বিশেষ সাক্ষাৎকার: আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী

চাইলেই কাল সকালে বিদ্যুৎ আর গ্যাস দিতে পারব না

সরকার ছয় মাসে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে, আরও নেওয়ার অপেক্ষায়। গ্যাস–বিদ্যুতের সমস্যা, রাজস্ব আদায় পরিস্থিতি, আইএমএফ থেকে ঋণ, বিনিয়োগ পরিস্থিতি, সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতনকাঠামো নিয়ে শুক্রবার গুলশানের বাসায় কথা বলেছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিশেষ প্রতিনিধি ফখরুল ইসলাম

প্রথম আলো:

অর্থবছর বদলালেন কেন? এতে কী লাভ হবে?

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী: অর্থবছরটা এত দিন ছিল জুলাই–জুন। এখন হবে এপ্রিল–মার্চ। অর্থবছর জুলাইয়ে যখন শুরু হয়, তখন থাকে বর্ষাকাল। আমরা দেখেছি যে প্রস্তুতি নেওয়া হয় শুষ্ক মৌসুমে, কাজ শুরু হয় বর্ষাকালে। এতে বাজেট বাস্তবায়ন পিছিয়ে যায়। বেশির ভাগ কাজ হয় শেষ দিকে। অর্থাৎ প্রস্তুতি নিতে নিতেই ভালো একটা সময় চলে যায়। এখন শুষ্ক মৌসুমে পুরোদমে কাজ করা যাবে। প্রকল্প বাস্তবায়নটা অনেক সহজ হয়ে যাবে। এত দিন তো কাজ শুরু হতো পানির মধ্যে। এতে একদিকে অপচয় হতো, অন্যদিকে হতো দুর্নীতি। আমরা বলি না, টাকা পানিতে গেল। এটাও সে রকম। শেষ মুহূর্তে টাকা ছাড় করলে অনেক ক্ষেত্রে তা সব পানিতে যেত। এখান থেকে বেরিয়ে আসার জন্যই নতুন অর্থবছরের সিদ্ধান্ত নিলাম।

প্রথম আলো:

এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কোনো সমীক্ষা বা বিশ্লেষণ করা হয়েছে?

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী: তা করতে হবে কেন? আমাদের হাতেই তো সব আছে। সব তো দেখতেই পাচ্ছি। নতুন সিদ্ধান্তে প্রকল্প বাস্তবায়নটা অনেক তাড়াতাড়ি হবে, অর্থের অপচয় কম হবে এবং দুর্নীতিও কম হবে বলে আমরা আশা করছি।

প্রথম আলো:

ছয় মাস আগে দায়িত্ব নেওয়ার সময় অর্থনীতির যে অবস্থা পেয়েছিলেন, এখন কোন কোন সূচকে আমরা একটু ভালো আছি? সাফল্য ও ব্যর্থতা জানতে চাই। কী কী করতে পারছেন না? বাধা কোথায়?

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী: সাফল্যের কথা বলছি। প্রথমত, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ গত ১৫ ফেব্রুয়ারি ছিল ৩৪ দশমিক শূন্য ২ বিলিয়ন ডলার। ১৩ আগস্ট তা বেড়ে ৩৭ দশমিক ১১ বিলিয়নে উন্নীত হয়েছে। লেনদেনের ভারসাম্য ২৬ জানুয়ারি ছিল ২ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলার উদ্বৃত্ত। গত ২৬ জুলাই তা উন্নীত হয়েছে ৬ দশমিক ৬১ বিলিয়ন ডলারে। আর আমরা সবাই জানি, রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি অব্যাহত আছে। নীতি সুদহার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়েছে। আন্তব্যাংক লেনদেনসহ অন্য সুদহারও কমছে। ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা ফিরতে শুরু করেছে। ব্যাংক খাতে আমানতের প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী হয়েছে। অর্থ পাচারও মোটামুটি প্রতিরোধ করতে সক্ষম হয়েছি। ঋণখেলাপির সংস্কৃতি নিরুৎসাহিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ব্যাংক খাতে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার জন্য নেওয়া হয়েছে কঠোর অবস্থান। খেলাপি ঋণ যাতে আর না বাড়তে না পারে সে জন্য সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নেওয়া পদক্ষেপগুলো কাজ করতে শুরু করেছে। ছয় মাসে আর্থিক খাতে ভালো উন্নয়ন হয়েছে বলে মনে করছি।

প্রথমেই বলব মূল্যস্ফীতি। জুলাই মাসে কিছু কমিয়েছি। কিন্তু আমরা এখনো মনে করি না যে তা নিয়ন্ত্রণে এসেছে। আরও কমানোর দরকার। দ্বিতীয়ত, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ এবং ঋণের প্রবৃদ্ধি আশানুরূপ বাড়েনি। তৃতীয়ত, গ্যাস–বিদ্যুতের সমস্যা আছেই। শিল্পে উৎপাদনটাও কাঙ্ক্ষিত জায়গায় আমরা পৌঁছাতে পারিনি। এগুলো একটার সঙ্গে আরেকটা জড়িত। চাইলেই কাল সকালে বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়াতে পারব না, গ্যাসও দিতে পারব না। সময় লাগবে।
প্রথম আলো:

ব্যর্থতাগুলো তাহলে কী?

