যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি পর্যালোচনা দরকার
-চুক্তির কয়েকটি ধারা বাংলাদেশের স্বার্থের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
-পরিকল্পিতভাবে ও ধীরগতিতে পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ।
-যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ব্যবহার করলে শূন্য শুল্ক বলা হলেও শর্তাবলি স্পষ্ট নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তি পর্যালোচনা (রিভিউ) করতে হবে। কারণ, চুক্তির বিভিন্ন ধারা বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী। যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টও পাল্টা শুল্ক আরোপকে যে অবৈধ আখ্যা দিয়েছেন, সেটিও কাজে লাগানোর চিন্তা করা যায়। এ জন্য কৌশল নির্ধারণ করা জরুরি। তবে কাজটি করতে হবে ধীরে–সুস্থে এবং পরিকল্পিতভাবে।
দেশের বিশিষ্ট শিল্পপতি, ব্যবসায়ী ও গবেষকেরা আজ বুধবার ঢাকায় সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠক করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে এসব পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ব্যবহার করলে কীভাবে শূন্য শুল্ক পাওয়া যাবে, তা–ও পরিষ্কার হওয়া দরকার। এমনকি এই চুক্তি কীভাবে হলো, তা-ও খোলাসা করা দরকার।
বৈঠকে সরকারের দিক থেকে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির, বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম ও বাণিজ্যসচিব মাহবুবুর রহমান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপিত পাল্টা শুল্ক অবৈধ ঘোষণা করেছেন। এর জবাবে তিনি নতুন বৈশ্বিক শুল্ক আরোপের নির্দেশ দিয়েছেন প্রথমে ১০ শতাংশ, পরে ১৫ শতাংশ। এই শুল্ক এবং দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের সই করা বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে করণীয় কী হবে, তা নিয়েই অংশীজনদের সঙ্গে আজ বৈঠক করা হয়।
বৈঠক শেষে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের ডেকেছি। চুক্তিসহ নানা বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। কোন খাতের কী সমস্যা, সেগুলো নিয়েও আলোচনা হয়েছে।’
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার ৯ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তি করেছে, সে ব্যাপারেও এখনো বলার মতো অবস্থা তৈরি হয়নি। আমরা দেখছি যে এর পক্ষে-বিপক্ষে কী আছে। একটি চুক্তির পক্ষে-বিপক্ষে দুটি দিক থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। আমরা এগুলো পর্যালোচনা করব। এরপর করণীয় ঠিক করব।’
বৈঠকে অংশ নেন ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকিন আহমেদ। এরপর যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘চুক্তি যেহেতু হয়েই গেছে এবং দেশটিও যুক্তরাষ্ট্র, ফলে হুট করে কিছু করা যাবে না। যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের রায়ের আগে আমাদের মতো অনেক দেশ একই ধরনের চুক্তি করেছে। আমরা এখন দেখতে পারি যে তারা কী ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। আমাদের পরিকল্পিতভাবে এগোতে হবে।’
শূন্য শুল্ক নিয়ে ধোঁয়াশা
বৈঠকের পর গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান প্রথম আলোকে বলেন, ‘এটা সত্যি যে চুক্তিটিতে বাংলাদেশের স্বার্থ পুরোপুরিভাবে সংরক্ষিত হয়নি; বরং এতে কিছু উদ্বেগজনক ধারাও আছে। যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট যে রায় দিয়েছেন, তাকে কাজে লাগিয়ে আমরা কোনো সুযোগ নিতে পারি কি না, সেই চেষ্টাও করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের তুলার ব্যবহার ও বিপরীতে শূন্য শুল্ক নিয়ে বড় ধরনের ধোঁয়াশা আছে। চুক্তি পর্যালোচনা করে এগুলো পরিষ্কার করা দরকার।’
