মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতে দুশ্চিন্তায় বাংলাদেশের রপ্তানিকারকেরা
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বাহিনী গত শনিবার সকালে ইরানে হামলা চালিয়েছে। পাল্টা জবাবে ইসরায়েলের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে ইরান। হামলা–পাল্টা হামলায় এই অঞ্চলের সব বিমান যোগাযোগ সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। সব ধরনের জাহাজের জন্য হরমুজ প্রণালিও বন্ধ করে দিয়েছে ইরান।
ইরানের সঙ্গে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি খুবই সামান্য হলেও মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলো বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির নতুন বাজার। তাই মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে হামলা ও পাল্টা হামলায় দেশগুলোতে পণ্য রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন রপ্তানিকারকেরা। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় পণ্য রপ্তানিতে খরচ বাড়বে—এমন আশঙ্কার কথাও বলছেন রপ্তানিকারকেরা।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্যানুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাব হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), কাতার, বাহরাইন, সৌদি আরব ও ইরাকে হামলা চালিয়েছে ইরান। এই দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের বড় বাজার হচ্ছে ইউএই।
ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য কম
যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্রদেশের বিভিন্ন ধরনের নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য খুবই কম, তা ১ কোটি ডলারের সামান্য বেশি। তার মধ্যে বড় অংশ বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি। করোনার পর এক বছর দেশটির সঙ্গে আমদানি-রপ্তানি কিছুটা বাড়লেও দুই অর্থবছর ধরে টানা কমছে।
আমরা এখনো রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধকল কাটিয়ে উঠতে পারিনি। এরই মধ্যে আবার ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জাহাজে পণ্য পরিবহনে খরচ বাড়বে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যানুযায়ী, বিদায়ী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ১ কোটি ৯ লাখ মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে ইরানে। এর মধ্যে ছিল ১ কোটি ৮ লাখ ৩২ হাজার ৮৯৮ ডলারের পাটের সুতা, ৯৫ হাজার ৩১০ ডলারের নিট পোশাক এবং ৯ হাজার ৩৫১ ডলারের ওভেন পোশাক।
বাংলাদেশের রপ্তানিকারকেরা ২০২০-২১ অর্থবছরেও ইরানে ১ কোটি ৫৯ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি করেন। পরের বছর সেই রপ্তানি কমে ১ কোটি ১৯ লাখ ডলারে নেমে আসে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে রপ্তানি বেড়ে ১ কোটি ৮০ লাখ ডলারে দাঁড়ায়। তার পরের অর্থবছরে রপ্তানি কমে দাঁড়ায় ১ কোটি ৫৪ লাখ ডলারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ইরান থেকে ৫ লাখ ডলারের পণ্য আমদানি করেন বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা। তার আগের তিন বছর দেশটি থেকে আনুষ্ঠানিভাবে কোনো পণ্য আমদানি হয়নি। এ ছাড়া ২০২০-২১ অর্থবছর দেশটি থেকে আমদানি হয়েছিল ৩ লাখ ডলারের পণ্য।
পুরোনো তথ্য-উপাত্ত ঘেঁটে দেখা যায়, ইরান থেকে পণ্য আমদানি বছর দশেক আগেও বর্তমানের চেয়ে বেশি ছিল। ২০১০-১১ অর্থবছরে ৪৪৯ কোটি টাকার পণ্য আমদানি হয় ইরান থেকে। তার পরের বছর থেকে সেই আমদানি কমতে থাকে। ২০১১-১২ অর্থবছরে আমদানি হয় ৯৯ কোটি টাকার পণ্য।
বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হওয়া প্রক্রিয়াজাত খাদ্য রপ্তানির অর্ধেকের কাছাকাছি যায় মধ্যপ্রাচ্যে। মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য রপ্তানিকারক অনেক প্রতিষ্ঠান হুমকিতে পড়বে।
জানতে চাইলে নিট পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম প্রথম আলোকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রসহ তাদের মিত্রদেশের বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের সঙ্গে আমাদের ব্যবসা খুবই কম। তবে উত্তেজনা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়ায় ব্যবসা-বাণিজ্য ও পণ্য রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।’
মোহাম্মদ হাতেম আরও বলেন, ‘আমরা এখনো রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধকল কাটিয়ে উঠতে পারিনি। এরই মধ্যে আবার ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জাহাজে পণ্য পরিবহনে খরচ বাড়বে। অন্যদিকে আকাশসীমা বন্ধ থাকায় কার্গো বিমানও চলছে না। সব মিলিয়ে পণ্য রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছি আমরা।’
অন্য দেশে প্রভাব বেশি
মধ্যপ্রাচ্যের যেসব দেশের মধ্যে এখন পর্যন্ত সংঘাত ছড়িয়েছে তার মধ্যে ইউএই ও সৌদি আরব বাংলাদেশি পণ্যের উদীয়মান বাজার। অন্য বাজারেও ইরানের চেয়ে বেশি পণ্য রপ্তানি হয়। এসব দেশে তৈরি পোশাক, হিমায়িত মাছ, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, শাকসবজি ও ফলমূল, ক্যাপ, জুতা ইত্যাদি পণ্য রপ্তানি হয়।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইউএই, সৌদি আরব, ওমান ও কাতারে প্রতি মাসে ২-৩ লাখ ডলারের প্রক্রিয়াজাত খাদ্য রপ্তানি করে হিফস অ্যাগ্রো ফুড ইন্ডাস্ট্রিজ। পরিস্থিতি দ্রুত শান্ত না হলে রপ্তানি ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ছৈয়দ মুহাম্মদ শোয়াইব হাছান। গত রাতে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হওয়া প্রক্রিয়াজাত খাদ্য রপ্তানির অর্ধেকের কাছাকাছি যায় মধ্যপ্রাচ্যে। ভারতে বিধিনিষেধের কারণে অধিকাংশ কোম্পানি হোঁচট খেয়েছে। এখন মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য রপ্তানিকারক অনেক প্রতিষ্ঠান হুমকিতে পড়বে।
ইপিবির তথ্যানুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ইউএইতে ৪০ কোটি ৭৯ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের অর্থবছরের চেয়ে ২ কোটি ৩০ লাখ ডলার বেশি। এ ছাড়া বিদায়ী অর্থবছর সৌদি আরবে ২৪ কোটি ৬২ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের অর্থবছরের তুলনায় ১ কোটি ৬ লাখ ডলার বেশি। এ ছাড়া বিদায়ী অর্থবছর বাংলাদেশ থেকে কাতারে ২ কোটি ৬০ লাখ, কুয়েতে ২ কোটি ৫৪ লাখ, বাহরাইনে ৯০ লাখ ডলার এবং ইরাকে ২৭ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়।
জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান র্যাপিডের চেয়ারম্যান এম এ রাজ্জাক প্রথম আলোকে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে ব্যবসা–বাণিজ্য কতটুকু প্রভাব ফেলবে সেটি এখনও বলার সময় হয়নি। তবে তেলের দামে একটা প্রভাব পড়েছে। এলএনজির দামও বাড়তে পারে। সেটি হলে রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়বে। তা ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে প্রচুর বাংলাদেশি কাজ করেন। তাদের কাজের জায়গা আক্রান্ত হলে তারা বেতন পাবেন না। তাতে প্রবাসী আয় কমে যেতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারকে সতর্ক পর্যবেক্ষণ করতে হবে। যখন যা করা দরকার তখন সেটি করার মতো প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হবে।