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী: প্রথমেই বলব মূল্যস্ফীতি। জুলাই মাসে কিছু কমিয়েছি। কিন্তু আমরা এখনো মনে করি না যে তা নিয়ন্ত্রণে এসেছে। আরও কমানোর দরকার। দ্বিতীয়ত, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ এবং ঋণের প্রবৃদ্ধি আশানুরূপ বাড়েনি। তৃতীয়ত, গ্যাস–বিদ্যুতের সমস্যা আছেই। শিল্পে উৎপাদনটাও কাঙ্ক্ষিত জায়গায় আমরা পৌঁছাতে পারিনি। এগুলো একটার সঙ্গে আরেকটা জড়িত। চাইলেই কাল সকালে বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়াতে পারব না, গ্যাসও দিতে পারব না। সময় লাগবে। তবে আমাদের বেশি ক্ষতি করেছে বাইরের চাপ। আমাদের দুর্ভাগ্য যে দায়িত্ব নেওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যেই শুরু হয়ে গেল মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ। আর এ কারণে সব পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। তেল–গ্যাসের কথা তো আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তেল–গ্যাসের দাম বাড়ার কারণে উৎপাদনশীলতায় প্রভাব পড়েছে।

প্রথম আলোর সঙ্গে সাক্ষাৎকারে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী
ছবি: প্রথম আলো
প্রথম আলো:

চাইলেও বাধার কারণে কী কী করতে পারছেন না, সেটা তো বললেন না?

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী: না, কারও বাধার সম্মুখীন হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আমরা একটা নির্বাচিত সরকার। আমাদের একটা নির্বাচনী ইশতেহার আছে। প্রতিশ্রুতি আছে জনগণের কাছে। আমাদের প্রথম কাজ হচ্ছে সেই প্রতিশ্রুতি পরিপূর্ণভাবে পালন করা এবং সেগুলো আমরা একটার পর একটা করে যাচ্ছি। অর্থনীতির ভালো–খারাপ দিক থাকবে। কিন্তু নাগরিকদের প্রতি আমাদের মৌলিক দায়িত্বগুলো পালন করে যাব।

করনীতি যদি ঠিকভাবে না হয় এবং ঠিক ব্যক্তির মাধ্যমে নির্ধারিত না হয়, তাহলে পুরো করব্যবস্থার ওপর এর প্রভাব পড়ে। এটা আমরা দেখে আসছি। এ জন্য আমরা ঠিক করেছি করনীতি যাঁরা করবেন, শুধু আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তা হবে না। বিশেষজ্ঞ দল বসে এটা করবে। নিজস্ব মতামতের বাইরেও তারা অংশীজনদের সঙ্গে আলাপ–আলোচনা করবে।
প্রথম আলো:

অন্তর্বর্তী সরকার বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছিল। যেমন বিনিময় হার আরও বেশি বাজারভিত্তিক করা, পাঁচ ব্যাংক একীভূত করা, এনবিআরকে দুই ভাগ করা, পাচার করা অর্থ ফিরিয়ে আনতে ব্যবসায়ী গ্রুপের তালিকা করে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ নেওয়া, ব্যাংক রেজোল্যুশন অ্যাক্ট করা। এগুলোর মধ্যে কোন কোন উদ্যোগ আপনি সমর্থন করছেন না। অর্থাৎ না হলে ভালো হতো। যার দায় এখন আপনাদের বহন করতে হচ্ছে।

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী: এগুলো তো পরিপূর্ণভাবে পালন করছি। তবে কিছু কিছু ব্যাপারে তারা আধাআধি কাজ করেছে, যা আমাদের জন্য একটু অসুবিধা সৃষ্টি করেছে এবং আমাদের একটু বেগ পেতে হচ্ছে। বিষয়গুলোয় তারা ভালো ব্যবস্থাপনা করতে পারেনি। যেমন এনবিআর দুই ভাগে ভাগ তারা আধাআধি করে চলে গেছে। এখানে কিছু সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের এখন তা ঠিক করতে হচ্ছে। এ–সংক্রান্ত বিলটা এ জন্য আমরা পাস করিনি এখনো। করনীতি যদি ঠিকভাবে না হয় এবং ঠিক ব্যক্তির মাধ্যমে নির্ধারিত না হয়, তাহলে পুরো করব্যবস্থার ওপর এর প্রভাব পড়ে। এটা আমরা দেখে আসছি। এ জন্য আমরা ঠিক করেছি করনীতি যাঁরা করবেন, শুধু আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তা হবে না। বিশেষজ্ঞ দল বসে এটা করবে। নিজস্ব মতামতের বাইরেও তারা অংশীজনদের সঙ্গে আলাপ–আলোচনা করবে। করনীতি অনুযায়ী কর আদায় করা হলে মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রা, পরিবেশ ইত্যাদির ওপর কী প্রভাব পড়বে, থাকবে তার মূল্যায়নও। কিন্তু অর্ন্তবর্তী সরকার এটা এমনভাবে রেখে গেছে, অনেক ঝামেলা হয়েছে। এগুলো আমি বলতে চাই না। কাজ চলছে। এনবিআর দুই ভাগ হবে।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী
ছবি: প্রথম আলো
প্রথম আলো:

পাঁচ ব্যাংক একীভূতসহ অন্যগুলো?

