নর্থ বেঙ্গল সুগার মিল
খেজুরগাছে বাড়তি আয় চিনিকলের
চিনিকলটি প্রায় ৯ হাজার খেজুরগাছের মধ্যে এ বছর ৫ হাজারটি ইজারা দিয়ে আয় করেছে ২০ লাখ টাকা।
সাধারণত সুগার মিল বা চিনিকলে আখ থেকে চিনি উৎপাদন করা হয়। চিনির পাশাপাশি কিছু উপজাত দ্রব্যও তৈরি হয়, যেগুলোর কোনো কোনোটি কখনো কখনো চিনির চেয়েও লাভজনক হয়ে ওঠে। তবে কোনো সুগার মিল যে খেজুরবাগান থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে আয় করবে—এমন ঘটনা বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। নাটোরের নর্থ বেঙ্গল সুগার মিল সে কৌতূহলই তৈরি করেছে। চিনিকলটির খেজুরবাগানে উৎপাদিত গুড় এখন বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে।
নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের নিজস্ব আটটি খামার রয়েছে। এগুলো হলো নরেন্দ্রপুর, মহিষবাথা, নন্দা, মুলাডুলি, কৃষ্ণা, চিথুলিয়া, ভবানীপুর ও গোবিন্দপুর খামার। এসব খামারের চারপাশ দিয়ে শ্রমিকদের চলাচলের জন্য রাস্তা রয়েছে। এই রাস্তার ধারে প্রাকৃতিকভাবে গড়ে উঠেছে খেজুরের গাছ। দিন দিন এসব গাছ বড় হয়ে বাগানে রূপ নিয়েছে। বর্তমানে এই খেজুরবাগান ইজারা দিয়ে মিলটি প্রতিবছর লাখ লাখ টাকা আয় করছে। অথচ এর বিপরীতে মিলটির কোনো বাড়তি ব্যয় নেই।
মিলের খামারগুলোতে মূলত আখ চাষ করা হয়। কখনো শস্যাবর্তনের জন্য অন্য ফসল চাষ না হলে প্রতিবছরই সেখানে আখ থাকে। খামার ঘিরে থাকা শ্রমিকদের চলাচলের পথেই খেজুরগাছগুলো স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠেছে। নর্থ বেঙ্গল সুগার মিল সূত্রে জানা গেছে, এসব খামারে মোট খেজুরগাছের সংখ্যা প্রায় ৯ হাজার। এর মধ্যে ৫ হাজার গাছ ইজারা দেওয়া হয়েছে। চলতি বছর এসব গাছ ইজারা দিয়ে ২০ লাখ টাকা আয় হয়েছে।
সম্প্রতি গোপালপুর পৌর এলাকার নরেন্দ্রপুর খামারে গিয়ে খেজুর গুড় তৈরি করতে দেখা যায়। খামারের চারপাশের রাস্তা বেশ চওড়া, গাড়ি চলাচলের উপযোগী। ভেতরের দিকে রয়েছে সরু হাঁটার পথ। খেজুরগাছের মাঝ দিয়ে আঁকাবাঁকা পথ ধরে শ্রমিক ও ইজারাদারেরা চলাফেরা করেন।
বাগানের ভেতর সুনসান নীরবতা। দূরের গ্রামগুলোর বাড়িঘর গাছের আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে। দক্ষিণ দিকে কিছু দূর এগোতেই দেখা গেল এক ‘গাইছি’ নতুন করে গাছে রসের ঘাট কাটছেন। তাঁর নাম শফিকুল ইসলাম। বাড়ি রাজশাহীর বাঘা উপজেলার পাকুড়িয়া গ্রামে। মাথায় গামছা জড়ানো, কোমরে আংটার সঙ্গে ঝুলছে খালি রসের হাঁড়ি। মোটা দড়ি দিয়ে নিজেকে গাছের সঙ্গে বেঁধে বাটালি দিয়ে মনোযোগসহকারে ঘাট কাটছেন তিনি।
আরেকজন গাইছি পূর্ব দিকের বাগান থেকে হেঁটে আসছিলেন। তাঁর নাম রুস্তম আলী। তাঁর বাড়িও একই এলাকায়। গাইছিদের পোশাক-আশাক আলাদা। কোমরে অজগর সাপের মতো মোটা দড়ি বাঁধা। বাঁ পাশে বাটালি রাখার জন্য বাঁশের চটা দিয়ে তৈরি চোঙার মতো একটি পাত্র, স্থানীয় ভাষায় যাকে বলা হয় ‘খালট’। এক হাতে মাটির হাঁড়ি, অন্য হাতে চেলা কাঠের মতো একটি জিনিস, যাতে বালু দিয়ে বাটালি ঘষে ধার দেওয়া হয়।
এই দুই গাইছির পাশাপাশি বানেজ আলী, আলম হোসেন ও মুনসুর আলী নামের আরও তিনজন বাগানের মাঝখানে ছোট একটি কুঁড়েঘর তৈরি করে গুড়ের কারবার করছেন। চুলায় জ্বাল দেওয়া খেজুরের পাকা রসের গন্ধ পুরো বাগানে ছড়িয়ে পড়েছে। আলম হোসেন চুলার রস নাড়ছেন, আর বানেজ আলী পরের সন্ধ্যার খাবারের জন্য তরকারি কাটছেন। কুঁড়েঘরের ভেতরে বাজারে নেওয়ার জন্য খেজুর গুড়ের পাটালি সাজানো। পাশে ধানের খড়ের ওপর বিছানাপত্র রাখা। খেজুরবাগানের এই দৃশ্য দেখে বোঝার উপায় নেই, এটি আসলে একটি সুগার মিলের খামার।
বাগান দেখাতে নিয়ে যান ইজারাদার শামীম আহমেদ। তিনি জানান, প্রতিদিন মোট ২৪০টি গাছ থেকে রস সংগ্রহ করা হয়। এতে দৈনিক ৪০ থেকে ৪২ কেজি গুড় উৎপাদন হয়। এই গুড় তিনি বিদেশেও পাঠান। গত দুই বছরে দুই টন করে মোট চার টন গুড় কানাডায় রপ্তানি করেছেন। তাঁর ইজারা নেওয়া মোট খেজুরগাছের সংখ্যা ২ হাজার ২০০। এর মধ্যে ৬৪৫টি গাছ ব্যবহারযোগ্য। প্রতিটি গাছের গড় ইজারা মূল্য পড়েছে ৪৩০ টাকা।
জানতে চাইলে নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের মহাব্যবস্থাপক (খামার) বাকি বিল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, মিলের খামারগুলোতে মোট ৯ হাজার খেজুরগাছ আছে। এর মধ্যে সব গাছ ইজারা দেওয়ার যোগ্য নয়। এ বছর ৫ হাজার গাছ ইজারা দেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে ২০ লাখ টাকা আয় হয়েছে। তিনি বলেন, একটি গাছ ২৫০ টাকা থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত ইজারা দেওয়া যায়। রস যত বেশি, গাছের ইজারা মূল্য তত বেশি হয়। তাঁর ভাষ্য, কেউ হয়তো একসময় কিছু গাছ রোপণ করেছিলেন। পরে সেগুলো প্রাকৃতিকভাবেই বেড়ে বাগানে পরিণত হয়েছে। প্রায় ১০ বছর ধরে এই গাছগুলো ইজারা দিয়ে সুগার মিল বাড়তি আয় করছে।