চার বছর ধরে শীর্ষে এনসিটি, চতুর্থ সৌদির আরএসজিটি
একসময় দেশে সবচেয়ে বেশি কনটেইনার পরিবহন হতো চট্টগ্রাম বন্দরের জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি) দিয়ে। অর্ধশত বছরের বেশি পুরোনো এই সুবিধার ছয়টি কনটেইনার জেটি পরিচালনা করছে ছয়টি বার্থ অপারেটর প্রতিষ্ঠান। তবে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের (এনসিটি) চারটি জেটি পুরোদমে চালু হওয়ার পাশাপাশি আধুনিক যন্ত্রপাতি যুক্ত হলে পরিস্থিতি বদলে যায়। একপর্যায়ে জিসিবিকে পেছনে ফেলে শীর্ষে উঠে আসে এনসিটি।
টার্মিনাল অপারেটর ও বন্দরের তথ্য অনুযায়ী, সদ্য বিদায়ী ২০২৫–২৬ অর্থবছরে কনটেইনার পরিবহনে প্রথম অবস্থানে রয়েছে এনসিটি। এ নিয়ে টানা চার অর্থবছর শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে টার্মিনালটি। জিসিবি দ্বিতীয়, চিটাগং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) তৃতীয় ও সৌদির প্রতিষ্ঠান রেড সি গেটওয়ে টার্মিনালের (আরএসজিটি) পরিচালনাধীন আরএসজিটি চিটাগং চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে।
চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরে সমুদ্রগামী জাহাজ থেকে কনটেইনার ওঠানো–নামানোর জন্য থাকা পাঁচটি প্রধান টার্মিনালের তথ্য তুলনা করে এ চিত্র পাওয়া গেছে। তবে এই ক্রমতালিকা শুধু পরিবহন করা কনটেইনারের সংখ্যার ভিত্তিতে করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে টার্মিনালগুলোর দক্ষতার তুলনা করা হয়নি। কারণ, টার্মিনালভেদে জেটির সংখ্যা, জাহাজ বরাদ্দ, ক্রেন ও অন্যান্য যন্ত্রপাতির সুবিধা আলাদা।
সদ্য বিদায়ী অর্থবছরের শুরুতে এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব পায় নৌবাহিনীর প্রতিষ্ঠান চিটাগং ড্রাই ডক লিমিটেড। এর আগে টার্মিনালটি পরিচালনা করেছিল সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেড। এখন টার্মিনালটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে ছেড়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
একসময় জিসিবি, এখন এনসিটি
দেশের সবচেয়ে পুরোনো কনটেইনার সুবিধা জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি)। ১৯৫৪ ও ১৯৭৯ সালে চালু হওয়া জিসিবির ১২ জেটির ৬টিতে কনটেইনার এবং অন্য ৬টিতে সাধারণ পণ্য ওঠানো–নামানো হয়। এই টার্মিনাল দিয়েই ১৯৭৭ সালে দেশে কনটেইনার পরিবহন শুরু হয়।
২০১৬–১৭ অর্থবছর পর্যন্ত কনটেইনার পরিবহনে শীর্ষে ছিল জিসিবি। এই টার্মিনালে জাহাজের নিজস্ব ক্রেন ব্যবহার করে কনটেইনার ওঠানো–নামানো হয়। অন্যদিকে এনসিটির চারটি জেটি পুরোদমে চালু হওয়ার পাশাপাশি জাহাজ থেকে কনটেইনার ওঠানো–নামানোর গ্যান্ট্রি ক্রেন যুক্ত হলে পরিস্থিতি বদলে যায়। ২০১৭–১৮ অর্থবছরে প্রথমবার জিসিবিকে ছাড়িয়ে শীর্ষে ওঠে এনসিটি। এরপর কোনো অর্থবছরে জিসিবি, আবার কোনো অর্থবছরে এনসিটি প্রথম অবস্থানে ছিল। তবে ২০২২–২৩ অর্থবছর থেকে টানা চার বছর এনসিটি শীর্ষে ও জিসিবি দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে।
টার্মিনালগুলোর হিসাবে ২০২৫–২৬ অর্থবছরে এনসিটিতে ১৩ লাখ ৮৫ হাজার একক কনটেইনার পরিবহন হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৮ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে জিসিবিতে পরিবহন হয়েছে ১০ লাখ ৩৬ হাজার একক কনটেইনার, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৮ দশমিক ২৪ শতাংশ কম।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে চিটাগং ড্রাই ডকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) কমোডর আবু হাসনাত মো. মাহফুজুর রহমানের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
জিসিবিতে কনটেইনার পরিবহন কমার কারণ সম্পর্কে বার্থ অপারেটরস, শিপহ্যান্ডলিং অপারেটরস অ্যান্ড টার্মিনাল অপারেটরস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বোটসোয়া) সভাপতি ফজলে একরাম চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে জিসিবিতে জাহাজ বরাদ্দ কম থাকায় কনটেইনার পরিবহন কমেছে। ছয়টি জেটির ছয় বার্থ অপারেটরের প্রয়োজনীয় সক্ষমতা রয়েছে। জাহাজের নিজস্ব ক্রেন ব্যবহার করেও তারা দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছেন।
তৃতীয় সিসিটি, পরিবহন কমেছে ২১%
