আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের অর্থ বিলে কাঁচামাল আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়া হয়েছে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে প্রথমবারের মতো দেশে ফ্রি ট্রেড জোন (মুক্তবাণিজ্য অঞ্চল) চালুর ঘোষণাও দেওয়া হয়। যার আওতায় ব্যবসা ও বাণিজ্য সহজ করতে বেশ কিছু সুবিধা দেওয়া হবে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এতে ছোট উৎপাদনকারীরা যেমন সহজেই কাঁচামাল আমদানির সুযোগ পাবে, তেমনি বড় রপ্তানিকারকেরাও উপকৃত হবে। ফলে পণ্য রপ্তানির লিড টাইম কমবে। এতে বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতায়ও দেশের রপ্তানিকারকেরা এগিয়ে যাবে।
নতুন এ বাণিজ্যকাঠামোর আওতায় মুক্তবাণিজ্য অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা কোনো ধরনের শুল্ক পরিশোধ ছাড়াই কাঁচামাল, যন্ত্রাংশ ও পণ্য আমদানি করতে পারবেন। এসব অঞ্চলে পণ্য সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংযোজন, পুনর্মোড়কীকরণ (রিপ্যাকেজিং), রিলেবেলিং ও পুনর্রপ্তানির সুযোগ থাকবে। প্রয়োজন হলে প্রযোজ্য শুল্ক ও কর পরিশোধের মাধ্যমে দেশি বাজারেও এসব পণ্য সরবরাহ করা যাবে। এতে যেসব ছোট প্রতিষ্ঠান দেশের ভেতর থেকেই এলসি ছাড়াই বিদেশি কাঁচামাল পাবে, আবার বড়দের ক্রয়াদেশ পেয়ে কাঁচামালের জন্য অপেক্ষা করতে হবে না। মুক্তবাণিজ্য অঞ্চলে থাকা কাঁচামাল দিয়ে পণ্য উৎপাদন শুরু করতে পারবে।
নতুন এ উদ্যোগকে আগামী বাজেটের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি বলছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তারা। এ জন্য অর্থ বিলে নতুন একটি অধ্যায় যুক্ত করা হয়েছে। এটা ঠিকমতো বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
জানতে চাইলে এনবিআরের শুল্ক বিভাগের প্রথম সচিব মো. তারেক হাসান প্রথম আলোকে বলেন, মুক্তবাণিজ্য অঞ্চলের নতুন একটি ধারণা দেশে শুরু হতে যাচ্ছে। এই অঞ্চল প্রতিষ্ঠা হলে বন্ড লাইসেন্সের কোনো ঝামেলা থাকবে না। এই অঞ্চলে যারা ব্যবসা করবে, তারা শুল্ক ছাড়া পণ্য আমদানি করে গুদামে সংরক্ষণ করতে পারবে।
মুক্তবাণিজ্য অঞ্চল একটি ভালো উদ্যোগ। এতে ছোট ব্যবসায়ীদের ব্যয় কমবে। দেশেই কাঁচামাল পেলে তাদের বাড়তি খরচ কমে যাবে
এই উদ্যোগের মাধ্যমে ছোটরা বেশি উপকৃত হবে বলে জানান তারেক হাসান। তিনি বলেন, ধরা যাক কোনো ছোট ব্যবসায়ীর হয়তো এক টন কাঁচামাল লাগবে। কিন্তু এত কম পরিমাণে আমদানি করা যায় না। মুক্তবাণিজ্য অঞ্চলব্যবস্থার আওতায় ছোট ব্যবসায়ীরা তাঁদের প্রয়োজন অনুযায়ী কাঁচামাল দেশের ভেতরে বড়দের কাছ থেকে কিনতে পারবেন।
প্রস্তাবিত ব্যবস্থার সবচেয়ে বেশি সুবিধা হবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি (এসএমই) উদ্যোক্তাদের। বর্তমানে সীমিত আর্থিক সামর্থ্য, আমদানি সুবিধার অভাব এবং বড় পরিসরে আমদানি করতে না পারার কারণে অনেক ছোট প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানি করতে পারেন না।
এ জন্য সরকারের এই উদ্যোগকে ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের জন্য দারুণ সুযোগ বলছেন বড় ব্যবসায়ীরা। জানতে চাইলে টিকে গ্রুপের পরিচালক মোহাম্মদ মোস্তফা হায়দার প্রথম আলোকে বলেন, ‘মুক্তবাণিজ্য অঞ্চল একটি ভালো উদ্যোগ। এতে ছোট ব্যবসায়ীদের ব্যয় কমবে। দেশেই কাঁচামাল পেলে তাদের বাড়তি খরচ কমে যাবে। এখন তো আমদানি নিবন্ধন সনদ (আইআরসি) ছাড়া পণ্য আনা যায় না। নতুন উদ্যোগের ফলে তারা আন্তর্জাতিক বাজারের প্রবেশাধিকার (অ্যাকসেস) পাবে। যেসব কারখানায় ১০ থেকে ১৫ জন কাজ করে, তারাও ভালো মানের কাঁচামাল পাবে। সর্বোপরি পণ্যের মূল্য সংযোজন বাড়বে।’
ব্যবসায়ী চেম্বার সংগঠনগুলোর নেতারাও একই কথা বলছেন। তবে এসব নিয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার দাবি জানান তাঁরা। জানতে চাইলে ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকিন আহমেদ বলেন, সরকারের নতুন এ চিন্তা ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অত্যন্ত সহায়ক হবে। তবে মুক্তবাণিজ্য অঞ্চলের সুফল পেতে বেসরকারি খাতের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে নীতিমালা তৈরি করতে হবে। যারা ব্যবসা করবে, তাদের সঙ্গে আলোচনা না করলে এই উদ্যোগের আশানুরূপ সুফল পাওয়া যাবে না।
এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এলসি খোলার ঝামেলা না থাকায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলো সহজেই সরাসরি বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে যুক্ত হতে পারবে
এদিকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় আধুনিক মুক্তবাণিজ্য অঞ্চল প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)। এই অঞ্চল চালু হলে দেশে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও রপ্তানি কার্যক্রমে নতুন গতি সঞ্চার হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
মুক্তবাণিজ্য অঞ্চল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশে বৈশ্বিক হাব তৈরি করা সম্ভব বলেও মনে করছেন রাজস্ব কর্মকর্তারা। এ বিষয়ে মো. তারেক হাসান বলেন, নতুন এ উদ্যোগের মাধ্যমে বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোও এ দেশে পণ্য রেখে ভারত কিংবা ভুটানে সরবরাহ করতে পারে। এতে সিঙ্গাপুরের মতো বৈশ্বিক হাব হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
করবিষয়ক বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, নতুন এ পদক্ষেপে ব্যবসায়ীদের মূলধনের ওপর চাপ কমাবে। একই সঙ্গে লিড টাইম কমে আসায় আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়বে।
জানতে চাইলে কর পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এসএমএসি অ্যাডভাইজারি সার্ভিসেসের পরিচালক স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলেন, ‘শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানি ও সহজ কাস্টমস নিয়মের কারণে এখন উৎপাদন খরচ ও সময়, দুই-ই কমবে। এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এলসি খোলার ঝামেলা না থাকায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলো সহজেই সরাসরি বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে যুক্ত হতে পারবে।’