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী: এটাও আধাআধি করে গেছে। ভালো–মন্দ এখন আমি বলতে চাই না। ব্যাংক রেজোল্যুশন বিষয়টা খুবই কঠিন। প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা ঘাটতি। তা পূরণ করা সরকারের একার পক্ষে কঠিন। আবার বিদেশে পাচার হয়েছে অনেক। এটা হয়তো আরও ভালোভাবে করা যেত। যেহেতু হয়ে গেছে, এখন এটাকে কীভাবে ভালোভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, সেটাই হচ্ছে আমাদের দায়িত্ব। কাজটা চলছে ইনশা আল্লাহ। আমরা করতে পারব। একটু সময় লাগবে। অন্যভাবে করা যেত, ওই বিতর্কে যাওয়ার আর প্রয়োজন নেই। আমানতকারীদের টাকা যাতে আমরা সুরক্ষা দিতে পারি, এটা হচ্ছে অগ্রাধিকার। ব্যাংক রেজোল্যুশনে একটা ধারা যুক্ত করা হয়েছিল, তা বাতিল হয়েছে। বাকি সব ঠিকই আছে। আর বিনিময় হার তো প্রায় বাজারভিত্তিক।

প্রথম আলো:

পাঁচ ব্যাংকের আমানতকারী যাঁরা এক কোটি, দুই কোটি, পাঁচ কোটি টাকা রেখেছিলেন, তা কি ফেরত পাবেন তাঁরা?

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী: পূর্ণ উদ্যমে এর ওপর কাজ করছি। আমানতকারীদের যদি সুরক্ষা দিতে না পারি, তাঁরা যদি ব্যাংক খাতের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেন, তাহলে তো অর্থনীতি কাজ করবে না। সময় লাগলেও এটা আমরা বাস্তবায়ন করব।

আবার বলছি, যাঁরাই ব্যাংকে আমানত রেখেছেন, তাঁদের টাকাটা যদি সব এই ব্যাংকব্যবস্থায় সুরক্ষা না পায়, তাহলে জনগণ আস্থা হারিয়ে ফেলবেন। সুতরাং আমাদের উদ্যোগ ক্ষুদ্র বা বড় না, সবার জন্য।
প্রথম আলো:

কোন ধরনের আমানতকারীর কথা বললেন? ক্ষুদ্র, না বৃহৎ?

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী: আমানতকারী বলতে আমানতকারী। এখানে বড়–ছোট বিষয় নেই। আবার বলছি, যাঁরাই ব্যাংকে আমানত রেখেছেন, তাঁদের টাকাটা যদি সব এই ব্যাংকব্যবস্থায় সুরক্ষা না পায়, তাহলে জনগণ আস্থা হারিয়ে ফেলবেন। সুতরাং আমাদের উদ্যোগ ক্ষুদ্র বা বড় না, সবার জন্য। মানুষ অনেক কষ্ট করে সারা জীবনের অর্জিত আয় ব্যাংকে রেখেছেন, আশা করি ফেরত দেওয়ার ব্যাপারে সফল হতে পারব।

প্রথম আলো:

আপনি অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর সংস্কারের কথা বলে আসছেন। নিয়ন্ত্রণমুক্ত করা বা ডিরেগুলেশনের কথাও বলেছেন অনেকবার। কতটুকু করতে পেরেছেন?

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী: এটাও একটা কঠিন কাজ। বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে এ সমস্যা এত গভীরে যে শিকড় উপড়ে ফেলতে সময় লাগবে। কারণ, এগুলোর সঙ্গে জড়িত দুর্নীতিবাজ ব্যবসায়ী ও দুর্নীতিবাজ সরকারি কর্মকর্তারা। তবে এটা করেই ছাড়ব। এটা যদি করতে না পারি অর্থনীতি নিয়ে আমরা যে জায়গায় যেতে চাই, তা পারব না। এটা করতে না পারলে অর্থনীতির গণতান্ত্রায়ণের কথা যে বলছি, তা–ও পারব না। ডিরেগুলেশন বা নিয়ন্ত্রণমুক্ত করা না হলে বিনিয়োগ হবে না। বিনিয়োগ না হলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে না এবং অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধিও আসবে না। পৃষ্ঠপোষকতার অর্থনীতির কারণে বিগত দিনে দেশটা ওভাররেগুলেটেড হয়ে গিয়েছিল।

ইশতেহার অনুযায়ী যেসব পদক্ষেপ নিয়েছি ও নিচ্ছি, যদি পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে পারি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, প্রবৃদ্ধি বাড়বে, মূল্যস্ফীতিও কমবে।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী
ছবি: প্রথম আলো
প্রথম আলো:

বাজারদর, আয় ও কর্মসংস্থান দিয়ে সরকারের সাফল্য বিবেচনা করে সাধারণ মানুষ। ছয় মাসে তিনটির কোনটিতে মানুষ বাস্তব পরিবর্তন দেখতে পেয়েছে?

