বিশ্বের ৬৩% সম্পদ মাত্র ১% ধনীর হাতে

শীর্ষ ধনীদের সম্পদ বৃদ্ধির প্রধান দুটি কারণ হচ্ছে খাদ্য ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি। গত বছর ৯৫টি খাদ্য ও জ্বালানি কোম্পানি দ্বিগুণ মুনাফা করেছে।

বিশ্বের ধনী ও অতিধনীদের সম্পদ বেড়েই চলেছে। ২০২০ সালের পর সারা বিশ্বে যত সম্পদ তৈরি হয়েছে, তার দুই-তৃতীয়াংশ বিশ্বের শীর্ষ ১ শতাংশ ধনীর ঘরে গেছে। একই সময়ে বাকি ৯৯ শতাংশ মানুষের ঘরে গেছে অবশিষ্ট এক-তৃতীয়াংশ সম্পদ। এখানেই শেষ নয়, গত এক দশকে বিশ্বে যত সম্পদ সৃষ্টি হয়েছে, তার অর্ধেকের মালিক হয়েছেন শীর্ষ ১ শতাংশ ধনী। অক্সফাম ইন্টারন্যাশনালের ‘সারভাইভাল অব দ্য রিচেস্ট’ শীর্ষক এই প্রতিবেদন ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বার্ষিক দাভোস সম্মেলনের উদ্বোধনী দিনে গতকাল সোমবার প্রকাশ করা হয়।

এমন এক সময় শীর্ষ ধনীদের সম্পদ বেড়েছে, যখন বিশ্বে দারিদ্র্যের হার বাড়ছে। মহামারি করোনাভাইরাসের সময় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দারিদ্র্যের হার বেড়েছে, এ নিয়ে সারা বিশ্বেই আলোচনা হয়েছে। দেশে দেশে নতুন দরিদ্রের সংখ্যা বেড়েছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানও তখন দেশের দারিদ্র্য পরিস্থিতি নিয়ে জরিপ করেছিল। তাতেও একই চিত্র পাওয়া যায়; অর্থাৎ নতুন করে অনেক মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। ২০২১ সালে দারিদ্র্যের হার খানিকটা কমেছিল। তবে ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের জেরে দারিদ্র্য বিমোচনের গতি আবার থমকে গেছে। বাস্তবতা হলো, ২৫ বছরের মধ্যে ৩ বছর ধরে অতিদরিদ্র ও অতিধনীর সংখ্যা একইভাবে বেড়েছে।

অক্সফামের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২০ সালের পর বিশ্বে ৪২ ট্রিলিয়ন বা ৪২ লাখ কোটি ডলারের সম্পদ তৈরি হয়েছে। তার মধ্যে ৬৩ শতাংশ বা ২৬ ট্রিলিয়ন ডলারের সম্পদ পকেটে ভরেছে বিশ্বের ১ শতাংশ শীর্ষ ধনী। বাকি ৩৭ শতাংশ বা ১৬ ট্রিলিয়ন ডলারের সম্পদ ভাগ হয়েছে দুনিয়ার বাকি ৯৯ শতাংশ মানুষের মধ্যে। বিশ্বে তৈরি হওয়া সম্পদ থেকে সমাজের নিচের দিকের ৯০ শতাংশ মানুষের ১ ডলার আয়ের বিপরীতে বিলিয়নিয়াদের আয় ১৭ লাখ ডলার।

২০২২ সালে শীর্ষ ধনীদের সম্পদ বৃদ্ধির প্রধান দুটি কারণ হচ্ছে খাদ্য ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি। গত বছর ৯৫টি খাদ্য ও জ্বালানি কোম্পানি স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে দ্বিগুণ মুনাফা করেছে। গত বছর তাদের সম্মিলিত মুনাফার পরিমাণ দাঁড়ায় ৩০৬ বিলিয়ন বা ৩০ হাজার ৬০০ কোটি ডলার। এর মধ্যে ২৫ হাজার ৭০০ কোটি ডলার তারা শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে লভ্যাংশ হিসেবে বিতরণ করেছে।

