বিশ্বকাপে বাংলাদেশ শুধু ‘ফ্যান জার্সি’তে
১১ জুন শুরু হচ্ছে খেলাধুলার সবচেয়ে বড় আসর ফুটবল বিশ্বকাপ। মেক্সিকো, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত এবারের আসরে অংশ নিচ্ছে ৪৮টি দল। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হওয়া সত্ত্বেও ফিফার অফিশিয়াল জার্সি কিংবা অংশগ্রহণকারী কোনো দলের জার্সিতে এবার জায়গা করে নিতে পারেনি বাংলাদেশ। ফলে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের উপস্থিতি সীমাবদ্ধ থাকছে দর্শকদের জন্য তৈরি ‘ফ্যান জার্সি’ ও টি-শার্টে।
তবে বৈশ্বিক পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের নিচে থাকা ভারত, পাকিস্তান ও কম্বোডিয়ার মতো দেশগুলো বিশ্বকাপের অফিশিয়াল জার্সি তৈরির কাজ পেয়েছে। তাতে বিশ্বকাপের মাঠেই থাকছে এসব দেশের নাম; আর মাঠের বাইরে গ্যালারি কিংবা গ্যালারির বাইরে দর্শক-ভক্তদের জার্সি বা টি-শার্টে থাকবে লাল-সবুজের বাংলাদেশের নাম।
বিশ্বকাপ ফুটবলের জার্সির বাজার কয়েক বিলিয়ন ডলারের। বৈশ্বিক বাজার গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘গ্লোবাল গ্রোথ ইনসাইটস’-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৬ বিশ্বকাপে জার্সির বাজারের আকার ৮৩৯ কোটি মার্কিন ডলারের হতে পারে।
১৮ দেশে গেল ফ্যান জার্সি
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ফুটবল বিশ্বকাপ উপলক্ষে ফুটবল ও ফিফার লোগো-সংবলিত জার্সি, টি-শার্ট ও হুডি মিলিয়ে বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হয়েছে ২৩ লাখ ৬৫ হাজার পিস পোশাক। এসব পোশাকের রপ্তানিমূল্য প্রায় ৩৭ লাখ মার্কিন ডলার; যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৪৫ কোটি ১৪ লাখ টাকা। ঢাকা ও চট্টগ্রামের ৩৩টি রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক কারখানা এসব পণ্য রপ্তানি করেছে ১৮টি দেশে।
বিশ্বকাপের আয়োজক দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় এসব পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এ ছাড়া যুক্তরাজ্য, জার্মানি, বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, স্পেন, নেদারল্যান্ডস, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও কাতারেও গেছে বাংলাদেশে তৈরি ফ্যান জার্সি। বিশ্বখ্যাত ক্রেতা প্রতিষ্ঠান ওয়ালমার্ট, প্রাইমার্ক, নেক্সট, এমঅ্যান্ডএস, পুমা, ডিক্যাথলনসহ ৩৬টি প্রতিষ্ঠান এসব পণ্য কিনেছে বাংলাদেশ থেকে।
বাংলাদেশ থেকে ফ্যান জার্সি রপ্তানিতে শীর্ষে রয়েছে চট্টগ্রামের কেডিএস ফ্যাশন। প্রতিষ্ঠানটি যুক্তরাজ্য ও কানাডায় প্রায় ৫ লাখ ৪৮ হাজার পিস জার্সি ও টি-শার্ট রপ্তানি করেছে, যার মূল্য সাড়ে ১২ লাখ ডলার।
চট্টগ্রামের এশিয়ান গ্রুপের দুটি প্রতিষ্ঠান সি ব্লু টেক্সটাইল ও প্রিয়াম গার্মেন্টস যুক্তরাষ্ট্রে শিশুদের প্রায় ৩ লাখ পিস ফ্যান জার্সি রপ্তানি করেছে। এতে রপ্তানি আয় হয়েছে প্রায় ৪ লাখ ডলার।
জানতে চাইলে এশিয়ান গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আবদুস সালাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘মূলত শিশুদের ফ্যান জার্সি রপ্তানি করেছি আমরা। ফুটবলের লোগো ছিল এসব জার্সিতে।’
এ ছাড়া প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের চরকা টেক্সটাইল আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, স্পেন, পর্তুগাল, স্কটল্যান্ড, ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের সমর্থকদের জন্য শিশুদের ফ্যান জার্সি তৈরি করেছে।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক (বিপণন) কামরুজ্জামান কামাল প্রথম আলোকে বলেন, যুক্তরাজ্যের একটি ক্রেতা প্রতিষ্ঠান বাচ্চাদের জন্য ২৮ হাজার পিস ফ্যান জার্সি ও প্যান্ট তৈরি করিয়ে নিয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাদের বিক্রয়কেন্দ্রের মাধ্যমে এসব ফ্যান জার্সি বিক্রি হবে।