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী: কর্মসংস্থানের জন্যই তো ৬৫ হাজার কোটি টাকার একটা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের মাধ্যমেই কিন্তু বেশি কর্মসংস্থান হয়। নীতিসুদটাও কমানো হয়েছে। মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছে। মোটামুটি বাজারভিত্তিক একটা বিনিময় হার কাজ করছে। ব্যাংক খাতেই ১২–১৩ হাজার জনের চাকরি হয়েছে। বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্যই শুল্কহার ডিরেগুলেশন করেছি, শিথিল করেছি। ইশতেহার অনুযায়ী যেসব পদক্ষেপ নিয়েছি ও নিচ্ছি, যদি পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে পারি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, প্রবৃদ্ধি বাড়বে, মূল্যস্ফীতিও কমবে।

প্রথম আলো:

প্রবৃদ্ধি বাড়ানো না মূল্যস্ফীতি কমানো—কোনটাতে অগ্রাধিকার দেবেন?

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী: প্রবৃদ্ধিও করতে হবে এবং মূল্যস্ফীতিও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। মূল্যস্ফীতির সঙ্গে বিদেশের কারণও জড়িত। এর ওপর আমাদের হাত নেই। দেশের ভেতরে যদি ব্যবসায়ের খরচ কমাতে পারি (কস্ট অব ডুইং বিজনেস), ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে পারি, তাহলে একটা ফল পাবই। বিগত দিনে দুর্নীতি ও করব্যবস্থার কারণে মানুষের কষ্ট বেড়েছে।

অর্থনীতি, ব্যবসা–বাণিজ্যে যাতে সবাই অংশগ্রহণ করতে পারেন, সবাই অর্থনীতির সুফল পান, সে পরিবেশ তৈরি করেছি ও আরও করব। এমনকি শেয়ারবাজারেও যে বড় ধরনের সমস্যা ছিল, দুর্নীতি ও লুটপাট ছিল, এগুলো আর হবে না।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী
ছবি: প্রথম আলো
প্রথম আলো:

বাংলাদেশে কেন মানুষ বিনিয়োগ করবে?

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী: বাংলাদেশে তো বিনিয়োগ হয়েছে। বাংলাদেশিরা করেছে, বিদেশিরাও করেছে। তবে পৃষ্ঠপোষকতার রাজনীতি থেকে বের হয়ে না এলে সত্যিকারের বিনিয়োগকারী কেউ এখানে আসবে না। সেই পরিবেশটা আমরা সৃষ্টি করতে পেরেছি। আমাদের স্পষ্ট বার্তা হচ্ছে—এখন আর পৃষ্ঠপোষকতার কিছু থাকবে না। অর্থনীতি, ব্যবসা–বাণিজ্যে যাতে সবাই অংশগ্রহণ করতে পারেন, সবাই অর্থনীতির সুফল পান, সে পরিবেশ তৈরি করেছি ও আরও করব। এমনকি শেয়ারবাজারেও যে বড় ধরনের সমস্যা ছিল, দুর্নীতি ও লুটপাট ছিল, এগুলো আর হবে না। এটা তো ক্যাসিনোর মতো হয়ে গিয়েছিল। ক্যাসিনোতে তো কোনো ভালো কোম্পানি যাবে না। এখন আমরা যে পরিবেশ সৃষ্টি করেছি, নতুন কমিশন গঠন করেছি এবং এই কমিশনের ওপর জনগণের আস্থা ফিরে এসেছে। ইতিমধ্যে দেখবেন শেয়ারবাজার কিন্তু ঊর্ধ্বগতির দিকে যাচ্ছে। নতুন নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্ত হওয়ার জন্য উৎসাহিত হচ্ছে। আরেকটা বিষয় আছে এখানে। ব্যাংক খাতের সঙ্গে শেয়ারবাজারের একটা সংযোগ আছে। শেয়ারবাজারটা ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল বিগত দিনে। সবাইকে বাধ্য করা হয়েছিল ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে। এটা হয় না। এত বড় বড় ঋণ, এত উচ্চ সুদে—এটা কীভাবে সম্ভব? ব্যাংকগুলো স্বল্প সময়ের জন্য আমানত নিয়ে লম্বা সময়ের জন্য ঋণ দিয়েছে। এটা তো হওয়ার কথা না। বৃহৎ অর্থায়নের জায়গা হচ্ছে শেয়ারবাজার। ব্যাংক দেবে চলতি মূলধন।

প্রথম আলো:

বৃহৎ অর্থায়নের জন্য শেয়ারবাজার, আর চলতি মূলধনের জন্য ব্যাংক—এই চিত্র আমরা কবে দেখতে পাব?

