১৫ বছরে ৯ বারই আলুতে লোকসান দিলেন ঠাকুরগাঁওয়ের কৃষক
শুরু হয়েছে আলুর নতুন মৌসুম। জমি থেকে আলু তুলতে ব্যস্ত এখন কৃষক। মৌসুমের শুরুতে নতুন আলুর চাহিদা সব সময় বেশি থাকে, এ কারণে কৃষকও ভালো দাম পান। কিন্তু এবারের চিত্রটি উল্টো। হিমাগারে পুরোনো আলু অবিক্রীত থেকে যাওয়ায় বাজারে নতুন আলুর দাম কম। এ অবস্থায় ঠাকুরগাঁওয়ের আলুচাষিরা বড় অঙ্কের লোকসানের শঙ্কায় রয়েছেন।
কৃষকেরা বলছেন, আলুতে লোকসান নতুন কিছু নয়। গত ১৫ বছরের মধ্যে ৯ বছরই আলুতে লোকসান দিয়েছেন তাঁরা। লোকসানের ৯ বছরের মধ্যে চার বছর পুঁজি পর্যন্ত ফেরত পাননি অনেক কৃষক।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ঠাকুরগাঁও কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত মৌসুমে জেলায় ৩৪ হাজার ৭২৫ হেক্টর (এক হেক্টর সমান ২ দশমিক ৪৭ একর) জমিতে আলু চাষ হয়েছিল। এসব জমি থেকে পাওয়া গেছে ৮ লাখ ৬৮ হাজার ১২৫ মেট্রিক টন আলু। আলু সংরক্ষণের জন্য জেলায় ১৭টি হিমাগার রয়েছে। এসব হিমাগারে এক লাখ ৪৫ হাজার ৫৩২ মেট্রিক টন আলু সংরক্ষণ করা যায়। বেশি সংরক্ষণের সুযোগ না থাকায় গত মৌসুমে অধিকাংশ চাষির উৎপাদিত আলু থেকে গেছে সংরক্ষণের বাইরে। সেই আলু বিক্রি শেষ হয়েছে গত আগস্টে। ফলে হিমাগারে রাখা আলু বিক্রি হয়েছে কম। তাতে হিমাগারে অবিক্রীত অনেক আলু রয়ে গেছে। এ অবস্থায় নতুন আলু বাজারে ওঠায় লোকসানের শঙ্কায় রয়েছেন চাষিরা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এবারের মৌসুমে জেলায় ২৮ হাজার হেক্টর জমিতে আলু আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল। তবে আবাদ হয়েছে ২৮ হাজার ২৮৫ হেক্টর জমিতে। আর উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে সাত লাখ মেট্রিক টন।
আলুর বাজারমূল্যের বিপর্যয় ঠেকাতে প্রক্রিয়াজাত কারখানার সংখ্যা বৃদ্ধি ও রপ্তানির উদ্যোগ এবং সরকারি-বেসরকারি ত্রাণ কার্যক্রমে আলু যুক্ত করা উচিত।আরমান হোসেন, সাধারণ সম্পাদক, জেলা হিমাগার অ্যাসোসিয়েশন
বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশন সূত্রে জানা যায়, প্রতিবছর ১৫ নভেম্বর হিমাগারের কুলিং মেশিন বন্ধ করে দেওয়া হয়। কিন্তু এবার হিমাগার খালি না হওয়ায় আরও মাসখানেক কুলিং মেশিন চালু রাখে কর্তৃপক্ষ। এরপরও ঠাকুরগাঁও সদরের হাওলাদার হিমাগারে গত শুক্রবার পর্যন্ত ২৫ হাজার বস্তা আলু অবিক্রীত ছিল। আর জেলা সদরের মুন্সিরহাট এলাকার জায়েন্ট হিমাগারে ছিল ১৮ হাজার বস্তা আলু। অবিক্রীত এসব আলু নিয়ে এখন হিমাগার কর্তৃপক্ষ বিপাকে পড়েছে।
এদিকে বাজারে নতুন আলু উঠেছে। গত শুক্রবার সদর, বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায় মাঠে কৃষকের আলু তোলার ব্যস্ততা। বালিয়াডাঙ্গী মহাজনপাড়া এলাকার আলুচাষি সোহেল হোসেন জানান, গত বছর তিনি ১৬ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছিলেন। উৎপাদন খরচ পড়েছিল কেজিতে ২২ থেকে ২৫ টাকা। সেই আলু বিক্রি করেছেন ১২ থেকে ১৪ টাকায়। এ কারণে এ বছর তিনি আলু চাষ করেননি। চাষের বদলে তিনি আলুর ব্যবসা শুরু করেন। গত শুক্রবার প্রতি কেজি আলু কিনেছেন ১৩ টাকায়। কিছুদিন আগে মাঠে আলুর দাম কেজিতে ১৮ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল।
