতৃগাছের বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রেখে রোগমুক্ত চারা উৎপাদনই এ প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় সুবিধা। এতে বিদেশি চারার ওপর নির্ভরতা কমছে, কৃষকের উৎপাদন ব্যয়ও কমছে।

তালহা জুবাইর মাসরুর জানান, নতুন চারা নিয়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে গবেষণা ও নতুন জাতের চারা উৎপাদনের কার্যক্রম চলমান।

চারা বিক্রিতে শীর্ষে মাদারীপুর

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট ৭৬টি হর্টিকালচার সেন্টার রয়েছে। এগুলোর শীর্ষে রয়েছে মাদারীপুর সেন্টার। নানা জাতের আমের চারা বিক্রি করে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ কেন্দ্র। কুলের চারা বিক্রি করে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে পাবনা। লিচুর চারা বিক্রিতে চতুর্থ স্থানে রয়েছে দিনাজপুর।

নানা জাতের নারিকেল ও আমড়ার চারা বিক্রি করে পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে বরিশাল; আর ঢাকা অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি চারা বিক্রি হয় গাজীপুর হর্টিকালচারে।

দেশের হর্টিকালচার সেন্টারগুলো থেকে চারা বিক্রি করে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকারের আয় হয়েছে ৭ কোটি ৩৭ লাখ টাকা, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৭ কোটি টাকা।