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী: দিনক্ষণ বলে দিয়ে তো আর অর্থনীতি হয় না। অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার করার জন্য যে পদক্ষেপ নিয়েছি, আইন–কানুন বদলেছে, আরও বদলাবে। শেয়ারবাজারের প্রতি আস্থাটা বড় কথা। কমিশন বদলানোর পর আস্থা ফিরেছে।

প্রথম আলো:

আরও আগে কেন বদলালেন না? তাতে তো আস্থা আরও আগেই ফিরত।

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী: নিয়োগগুলো দিতে সময় লাগে। তাড়াহুড়া করে কাউকে দেওয়া যায় না। এর পেছনে আমাদের তিন মাস কাজ করতে হয়েছে। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আর্থিক খাতে রাজনৈতিক কাউকে নিয়োগ দেব না। ঠিক লোক বাছাই করতে সময় লেগেছে। তাঁদের সততা, দক্ষতা দেখতে হয়েছে। যখনই নিয়োগ হয়েছে, তখনই মানুষ দেখতে পেয়েছে যে ঠিক লোক নিয়োগ পেয়েছেন।

পৃষ্ঠপোষকতার মডেল থেকে গণতন্ত্রায়ণের মডেলে যাওয়ার ট্রানজিশনে আছি। ইতিমধ্যে কিছু ফল পেয়েছি। আমরা যেসব নীতিপদক্ষেপ নিয়েছি, বেসরকারি খাত তাতে অত্যন্ত উৎসাহিত। যে বাজেট দিয়েছি, বেসরকারি খাতের পক্ষ থেকে পূর্ণ সমর্থন পাচ্ছি।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী
ছবি: প্রথম আলো
প্রথম আলো:

সম্প্রতি বিভিন্ন সংস্থা বা করপোরেশনের চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ছাত্রদল বা যুবদলের সাবেক নেতাদের।

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী: ওগুলো ঠিক আছে। আমি আর্থিক খাতের কথা বুঝিয়েছি। তবে এসব সংস্থায় কিন্তু যথাযথ নিরীক্ষা হবে। এত দিন তো নিরীক্ষাটাও ঠিক ছিল না।

প্রথম আলো:

আপনি বিনিয়োগ–কর্মসংস্থানের কথা বলছিলেন। বেসরকারি খাতের নিম্ন ঋণপ্রবৃদ্ধির কথাও আপনার জানা। সোনালীসহ রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলো যে উদ্যোক্তাদের ঋণ দেওয়ার বদলে ট্রেজারি বন্ডে বেশি বিনিয়োগ করছে, এটা কি তাদের কাজ?

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী: আপনি ঠিক জায়গাটায় হাত দিয়েছেন। আমি জানি এবং এটা বন্ধ করে দিচ্ছি। কত ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ করবে পারবে, এর একটা সীমা করে দেব। বাকিটা বেসরকারি খাতে দিতে হবে। ব্যাংকের দায়িত্ব আছে জনগণের প্রতি। যে ব্যাংক ট্রেজারি বন্ডে নিরাপদ বিনিয়োগের মাধ্যমে মুনাফা করে পারফরমান্স দেখাচ্ছে, প্রকৃতপক্ষে ওই ব্যাংকের পারফরমান্স দুর্বল।

আমরা ব্যবসায়ীদের উৎসাহিত করছি তাঁরা যাতে শেয়ারবাজারে যান। শেয়ারবাজার থেকে ঋণ নিলে সুদ নেই। মুনাফা করলে লভ্যাংশ দেবেন।
প্রথম আলো:

ডলার বাজার ও রিজার্ভে স্বস্তি দেখলেও মূলধনি যন্ত্রপাতি ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানি কমছে। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি সর্বনিম্ন। ব্যবসায়ীরা ছয় মাস পরও নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে অপেক্ষা করছেন কেন? আর কত দিন অপেক্ষা করতে হবে?

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী: আওয়ামী লীগ ও অন্তর্বর্তী—দুই সরকার থেকেই আমরা একটা বিশাল সমস্যা পেয়েছি। এটা রাতারাতি ঠিক হওয়ার বিষয় নয়। চেষ্টা করছি কত তাড়াতাড়ি এটা থেকে বের হওয়া যায়। একটু সময় লাগবে। পৃষ্ঠপোষকতার মডেল থেকে গণতন্ত্রায়ণের মডেলে যাওয়ার ট্রানজিশনে আছি। ইতিমধ্যে কিছু ফল পেয়েছি। আমরা যেসব নীতিপদক্ষেপ নিয়েছি, বেসরকারি খাত তাতে অত্যন্ত উৎসাহিত। যে বাজেট দিয়েছি, বেসরকারি খাতের পক্ষ থেকে পূর্ণ সমর্থন পাচ্ছি। তারা এ বাজেটকে স্বাগত জানিয়েছে। আপনারাও দেখেছেন যে বাজেটের পরে দ্রব্যমূল্য বাড়েনি।

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী
ছবি: প্রথম আলো
প্রথম আলো:

নীতি সুদহার কমানোর কথা যে বললেন, বিনিয়োগের জন্য এটা কি যথেষ্ট? এখানে গ্যাস–বিদ্যুতের সংকট, চাঁদাবাজি, দুর্বল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আছে। এসব রেখে শুধু নীতি সুদহার কমালেই কি বিনিয়োগ আসবে?