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর নির্মিত প্রথম পূর্ণাঙ্গ কনটেইনার টার্মিনাল সিসিটি। দুই জেটির এই টার্মিনাল পরিচালনা করছে সাইফ পাওয়ারটেক। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে সিসিটিতে ৪ লাখ ৩১ হাজার একক কনটেইনার পরিবহন হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ২১ শতাংশ কম।
সাইফ পাওয়ারটেকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তরফদার রুহুল আমিন প্রথম আলোকে বলেন, সিসিটিতে জাহাজ থেকে কনটেইনার ওঠানো–নামানোর গ্যান্ট্রি ক্রেনগুলো অনেক পুরোনো হয়ে গেছে। মাঝেমধ্যে সেগুলো অচল হয়ে পড়ায় কনটেইনার পরিবহন কমেছে।
তরফদার রুহুল আমিন আরও বলেন, চিটাগং ড্রাই ডকের আওতায় সাইফ পাওয়ারটেকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ই–ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড এনসিটিতে কনটেইনার পরিবহনে দক্ষতা দেখাচ্ছে। কারণ, সেখানে প্রতি জেটিতে তিনটি করে গ্যান্ট্রি ক্রেন রয়েছে।
দ্রুত বাড়ছে আরএসজিটির পরিবহন
সরকারি–বেসরকারি অংশীদারত্বের আওতায় ২২ বছরের জন্য পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে সৌদি আরবের আরএসজিটি। ২০২৪ সালের জুনে টার্মিনালটির বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু হয়। বর্তমানে এটি আরএসজিটি চিটাগং নামে পরিচিত।
২০২৪–২৫ অর্থবছরে টার্মিনালটিতে প্রায় ৭৫ হাজার একক কনটেইনার পরিবহন হয়েছিল। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে তা বেড়ে হয়েছে ২ লাখ ৭৯ হাজার একক, অর্থাৎ এক বছরে কনটেইনার পরিবহন বেড়েছে প্রায় ২৬৮ শতাংশ। টার্মিনালটির বার্ষিক পরিবহনসক্ষমতা প্রায় পাঁচ লাখ একক কনটেইনার।
এত দিন টার্মিনালটিতে জাহাজের নিজস্ব ক্রেন ব্যবহার করে কনটেইনার ওঠানো–নামানো হতো। এখন সেখানে জাহাজ থেকে সরাসরি কনটেইনার ওঠানো–নামানোর গ্যান্ট্রি ক্রেন যুক্ত হয়েছে।
আরএসজিটি বাংলাদেশের হেড অব কমার্শিয়াল অ্যান্ড পাবলিক অ্যাফেয়ার্স সৈয়দ আরেফ সারোয়ার প্রথম আলোকে বলেন, নতুন গ্যান্ট্রি ক্রেন আগস্টের মাঝামাঝি চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে চলতি অর্থবছরে পাঁচ লাখ একক কনটেইনার পরিবহনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
কনটেইনার টার্মিনালগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা তৈরি হওয়া ইতিবাচক। তবে ব্যবহারকারীদের প্রকৃত সুফল দিতে নির্দিষ্ট একক মাশুলের বদলে মাশুলের সর্বোচ্চ সীমা বেঁধে দেওয়া যেতে পারে। কোনো অপারেটর চাইলে এর নিচে কম খরচে উন্নত সেবা দিতে পারবে। এতে প্রতিযোগিতা বাড়বে, ব্যবহারকারীরাও সুফল পাবে।মোহাম্মদ আমিরুল হক, সভাপতি, চট্টগ্রাম চেম্বার
মোংলার অংশ ১ শতাংশ
চট্টগ্রামের বাইরে সমুদ্রগামী জাহাজ থেকে কনটেইনার ওঠানো–নামানোর সুবিধা রয়েছে মোংলা বন্দরে। বন্দরটির দুটি জেটিতে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় কনটেইনার হ্যান্ডলিং করা হয়।
সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে মোংলা বন্দরে ২৯ হাজার ৭৫১ একক কনটেইনার ওঠানো–নামানো হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৩৮ শতাংশ বেশি। দেশের মোট কনটেইনার পরিবহনে মোংলা বন্দরের অংশ প্রায় ১ শতাংশ।
প্রতিযোগিতা বাড়লে সুফল পাবে ব্যবহারকারীরা
কনটেইনারে শিল্পের কাঁচামাল ও বাণিজ্যিক পণ্য আমদানি হয়। অন্যদিকে সমুদ্রপথে দেশের রপ্তানি পণ্যের প্রায় পুরোটাই যায় কনটেইনারে। জাহাজ থেকে দ্রুত কনটেইনার খালাস এবং রপ্তানি কনটেইনার দ্রুত জাহাজে তুলে দেওয়া গেলে আমদানিকারক ও রপ্তানিকারক উভয় পক্ষের সময় ও খরচ কমে।
তবে টার্মিনাল ও অপারেটরের সংখ্যা বাড়লেও এখনো ব্যবহারকারীর পছন্দের ভিত্তিতে পুরোপুরি প্রতিযোগিতা তৈরি হয়নি। কোন জাহাজ কোন জেটিতে ভিড়বে, তা নির্ধারণে বন্দর কর্তৃপক্ষের বড় ভূমিকা রয়েছে। ফলে সেবা ও মাশুলে প্রতিযোগিতার সুফল পেতে অপারেটরভিত্তিক কর্মদক্ষতার মানদণ্ড, সেবার সময়সীমা ও মাশুল নির্ধারণের কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, কনটেইনার টার্মিনালগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা তৈরি হওয়া ইতিবাচক। তবে ব্যবহারকারীদের প্রকৃত সুফল দিতে নির্দিষ্ট একক মাশুলের বদলে মাশুলের সর্বোচ্চ সীমা বেঁধে দেওয়া যেতে পারে। কোনো অপারেটর চাইলে এর নিচে কম খরচে উন্নত সেবা দিতে পারবে। এতে প্রতিযোগিতা বাড়বে, ব্যবহারকারীরাও সুফল পাবে।