গত বছর আলুতে বড় অঙ্কের লোকসান হয়েছে কৃষকের। এবারও মৌসুমের শুরুতে লোকসানের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। তাই আলুচাষিদের মধ্যে দেখা দিয়েছে চরম হতাশা। সদর উপজেলার হারাগাছপাড়া গ্রামের কৃষক রণজিৎ বর্মণ জানান, তিনি হিমাগারে ১২০ বস্তা আলু রেখেছিলেন। সেই আলু বিক্রি করে হিমাগারের ভাড়া ও অন্যান্য খরচ মেটাতে পারেননি। আলু বিক্রি করে খরচ না ওঠায় শেষ পর্যন্ত জমানো টাকা থেকে ১৬ হাজার টাকা বাড়তি খরচ করতে হয়েছে।
একই গ্রামের আলুচাষি শামসুল আলম জানান, হিমাগারে তিনি ৩৫০ বস্তা আলু রেখেছিলেন। যখন আলুর দাম কমে গেছে তখন হিসাব করে দেখেন হিমাগার থেকে আলু বের করলে ৮৬ হাজার টাকা পকেট থেকে দিতে হবে। তাই হিমাগারের আলু হিমাগারেই রেখে দিয়েছেন।
এ বছর চার বিঘা জমিতে আগাম আলু চাষ করেছেন বালিয়াডাঙ্গীর শাহবাজপুর গ্রামের বাসিন্দা নুর আলম। সেই আলু বিক্রি করেছেন প্রতি কেজি ১২ টাকায়। নুর আলম বলেন, ‘আলু চাষ করে আমরা আর্থিকভাবে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছি।’
গত মৌসুমে হিমাগারে সংরক্ষণের পাশাপাশি কৃষকের ঘরেও রেকর্ড পরিমাণ আলু ছিল।... এ কারণে এবার মৌসুমের শুরুতে নতুন আলুর দাম কম।মাজেদুল ইসলাম, উপপরিচালক, জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর
সদর উপজেলার ঢোলারহাট এলাকার আলুচাষি অচিন্ত বর্মণ জানান, একসময় আলু ছিল লাভজনক ফসল। এখন সেটা কৃষকের কাছে হয়ে উঠেছে অনিশ্চয়তার ফসল। দিন দিন খরচ বাড়ছে, দাম কমছে। এ সময়ে বিকল্প ফসল চাষের সুযোগ না থাকায় কৃষকেরা অন্য ফসল চাষও করতে পারছেন না।
দীর্ঘদিন ধরে আলুর উৎপাদন ও বাজারদর বিশ্লেষণ করে আসছেন ঠাকুরগাঁও আলুচাষি ও ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির উপদেষ্টা নুরুল হুদা। তিনি প্রথম আলোকে জানান, গত ১৫ মৌসুমের মধ্যে ৯ মৌসুমই আলু আবাদ করে ক্ষতির মুখে পড়েছেন এখানকার কৃষকেরা। এর মধ্যে চার বছর ছিল আলুর জন্য দুর্যোগের বছর। দরপতনের কারণে ওই বছরগুলোতে আলুচাষি, ব্যবসায়ী ও হিমাগার কর্তৃপক্ষ—সবারই বড় লোকসান হয়েছে।
স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কৃষকেরা ২০১২, ২০১৬, ২০১৯, ২০২০, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে আলু চাষ করে লাভ করেছেন। আর ২০১৪, ২০১৫, ২০১৮, ২০২১ ও ২০২২ সালে লোকসান আর ২০১১, ২০১৩, ২০১৭ ও ২০২৫ সালে আলু চাষ করে শুধু কৃষক নয়, ব্যবসায়ী ও হিমাগার কর্তৃপক্ষও বড় ক্ষতির মুখে পড়ে।
ঠাকুরগাঁও জেলা হিমাগার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আরমান হোসেন জানান, শুধু এই জেলায় নয়। সারা দেশেই হিমাগারগুলোতে পুরোনো আলু অবিক্রীত পড়ে আছে। এ কারণে বাজারে নতুন আলুর দাম কম। আলুর বাজারমূল্যে বিপর্যয় ঠেকাতে প্রক্রিয়াজাত কারখানার সংখ্যা বৃদ্ধি ও রপ্তানির উদ্যোগ এবং সরকরি-বেসরকারি ত্রাণ কার্যক্রমে আলু যুক্ত করার পরামর্শ দেন এই ব্যবসায়ী।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ঠাকুরগাঁও কার্যালয়ের উপপরিচালক মাজেদুল ইসলাম বলেন, গত মৌসুমে হিমাগারে সংরক্ষণের পাশাপাশি কৃষকের ঘরেও রেকর্ড পরিমাণ আলু ছিল। চাহিদার তুলনায় সংরক্ষণের পরিমাণ বেশি হওয়ায় হিমাগার থেকে এখনো আলু বের হয়নি। আবার হিমাগারের আলু বের না হতেই বাজারে নতুন আলু উঠেছে। এ কারণে এবার মৌসুমের শুরুতে নতুন আলুর দাম কম। মাজেদুল ইসলাম আরও বলেন, যখন লাভ দেখেন তখন সব কৃষক আলু আবাদে ঝুঁকে পড়েন। এ কারণে তাঁরা লাভের মুখ দেখেন না।