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী: তা ঠিক, আমি আপনার সঙ্গে একমত। তবে আমার বক্তব্য হচ্ছে অর্থনীতির গতিটা অনুসরণ করতে হবে। এটা কি নিম্নগতির দিকে যাচ্ছে? তা তো না। আমরা ব্যবসায়ীদের উৎসাহিত করছি তাঁরা যাতে শেয়ারবাজারে যান। শেয়ারবাজার থেকে ঋণ নিলে সুদ নেই। মুনাফা করলে লভ্যাংশ দেবেন। সরাসরি তালিকাভুক্তি সহজ করে দিচ্ছি। আগে যেখানে বছরের পর বছর আবেদন পরে থাকত, এখন তিন মাসের মধ্যে প্রক্রিয়াটা শেষ হয়ে যাবে। ২০টি কোম্পানি বোধ হয় তালিকাভুক্তির দিকে যাচ্ছে। আর বাকি বিষয়গুলো একটু সময় লাগবে।

আমি দুই বছর, চার বছরের কথা বলেছি ভঙ্গুর অবস্থা থেকে স্থিতিশীলতা ও স্থিতিশীলতা থেকে সমৃদ্ধির দিকে যাওয়ার বিষয়ে। এটা পর্যায়ক্রমে হবে। দুর্ভাগ্যবশত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১৮ মাসও আমাদের নষ্ট হয়েছে। ১৮ মাস যে একটা সরকার ছিল, গ্যাসের দিকে তাদের নজরই ছিল না।
প্রথম আলো:

গ্যাস–বিদ্যুতের সংকট কাটাতে দুই বছর সময়ের কথা আপনি বলেছেন। আবার বলেছেন, অর্থনীতির স্থবিরতা কাটাতে দুই বছর ও পরিপূর্ণ ঘুরে দাঁড়াতে চার বছরের কথা। এ সময়ে উৎপাদন বাড়ানো, বন্ধ কারখানা চালু, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানো এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়গুলোয় সরকারের অন্তর্বর্তী পরিকল্পনা কী?

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী: আমি দুই বছর, চার বছরের কথা বলেছি ভঙ্গুর অবস্থা থেকে স্থিতিশীলতা ও স্থিতিশীলতা থেকে সমৃদ্ধির দিকে যাওয়ার বিষয়ে। এটা পর্যায়ক্রমে হবে। দুর্ভাগ্যবশত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১৮ মাসও আমাদের নষ্ট হয়েছে। ১৮ মাস যে একটা সরকার ছিল, গ্যাসের দিকে তাদের নজরই ছিল না। সময়টা নষ্ট করেছে, আমাদেরও অনেক ক্ষতি করেছে। এতটা সময় বসে থেকে দেশটাকে আরও নিচে নিয়ে গেছে তারা। আমাদের এখন একসঙ্গে সব করতে হচ্ছে।

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী
ছবি: প্রথম আলো
প্রথম আলো:

আওয়ামী লীগের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কেও একই কাতারে রাখলেন?

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী: হ্যাঁ। আওয়ামী লীগের সাড়ে ১৫ বছরের সঙ্গে দেড় বছর যোগ করুন। ১৭ বছরেরর জঞ্জাল সাফ করে অর্থনীতি নিয়ে এগোতে হচ্ছে। আগে তো গর্ত থেকে বের করে আনতে হবে। তারপর স্থিতিশীল করতে হবে। তারপর অর্থনীতি সত্যিকারের গতি পাবে। চতুর্থ, পঞ্চম বছরে গিয়ে দেখবেন অর্থনীতি টেক অফ করবে। এ জন্য যত নীতিমালার কাজ, যত সংস্কার—এসব করছি এবং ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছি। বিদেশি তহবিল ব্যবস্থাপকেরাও আসছেন। আশা করছি, হংকং দুই বিলিয়ন মার্কিন ডলারের তহবিল নিয়ে আসবে। অর্থনীতির ওপর আস্থা সৃষ্টি হচ্ছে।

পাচার অর্থের মধ্যে ৭০ থেকে ৮০ হাজার কোটি টাকার মতো চিহ্নিত করা হয়েছে। আরও চিহ্নিত করার চেষ্টা আছে। এগুলো নিয়ে কাজ চলছে। আমি যদি বলি খুব শিগগির অর্থ বাইরে থেকে চলে আসবে, তাহলে ভুল তথ্য দেওয়া হবে।
প্রথম আলো:

খেলাপি ঋণ আর বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে ছয় মাসে দৃশ্যমান অগ্রগতি কতটা?

