জেলায় প্রতিবছর ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকার আখ বেচাকেনা হয়। কৃষকেরা দিন দিন আখ চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। তবে আখ চাষে পরিশ্রম এবং বিনিয়োগ অন্যান্য ফসলের চেয়ে বেশি। 
কিশোর কুমার মজুমদার, উপপরিচালক, জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খাগড়াছড়ি

চিবিয়ে খাওয়ার আখ উৎপাদনে খাগড়াছড়ি জেলার অবস্থান সারা দেশে দ্বিতীয়। প্রথম গাইবান্ধা। যেখানে আখের মিল রয়েছে সেখানে চিনি বা গুড় তৈরির আখ চাষ হয়। যেখানে মিল নেই, সেখানে চিবিয়ে খাওয়ার আখ চাষ করা হয়। ১৯৯২ থেকে ’৯৩ সালে খাগড়াছড়িতে আখ চাষ শুরু হয়।

আখ চাষের উন্নত জাত প্রবর্তন ও পোকামাকড় থেকে রক্ষার জন্য বাংলাদেশ সুগার ক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউট নামে একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তারা বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে আখ চাষিদের উদ্বুদ্ধ করে। এ ছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড সম্প্রতি আখ চাষ জোরদার প্রকল্প নামে একটি কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। এর মাধ্যমে ২ হাজার ১৯০ চাষিকে আখ চাষে উদ্বুদ্ধকরণে প্রশিক্ষণ, বীজ, সার ইত্যাদি প্রদান করবে। একই প্রকল্পের আওতায় বাড়ির আঙিনায় ১৫ হাজার কৃষকের মাধ্যমে আখ চাষে উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। 

প্রকল্পের পরামর্শক দিবাকর চাকমা বলেন, বর্তমানে ১৩০টি খেতে আখ চাষের প্রকল্প রয়েছে। এসব প্রকল্পে প্রায় ১৭ হাজার কৃষককে উদ্বুদ্ধ করা হবে। ’৯৩ সালে খাগড়াছড়িতে মাত্র ২০ হেক্টর জমিতে আখ চাষ হতো। এখন প্রায় পাঁচ হাজার হেক্টর জমিতে চাষ হয়। এতে তিন হাজার চাষি সম্পৃক্ত রয়েছেন। আখ চাষ করে জেলার অনেকে কুঁড়েঘর থেকে পাকা ঘর তৈরি করেছেন। 

গত ২০২১-২২ সালে জেলায় ২০ হাজার ৪৩০ টন আখ উৎপাদিত হয়। তার আগের বছর হয়েছে ২১ হাজার ৫২ টন আখ। ২০১৫-১৬ সালে উৎপাদিত হয়েছিল ১৯ হাজার ৮০০ টন। খাগড়াছড়ি সদরে সবচেয়ে বেশি আখ চাষ হয়। এরপর পানছড়ি, মহালছড়িসহ অন্যান্য উপজেলায়ও আখ চাষ ছড়িয়ে পড়েছে গত ১০ বছরে। 

পানছড়ি লতিবান ইউনিয়নের কংচারিপাড়া এলাকার তরুণ উখ্যামং মারমা। একসময় পড়াশোনার পাশাপাশি একটি পর্যটনকেন্দ্রে দোকান চালাতেন। করোনাকালে পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেলে আখ চাষ শুরু করেন। গত বছর আখ বিক্রি করে পেয়েছেন ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা। খরচ হয়েছিল ৮০ হাজার টাকা। ৬০ হাজার টাকা লাভ হওয়ায় এবার ৮০ শতক জমিতে ১ লাখ টাকা খরচ করে আখ চাষ করেছেন তিনি। তাঁর আশা, এবারও ভালো লাভ হবে। 

খাগড়াছড়ি-পানছড়ি সড়কের দুপাশে এখন শত শত আখখেত। এসব খেত থেকে আখ তুলে গাড়িতে বোঝাই করা হচ্ছে। সাধারণত আগস্ট মাসে আখ রোপণ করা হয়। ফলন দিতে ১২ থেকে ১৪ মাস লাগে। তবে আখের খেতের ফাঁকে ফাঁকে আলু, ঢ্যাঁড়স, বেগুন, মুলা, বাঁধাকপিসহ বিভিন্ন সবজির চাষ করা হয়। তাই আখ বড় হতে হতে বছরজুড়ে অন্যান্য ফসল পাওয়া যায়। এক বছর বীজ লাগালে আখ কাটার পর তা থেকে চার বছর পর্যন্ত আখ পাওয়া যায়। 

জেলা সদরের প্রীতিরঞ্জন চাকমা ২০০৯ সালে আখ চাষ শুরু করেছেন। এখন তিনি ৮০ শতক জমিতে আখ চাষ করেন। আখের চাষ করেই পাকা বাড়ি তুলেছেন। ছেলেকে ঢাকায় পড়ালেখা করাচ্ছেন। মেয়ে এবার উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছেন। প্রীতিরঞ্জন চাকমা বলেন, ‘আখ চাষে অনেক লাভ ছিল। তবে ইদানীং ব্যাপারীরা টাকা কম দেন। আগে একেকটি আখ ২২ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করেছি। এখন ১২ টাকার বেশি দিতে চান না।’

এ বিষয়ে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কিশোর কুমার মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, জেলায় প্রতিবছর ২০
থেকে ২৫ কোটি টাকার আখ বেচাকেনা হয়। কৃষকেরা দিন দিন আখ চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। তবে আখ চাষে পরিশ্রম এবং বিনিয়োগ অন্যান্য ফসলের চেয়ে বেশি।