চুক্তি করার প্রক্রিয়া নিয়ে বৈঠকে প্রশ্ন তুলেছেন বলে প্রথম আলোকে জানান সেলিম রায়হান। তিনি বলেন, ‘প্রক্রিয়া নিয়ে কথা বলেছি এ কারণে যে এটা থেকে শিক্ষা নিতে হবে। ভবিষ্যতে একই জাতীয় চুক্তি করার ক্ষেত্রে যেন প্রশ্ন না ওঠে, সেটা হচ্ছে চাওয়া।’
সংবাদ সম্মেলনে বাণিজ্যমন্ত্রী আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের এ বিষয়টি এখনো বিকাশমান। দেশটির সর্বোচ্চ আদালত আগের ধার্য করা শুল্কের ব্যাপারে না ঘোষণা করেছেন। আমরা বিভিন্ন মাধ্যমে শুধু ঘোষণা শুনেছি, সরকারি পর্যায়ে লিখিত কিছু পাইনি।’ যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী, ১৫০ দিনের মধ্যে দেশটির কংগ্রেসের কাছ থেকে অনুমোদন নিতে হবে। আর বাদ বাকি যা, আমরা টিভিতে দেখেছি।’
চুক্তি কি তড়িঘড়ি করা হয়েছিল
অন্তর্বর্তী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তির বিষয়গুলো গোপন করেছে ও তড়িঘড়ি করে চুক্তি করেছে কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘চুক্তির আলোচনার সময় নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট (এনডিএ) ছিল, তবে এ চুক্তিতে সংবেদনশীল বিষয় ছিল। যাদের সঙ্গে চুক্তি, দেশটাও আমাদের জন্য অনেক সংবেদনশীল। ফলে নানা কারণেই এই পরিস্থিতিতে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত মন্তব্য করা ঠিক হবে না।’
বৈঠকের পর বাংলাদেশ নিট পোশাক উৎপাদক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম প্রথম আলোকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তির একটা ভালো দিক হচ্ছে দেশটির তুলা ব্যবহার করে উৎপাদিত তৈরি পোশাক রপ্তানিতে পাল্টা শুল্ক শূন্য হবে। এ জন্য কী কী শর্ত মানতে হবে, সেটি জানা দরকার। তৈরি পোশাক খাতের জন্য মার্কিন চুক্তি যদি দেশের জন্য ভালো না হয়, তাহলে সেটি পুনর্বিবেচনা করার অনুরোধ করেছি বৈঠকে।’
বৈঠকে আরও যাঁরা অংশ নিয়েছেন
বৈঠকে এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক আবদুর রহিম খান ও সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন, বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান, মেট্রো চেম্বারের সভাপতি কামরান টি রহমান, বিটিএমএর সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল, বাংলাদেশ চেম্বারের সভাপতি আনোয়ার-উল-চৌধুরী, ওষুধ শিল্প সমিতির সভাপতি আবদুল মুক্তাদির, সিরামিক উৎপাদক ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মইনুল ইসলাম, হিমায়িত খাদ্য রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ শাহজাহান চৌধুরী প্রমুখ।
আরও উপস্থিত ছিলেন মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল, ট্রান্সকম গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সিমিন রহমান, সিটি গ্রুপের পরিচালক শম্পা রহমান, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন, রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র্যাপিড) চেয়ারম্যান এম এ রাজ্জাক প্রমুখ।
দ্রব্যমূল্য ও চাঁদাবাজি প্রসঙ্গ
বর্তমান দ্রব্যমূল্য পরিস্থিতি নিয়ে মন্ত্রী বলেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় যেসব পণ্য আমদানি তদারকি করে, সেগুলোর দাম বাজারে স্বাভাবিক রয়েছে। তবে কিছু পণ্য একসঙ্গে অনেকে কেনার কারণে দাম বেড়েছে। সেগুলো অবশ্য সবজিজাতীয়। তিনি বলেন, রমজানের শুরুতে অনেকে একসঙ্গে এক মাসের বাজার করেন। বিক্রেতারাও পরিস্থিতি ও শূন্যতার সুযোগ নেন। ৪০-৫০ টাকার লেবু ১২০ টাকা হয়ে গেছে ওই পরিস্থিতিতে। এরপর কিন্তু ঠিকই আবারও আগের দামে ফিরে এসেছে।
চাঁদাবাজি–সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, ‘চাঁদাবাজি বন্ধে এত দিন বিভিন্ন সরকার আশ্বাস দিলেও কাজ হয়নি। অপেক্ষা করুন, আমরা কাজ করে দেখাব।’