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী: পাচার অর্থের মধ্যে ৭০ থেকে ৮০ হাজার কোটি টাকার মতো চিহ্নিত করা হয়েছে। আরও চিহ্নিত করার চেষ্টা আছে। এগুলো নিয়ে কাজ চলছে। আমি যদি বলি খুব শিগগির অর্থ বাইরে থেকে চলে আসবে, তাহলে ভুল তথ্য দেওয়া হবে। যেসব দেশে অর্থ পাচার হয়েছে, সেসব দেশ থেকে বের করে আনা সহজ কাজ নয়। সেসব দেশের সরকারেরাও চায় না, যাদের কাছে অর্থ আছে তারাও চায় না। তবে উদ্ধারের কাজ চলছে। তবে যাঁরা চুরি করে দেশের বাইরে গিয়ে অর্থ ভোগ করবেন বলে মনে করছেন, তা হবে না। শেষ দিন পর্যন্ত উদ্ধারের চেষ্টা চলবে। কিছু ফল তো পাওয়া যাবে।

প্রথম আলো:

নির্বাচনী ইশতেহারে আর্থিক খাত সংস্কারে একটা কমিশন করা এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ বিলুপ্ত করার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। আপনি কি এখনো ওই জায়গায় আছেন?

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী: নিশ্চয়ই। আমাদের সংস্কারের কাজ চলছে। আপনি দেখবেন বাজেটে কিন্তু আমাদের বেশির ভাগ সংস্কারের পদক্ষেপ নিয়ে ফেলেছি। কমিশনের কাজটাই ছিল ডিরেগুলেশন। আমরা কিন্তু বেশির ভাগ ডিরেগুলেশন করেও ফেলেছি। বাকি যেগুলো আছে, যদি আমরা ফিডব্যাক পাই যে কোথাও কোনো অসুবিধা হচ্ছে, তা–ও করা যাবে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের বিষয়টিও আমাদের চিন্তার মধ্যে আছে। অর্থনীতি এত দুর্বল হয়ে গেছে যে এটা বন্ধ করলে কাল সকালেই যে অর্থনীতি ভালো হয়ে যাবে, তা কিন্তু নয়। আমাকে একটা ভালো জায়গায় যেতে হবে। তবে যেটা আমরা বলেছি, তা মাথায় আছে। অর্থনীতি একটু স্থিতিশীল হলেই ওই দিকে যাব।

আমাদের তো জনগণের প্রতি দায়িত্ব আছে। দেখুন, আমরা ছাড়া প্রায় বিশ্বের সব দেশ বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে। জ্বালানিসংকটের কারণে সবাই তেলের দাম বাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে দ্বিগুণ হয়ে গেছে, শ্রীলঙ্কায় ২৫ শতাংশ বেড়েছে। মানুষের এমনিতে ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। আমরা তো প্রথমে বাড়াতেই চাইনি। একদম শেষের দিকে এসে কিছু বাড়িয়েছি। তার পরে আছে ভর্তুকি।
প্রথম আলো:

আগের আইএমএফ কর্মসূচি দেশের স্বার্থের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয় বলে সরকার সরে এসেছিল। কোন শর্তগুলোতে আপত্তি ছিল? নতুন আইএমএফ কর্মসূচিতে কী কী সংস্কার করতে হবে? ভর্তুকি কমানো, কর বাড়ানো বা বিদ্যুৎ–জ্বালানির দাম বাড়ানোর শর্ত এলে সরকারের অবস্থান কী হবে?

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী: আমাদের তো জনগণের প্রতি দায়িত্ব আছে। দেখুন, আমরা ছাড়া প্রায় বিশ্বের সব দেশ বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে। জ্বালানিসংকটের কারণে সবাই তেলের দাম বাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে দ্বিগুণ হয়ে গেছে, শ্রীলঙ্কায় ২৫ শতাংশ বেড়েছে। মানুষের এমনিতে ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। আমরা তো প্রথমে বাড়াতেই চাইনি। একদম শেষের দিকে এসে কিছু বাড়িয়েছি। তার পরে আছে ভর্তুকি। তেলে ভর্তুকি তুলে দিলে বিদ্যুতের দাম চার–পাঁচ গুণ হয়ে যাবে। এটা কি বাংলাদেশের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে? বাংলাদেশের মানুষ তা বহন করতে পারবে? তারা তাদের কথা বলছে, আমরা বলছি আমরা সবকিছুই করব। তবে আজকের অর্থনৈতিক পটভূমিতে কিছু করা কঠিন। আলটিমেটলি আমাদের সে পথে যেতে হবে, তবে তার আগে আমার অর্থনীতিকে একটা জায়গায় যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী
ছবি: প্রথম আলো
প্রথম আলো:

আইএমএফের নতুন ঋণ কর্মসূচির কী খবর?