এ ছাড়া ২০২০ সালে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের কোম্পানিগুলোও কয়েক গুণ মুনাফা করেছে। মহামারির সেই সময়ে মানুষের প্রযুক্তিনির্ভরতা বেড়ে যাওয়ার কারণে সেটি সম্ভব হয়েছিল। ঘরে বসে অফিস করা, ভার্চ্যুয়াল বৈঠক ও ক্লাসের কল্যাণে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো রমরমা ব্যবসা করেছিল। ওয়ালমার্টের মালিক ওয়ালটন পরিবার গত বছর ৮৫০ কোটি ডলার মুনাফা পেয়েছে। জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় ভারতের গৌতম আদানির সম্পদ সাম্প্রতিক সময়ে তরতরিয়ে বেড়েছে। গত বছর তাঁর সম্পদ বেড়েছে ৪২ বিলিয়ন বা ৪ হাজার ২০০ কোটি ডলার।

হঠাৎ কোনো এক বছরে কোম্পানির এই অতি মুনাফাকে ‘উইন্ডফল প্রফিট’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। তাই বিশ্বের সমতাবাদীদের দাবি, এসব কোম্পানির ওপর ‘উইন্ডফল ট্যাক্স বা উচ্চ হারে কর’ আরোপ করা হোক। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, বিশ্বের শীর্ষ ধনী ইলন মাস্ক ২০১৪ থেকে ২০১৮ সালে সত্যিকার অর্থে মাত্র ৩ শতাংশ হারে আয়কর দিয়েছেন। অথচ উগান্ডার আটা বিক্রেতা অ্যাবার ক্রিস্টিন মাসে ৮০ ডলার আয় করলেও আয়কর দেন ৪০ শতাংশ হারে।

অক্সফামের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সবচেয়ে গুরুতর বিষয় হলো, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চ মূল্যস্ফীতির অন্তত অর্ধেক করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর অতি মুনাফার প্রবণতার কারণে হয়েছে। এসব দেশে যথাক্রমে ৫৪ শতাংশ, ৫৯ শতাংশ ও ৬০ শতাংশ মূল্যস্ফীতি বেশি হয়েছে করপোরেটদের উচ্চ মুনাফার কারণে।

স্পেনের অন্যতম বৃহৎ ট্রেড ইউনিয়ন সিসিওও বলছে, বিদায়ী বছরের প্রথম প্রান্তিকে দেশটির মূল্যস্ফীতির ৮৩ দশমিক ৪ শতাংশ হয়েছে করপোরেটদের উচ্চ মুনাফার কারণে। এমন এক সময় তা হয়েছে, যখন বিশ্বের প্রায় ১৭০ কোটি শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির হারের চেয়ে কম; অর্থাৎ তাঁদের প্রকৃত মজুরি কমেছে। প্রায় ৮২ কোটি মানুষ পেটে ক্ষুধা নিয়ে ঘুমাতে যাচ্ছে এবং এই জনগোষ্ঠীর সিংহভাগই হলো নারী ও মেয়েশিশু। বিশ্বের ক্ষুধার্ত মানুষের অর্ধেকই তারা। এমন প্রেক্ষাপটে বিশ্বব্যাংক জানাচ্ছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বে সম্ভবত গত তিন বছরে বৈষম্য সবচেয়ে বেশি হারে বেড়েছে।

অক্সফামের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র দেশগুলো এখন স্বাস্থ্যসেবার চেয়ে চার গুণ বেশি অর্থ ব্যয় করছে ঋণ পরিশোধে। তিন-চতুর্থাংশ দেশ কৃচ্ছ্রসাধনের নীতি নিয়েছে। আগামী পাঁচ বছর এসব দেশে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো জরুরি খাতে ৭৮০ কোটি ডলার ব্যয় কমাতে হবে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে ব্যয় কমানোর কারণে এসব দেশের পরবর্তী প্রজন্ম ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বৈষম্য আরও বাড়বে। অথচ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থা ঋণ দেওয়ার আগে যেসব শর্ত দেয়, সেসব শর্ত পূরণ করতে গিয়ে ঋণগ্রহীতা দেশের সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও বেড়ে যায়। আইএমএফের লক্ষ্যও একটাই, কীভাবে ঋণ ফেরত পাওয়া যাবে।

অতি মুনাফালোভীর অবসান ঘটাতে সম্পদ কর ও উইন্ডফল কর আরোপের সুপারিশ করেছে অক্সফাম ইন্টারন্যাশনাল। একই সঙ্গে ধনীদের ওপর ১ শতাংশ হারে বাড়তি কর আরোপ করার কথাও বলা হয়েছে। যাতে ধনীদের সংখ্যা এবং ধনীদের সম্পদ দরিদ্রদের মধ্যে পুনর্বণ্টন করা যায়।