ভারত থেকে দেড় হাজার কোটি টাকার ডিজেল কিনবে সরকার

ডিজেলফাইল ছবি: রয়টার্স

ভারতীয় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নুমালিগড় রিফাইনারি থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার টন ডিজেল আমদানি করবে বাংলাদেশ। এতে মোট ব্যয় হবে প্রায় ১ হাজার ৪৬২ কোটি টাকা। যার একটি অংশ দেবে বিপিসি, বাকি অর্থ আসবে ব্যাংকঋণ থেকে।

ভারতীয় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নুমালিগড় রিফাইনারি লিমিটেড (এনআরএল) থেকে এই ডিজেল আমদানির প্রস্তাব আজ মঙ্গলবার অনুমোদন করেছে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটি। সচিবালয়ে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর সময়ের মধ্যে ভারত থেকে এই ডিজেল আমদানি করবে বাংলাদেশ।

এর আগে গত ২২ অক্টোবর অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠকে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) জন্য ২০২৬ সালে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির প্রস্তাব নীতিগতভাবে অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। সেই সিদ্ধান্তের আলোকে ক্রয় কমিটি এবার নির্দিষ্টভাবে এনআরএল থেকে ডিজেল আমদানির প্রস্তাব চূড়ান্ত করল।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অয়েল ইন্ডিয়া লিমিটেডের সহযোগী প্রতিষ্ঠান এনআরএলের সঙ্গে দর-কষাকষির ভিত্তিতেই এই আমদানির ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে মোট খরচ ধরা হয়েছে ১১ কোটি ৯১ লাখ ৩৩ হাজার ২১৬ মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৪৬১ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। প্রতি ব্যারেল ডিজেলের প্রিমিয়াম ধরা হয়েছে ৫ দশমিক ৫০ মার্কিন ডলার এবং ভিত্তিমূল্য ৮৩ দশমিক ২২ মার্কিন ডলার।

ভিত্তিমূল্য মূলত আন্তর্জাতিক বাজারদরের সঙ্গে মিলিয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে, যা আমদানি চুক্তি ও বৈশ্বিক বাজারের ওঠানামার সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। এটি কোনো স্থায়ী বা একক দাম নয় অর্থাৎ বাজার পরিস্থিতি অনুযায়ী এই মূল্য কমবেশি হতে পারে।

ক্রয় কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, এনআরএল থেকে ডিজেল আমদানি করা হচ্ছে ১৫ বছরের একটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায়। এই চুক্তি বর্তমান সরকার করেনি। আগের সরকারের সময় করা চুক্তির ধারাবাহিকতায় আমদানি কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

গত বছরের জানুয়ারিতেও এনআরএল থেকে ১ লাখ ৩০ হাজার টন ডিজেল আমদানির প্রস্তাব অনুমোদন করেছিল সরকারি ক্রয় কমিটি। তখনো প্রতি ব্যারেল ডিজেলের প্রিমিয়াম ছিল ৫ দশমিক ৫০ মার্কিন ডলার।

এনআরএলের পরিশোধনাগার ভারতের আসাম রাজ্যে। সেখান থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরে পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়িতে এনআরএলের বিপণন টার্মিনালে ডিজেল পাঠানো হয়। পরে ওই টার্মিনাল থেকে ডিজেল আসে বিপিসির পার্বতীপুর ডিপোতে। ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে দীর্ঘ সময় ধরে ট্রেনে করে এই ডিজেল পরিবহন করা হতো।

জ্বালানি পরিবহন সহজ ও ব্যয় কমাতে দুই দেশের মধ্যে নির্মাণ করা হয়েছে বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী পাইপলাইন। ভারতীয় অর্থায়নে নির্মিত ১৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইনের কাজ শেষ হয় ২০২২ সালের ১২ ডিসেম্বর। এই পাইপলাইনের মাধ্যমে এখন ডিজেল পরিবহন করা হচ্ছে। পাশাপাশি ২০২৪ সালের মার্চ থেকে ঢাকায় এনআরএলের একটি লিয়াজোঁ অফিসও কার্যক্রম শুরু করেছে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এনআরএল ভারতের একটি বড় প্রতিষ্ঠান। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এনআরএলের টার্নওভার ছিল ২৫ হাজার ১৪৭ কোটি টাকা। ভারতের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী প্রথম তিন বছর বছরে দুই লাখ টন, পরের তিন বছর তিন লাখ টন, পরবর্তী চার বছর পাঁচ লাখ টন এবং এরপর প্রতি বছর ১০ লাখ টন করে জ্বালানি তেল বাংলাদেশে সরবরাহের কথা রয়েছে।

এদিকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে এনআরএল ভারত সরকারের কাছ থেকে ‘নবরত্ন’ মর্যাদা পেলেও প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে পরিবেশদূষণের অভিযোগ রয়েছে। ধনশিরি নদীতে সরাসরি অপরিশোধিত পেট্রোলিয়ামজাত বর্জ্য ফেলার অভিযোগে ভারতের পরিবেশকর্মীরা ক্ষতির আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। এ বিষয়ে ভারতের ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইব্যুনাল চলতি বছরে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে একটি মামলা গ্রহণ করেছে, যা এখনো বিচারাধীন।