অবশ্য ফুটবল বা ফিফার লোগো ছাড়া জার্সি-পুলওভারও রপ্তানি হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ৯৯ কোটি ২৫ লাখ ডলারের ২২ কোটি ১৬ লাখ পিস জার্সি-পুলওভার রপ্তানি হয়েছে। গত বছর একই সময়ে রপ্তানি হয়েছিল ৯৬ কোটি ৫৩ লাখ ডলারের ২১ কোটি ৪৭ লাখ পিস জার্সি। বিশ্বকাপ উপলক্ষে সামান্য কিছু বেড়েছে জার্সি রপ্তানি।
অফিশিয়াল জার্সিতে নেই বাংলাদেশ
ফিফার অফিশিয়াল পোশাক, বল ও ইভেন্ট-কিট পার্টনার হিসেবে এবারও রয়েছে জার্মানির ক্রীড়াসামগ্রী নির্মাতা প্রতিষ্ঠান অ্যাডিডাস। প্রতিষ্ঠানটি ফিফার কর্মকর্তা, রেফারি, স্বেচ্ছাসেবক ও বিভিন্ন সহযোগী দলের পোশাক সরবরাহের পাশাপাশি ১৪টি দলের জার্সি সরবরাহ করেছে।
অ্যাডিডাস সম্প্রতি বিশ্বকাপের পোশাক উৎপাদনকারী কারখানার তালিকা প্রকাশ করেছে। সেখানে বিশ্বের ১৫টি দেশের ৫৬টি কারখানার নাম থাকলেও বাংলাদেশের কোনো কারখানা নেই। তার বিপরীতে ভারত ও পাকিস্তানের ৩টি করে কারখানা, কম্বোডিয়ার ১০টি, চীনের ১৩টি, ভিয়েতনামের ৬টি কারখানার নাম রয়েছে।
ফিফার বাইরে অংশগ্রহণকারী ৪৮টি দলের জার্সি সরবরাহ করছে মোট ১৩টি ব্র্যান্ড। এর মধ্যে অ্যাডিডাস, নাইকি ও পুমা সবচেয়ে বেশি জার্সি সরবরাহ করেছে। যদিও বাংলাদেশে পুমা, জ্যাকো ও কাপ্পার জন্য পোশাক উৎপাদিত হয়, তবু বিশ্বকাপের মূল জার্সি তৈরির কোনো কার্যাদেশ পায়নি দেশের কারখানাগুলো—এমন তথ্য নিশ্চিত করেছে এসব ব্র্যান্ড নিয়ে কাজ করা দেশীয় পোশাক কোম্পানিগুলো।
বাংলাদেশের উপস্থিতিও ছিল
২০১৮ সালে রাশিয়া বিশ্বকাপের অফিশিয়াল পোশাক উৎপাদনে যুক্ত ছিল বাংলাদেশ। সে সময় কোরিয়ান ইপিজেডের কর্ণফুলী শুজ ইন্ডাস্ট্রিজ ও সিইপিজেডের ইয়াংওয়ান (সিইপিজেড) লিমিটেড থেকে ট্রাউজার, টি-শার্ট, জ্যাকেট ও ট্র্যাকস্যুট নিয়েছিল অ্যাডিডাস। সব মিলিয়ে প্রায় ৪৩ লাখ ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছিল ওই আয়োজন ঘিরে।
এ ছাড়া ২০১৮ সালে চট্টগ্রামের সনেট টেক্সটাইল ফিফার লোগো-সংবলিত প্রায় ২ লাখ অফিশিয়াল জ্যাকেট সরবরাহ করে। ২০২২ বিশ্বকাপেও প্রতিষ্ঠানটি ফিফা লাইসেন্সধারী একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য ৬ লাখ পিস টি-শার্ট তৈরি করেছিল।
এবার কেন ক্রয়াদেশ পাওয়া যায়নি জানতে চাইলে সনেট টেক্সটাইলের পরিচালক গাজী মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, ‘তাদের নিয়মিত ক্রেতা প্রতিষ্ঠান রাশিয়ার স্পোর্টমাস্টারের বিশ্বকাপের অফিশিয়াল টি-শার্টের লাইসেন্স থাকায় দুবার কার্যাদেশ পেয়েছি। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর নিষেধাজ্ঞার কারণে তাদের এবার ফিফার লাইসেন্স নেই। ফলে আর অফিশিয়াল টি-শার্ট সরবরাহের সুযোগ হয়নি।’
বাংলাদেশ কেন পিছিয়ে
বিশ্বকাপের জার্সি সাধারণ পোশাক নয়, অ্যাডিডাসের ক্লাইমাকুল প্লাস, নাইকির ড্রাই-ফিট অ্যাডভান্স কিংবা পুমার আল্ট্রাউইভ প্রযুক্তির মতো বিশেষ ফেব্রিক ও প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয় এসব জার্সিতে। প্রযুক্তির কারণে এসব জার্সি ঘাম শুষে নেয় কিংবা গরমের মধ্যেও শীতল থাকে। ফলে শুধু সেলাই বা উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেই হয় না। এ জন্য প্রয়োজন উন্নত কৃত্রিম তন্তু, প্রযুক্তিনির্ভর কাপড় ও বিশেষ দক্ষতা।
পোশাক রপ্তানিকারকেরা বলছেন, বর্তমানে বিশ্বকাপের ফ্যান জার্সির বাজারে বাংলাদেশের উপস্থিতি দৃশ্যমান। তবে অফিশিয়াল জার্সির বৈশ্বিক সরবরাহশৃঙ্খলে জায়গা করে নিতে হলে কৃত্রিম তন্তু ও টেকনিক্যাল স্পোর্টসওয়্যারে আরও বড় বিনিয়োগ করতে হবে।
যদিও বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তাদের বড় অংশ এখনো সস্তা পোশাক উৎপাদন ও রপ্তানিতে ঝুঁকে আছে। উচ্চমানের পোশাক উৎপাদনে গবেষণা ও দক্ষতা বাড়াতে বিনিয়োগ করছেন না তাঁরা।
জানতে চাইলে তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিশ্বকাপের জার্সিগুলো কৃত্রিম তন্তুর কাপড়ে তৈরি হয়। এসব জার্সি ঘাম শুষে নেয় কিংবা গরমের মধ্যেও শীতল থাকে। আমাদের দেশে কৃত্রিম তন্তুর পোশাক উৎপাদন শুরু হয়েছে। যদিও আস্থার জায়গাটি এখনো তৈরি হয়নি। সে কারণে আমরা পিছিয়ে রয়েছি।’