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী: আমরা তো আগের কর্মসূচি থেকে বেরিয়ে এসেছি। দেশের ও জনগণের স্বার্থের বিরুদ্ধে গিয়ে আইএমএফের ঋণ নিয়ে কোনো লাভ হবে না। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকার সবকিছু মেনে নিয়েছিল। ওদের তো জনগণের প্রতি কোনো দায়দায়িত্ব ছিল না। আমাদের তো দায়দায়িত্ব আছে। আমরা নির্বাচিত সরকার। বলেছি, ওই কর্মসূচি বাদ দাও। নতুন কর্মসূচি করো। নতুন কর্মসূচির হালনাগাদ হচ্ছে, আলোচনা শুরু হবে। ইতিমধ্যে বলেছি, সবকিছু করা হবে কিন্তু সিকোয়েন্স করতে হবে। তারা যেভাবে বলবে, সেভাবে না। নতুন কর্মসূচির আলোচনা নতুনভাবে শুরু হচ্ছে।

দেখুন, আমাদের কর–জিডিপি বিশ্বের মধ্যে সর্বনিম্ন। আমরা যে উদ্যোগ নিয়েছি, আশা করছি কর সংগ্রহ বাড়বে। বিগত দিনে কর সংগ্রহে অদক্ষতা ছিল, সুশাসনের অভাব ছিল, দুর্নীতি ছিল। এগুলোকে আমরা সংশোধন করে নিয়ে আসছি।
প্রথম আলো:

এমন কি হতে পারে যে আইএমএফের শর্ত যদি না মানা হয়, সে ক্ষেত্রে ঋণটা তো পাওয়া যাবে না।

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী: দেখা যাক। ঋণ তো বড় নয়। আমরা নির্বাচনী ইশতেহার দিয়েছি। জনগণ আমাদের বিশ্বাস করেছে। এটা আমার জন্য সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথম আলো:

একদিকে সরকারি কোষাগারে অর্থ না থাকার কথা বলছেন, অন্যদিকে নতুন বেতনকাঠামো ও বড় উন্নয়ন বাজেটের পরিকল্পনা করছেন। এই ব্যয়ের অর্থ কোথা থেকে আসবে? এতে ঋণ বা মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়বে বলে অনেকে মনে করছেন। আপনার অভিমত কী?

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী: দেখুন, আমাদের কর–জিডিপি বিশ্বের মধ্যে সর্বনিম্ন। আমরা যে উদ্যোগ নিয়েছি, আশা করছি কর সংগ্রহ বাড়বে। বিগত দিনে কর সংগ্রহে অদক্ষতা ছিল, সুশাসনের অভাব ছিল, দুর্নীতি ছিল। এগুলোকে আমরা সংশোধন করে নিয়ে আসছি। আপনারা দেখবেন গত অর্থবছরের চতুর্থ প্রান্তিকে ভালো আদায় হয়েছে। আসলে আমরা যে এ ব্যাপারে একটা স্বচ্ছতা নিয়ে আসার চেষ্টা করছি, তার একটা বার্তা গেছে। যে লক্ষ্যমাত্রা দিয়েছি, তা পূরণ করতে পারব বলে আশা করি। লক্ষণ দেখতে পাচ্ছি। ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী হচ্ছে। এনবিআর দুই ভাগ হচ্ছে। সবকিছু মিলে বলতে পারি ঋণ অত বেশি নিতে হবে না। ঋণের মাধ্যমে অর্থায়নের বিষয়ে আমরা বিকল্প উপায়ে যাব। সব সময় ব্যাংক খাত থেকে সরকার ঋণ নেয়, আর এতে বঞ্চিত হয় বেসরকারি খাত।

অর্থনীতিকে যে গণতন্ত্রায়ণের কথা বলছি, সেটা যাতে সফলভাবে করতে পারি, সে জন্য সহযোগিতা চাই। একটা কঠিন অবস্থা থেকে আমরা উত্তরণ করতে যাচ্ছি। সরকার একা পারবে না। সবাই মিলে কাজটা করতে হবে।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী
ছবি: প্রথম আলো
প্রথম আলো:

নতুন বেতনকাঠামোর জন্য অর্থায়ন কোথা থেকে আসবে?

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী: এটা আমরা একসঙ্গে দিতে পারছি না।

প্রথম আলো:

দুইবারে দিলেও তো অনেক টাকা।

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী: দুইবার না। এটা নিয়ে কাজ করছি। হিসাব–কিতাব চলছে। বিশাল আমদানির কারণে তো রাজস্ব স্পেসটা অনেক কমে গেছে। ইচ্ছে থাকলেও তো একসঙ্গে দিতে পারছি না।

প্রথম আলো:

এ বছরের জুলাই থেকে দেওয়ার যে ঘোষণা দিয়েছিলেন, তা কি ঠিক থাকবে?

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী: আমি তো বললাম, এটা নিয়ে কাজ করছি।

প্রথম আলো:

পাঁচ বছরের জন্য আপনারা নির্বাচিত হয়েছেন। ছয় মাস শেষ। আগামী সাড়ে চার বছর কী করবেন? বার্তা কী?

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী: বার্তা হচ্ছে, আমরা খুব সঠিকভাবে পার করছি। অর্থনীতিকে যে গণতন্ত্রায়ণের কথা বলছি, সেটা যাতে সফলভাবে করতে পারি, সে জন্য সহযোগিতা চাই। একটা কঠিন অবস্থা থেকে আমরা উত্তরণ করতে যাচ্ছি। সরকার একা পারবে না। সবাই মিলে কাজটা করতে হবে।