সিপিডির বাজেট পর্যালোচনা
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগ নেই
গবেষণা সংস্থাটি বলেছে, সরকারি বিভিন্ন সেবা গ্রহণে ন্যূনতম দুই হাজার টাকা করারোপের বিষয়টি অনৈতিক। তাই তারা এটি প্রত্যাহারের দাবি।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর কোনো উদ্যোগ বাজেটে ঘোষণা করেননি অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। এবারের বাজেটের সবচেয়ে দুর্বলতম দিক এটিই। অথচ দেশের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন উচ্চ মূল্যস্ফীতি। যার প্রভাব সরাসরি মানুষের ওপর পড়ছে। তাই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য এ মুহূর্তে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে প্রত্যাশা রয়েছে, সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে এ বাজেট।
প্রস্তাবিত ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেট পর্যালোচনা করে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) পক্ষ থেকে এ কথা বলা হয়েছে। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে আয়োজিত এক মিডিয়া ব্রিফিংয়ের উপস্থাপিত ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেট নিয়ে পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। এরপর সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন সিপিডির বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান, গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম, জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান প্রমুখ।
প্রস্তাবিত বাজেটে সরকারি সেবা নিতে গেলে ন্যূনতম দুই হাজার টাকা করের বিধানটি বাদ দেওয়ার সুপারিশ করেছে সিপিডি। কেননা একদিকে মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিতে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো হয়েছে, অন্যদিকে ন্যূনতম কর দুই হাজার টাকা করা হয়েছে। যাঁদের করযোগ্য আয় নেই, তাঁরাও এই করের আওতায় পড়বেন। এ কারণে উদ্যোগটি নৈতিকতার দিক থেকে ঠিক নয়, আবার যৌক্তিকও নয়।
সিপিডির পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত বাজেটে মূল্যস্ফীতি, মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ও বিনিয়োগ সূচকের ক্ষেত্রে যে লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে, তার সঙ্গে বাস্তবতার তেমন মিল নেই। দেশের অর্থনীতির বর্তমান অবস্থায় বাজেটে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রাগুলো বেশ উচ্চাকাঙ্ক্ষী। বাস্তবতা স্বীকার না করে এ ধরনের অনুমিতি বা প্রক্ষেপণের দুর্বলতার কারণে পরে বাজেট বাস্তবায়ন হোঁচট খাবে। তাতে শেষ পর্যন্ত হয়তো এসব লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নও হবে না।
ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘আগামী অর্থবছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৭ শতাংশ ধরা হয়েছে। আবার একই সময়ে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়িয়ে ২৭ দশমিক ৪ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু চলতি অর্থবছরে দেশের অর্থনীতি যেভাবে চলছে, সে আলোকে এসব লক্ষ্যমাত্রাকে উচ্চাকাঙ্ক্ষী বলে মনে হয়েছে। চলমান সামষ্টিক অর্থনীতির চ্যালেঞ্জগুলো পুরোপুরি অনুধাবন করতে এবং সে অনুযায়ী সমাধান খুঁজে বের করার ক্ষেত্রে বাজেটে পর্যাপ্ত পদক্ষেপ নেই। আমরা মনে করি, বাজেটে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা দিয়ে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হবে না।’
প্রশ্নোত্তর পর্বে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘আগেও আমরা দেখেছি, সংকটের মূল কারণগুলো অনুধাবন না করে বাজেটে লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়। এ জন্য শেষ পর্যন্ত অনুমিতিগুলো সত্য হয় না। বাস্তবতাকে বিবেচনায় না নিয়ে আকাঙ্ক্ষার পরিপ্রেক্ষিতে বাজেট করলে এমন অবস্থা হয়।’
মোস্তাফিজুর রহমান জানান, দেশের অর্থনীতি ভালোই চলছিল। কিন্তু হঠাৎ বৈশ্বিক সংকট তৈরি হওয়ার পর সেটাকে বিবেচনায় না নিয়ে গত বছর বাজেট করা হয়েছে। এর ফলে বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা তৈরি হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটেও বর্তমান বাস্তবতাকে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। এই উচ্চ আকাঙ্ক্ষার বাজেট বাস্তবায়ন করতে হলে রাজস্ব আয় চলতি বছরের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বাড়াতে হবে। আর লক্ষ্য অনুযায়ী রাজস্ব আদায় না হলে তখন ঘাটতি মেটাতে হয় ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হবে বা এডিপি কাটছাঁট করতে হবে। তা না হলে বৈদেশিক ঋণ নিতে হবে। ফলে অনুমিতির দুর্বলতার কারণে পরে অর্থনীতি প্রতিটি জায়গায় হোঁচট খাবে।
ব্যাংকঋণ, মূল্যস্ফীতিতে চাপ বাড়াবে
বাজেটের ঘাটতি অর্থায়ন পূরণে সরকার আগামী অর্থবছরে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ৩২ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা ধার নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রার কথা জানিয়েছে। সিপিডি বলছে, ব্যাংক খাতের অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। অনেক ব্যাংক তারল্যসংকটে ভুগছে। এমন পরিস্থিতিতে বেসরকারি ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার বাস্তবতা কম। সরকারের ব্যাংকঋণের বড় অংশই নেওয়া হবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার বড় অসুবিধা হচ্ছে, এ ধরনের ধার মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।
এ বিষয়ে সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, সরকার এখন যেভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছে, তাতে খুব বেশি সমস্যা হয়তো হচ্ছে না। কারণ, কেন্দ্রীয় ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বা রিজার্ভ থেকে বিপুল পরিমাণ ডলার বিক্রি করে বাজার থেকে টাকা তুলে নিচ্ছে। এ কারণে টাকার সরবরাহে বড় কোনো পরিবর্তন হয়নি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সামনের বছর কী হবে? আগামী বছর আইএমএফের শর্ত মেনে রিজার্ভ বাড়াতে হবে। রিজার্ভ বাড়াতে হলে ডলার কিনে বাজারে টাকা ছাড়তে হবে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে। তখন সরকার যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নেয়, তাহলে তা মূল্যস্ফীতিকে আরও বেশি উসকে দেবে।
ন্যূনতম কর যৌক্তিক নয়
ব্যক্তি খাতের করমুক্ত আয়সীমা ৫০ হাজার টাকা বাড়িয়ে সাড়ে ৩ লাখ টাকা করা হয়েছে বাজেটে। বাজেটের আগে বিভিন্ন পক্ষ থেকে এ দাবি করা হয়েছিল। এটি ভালো উদ্যোগ বলে মনে করে সিপিডি। সংস্থাটি বলছে, তবে সবচেয়ে বেশি আয় যাঁদের, তাঁদের কর বাড়ানোর প্রস্তাব করেছিল সিপিডি; কিন্তু সেটি করা হয়নি। বাজেটে একদিকে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো হয়েছে, অন্যদিকে ন্যূনতম দুই হাজার টাকা করারোপ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘কারও যদি করযোগ্য আয় না–ও থাকে, তাহলে সরকারি ৩৮ সেবা নিতে গেলে তাঁদের কর শনাক্তকরণ নম্বর বা টিআইএন নিতে হবে। সে ক্ষেত্রে তাঁকে দুই হাজার টাকা কর দিতে হবে। করের নিয়ম হচ্ছে, যাঁর করযোগ্য আয় আছে, তিনি কর দেবেন। কিন্তু নতুন নিয়মের ফলে যাঁদের করযোগ্য আয় নেই, তাঁদেরও করের আওতায় আনা হচ্ছে। এটি বৈষম্যমূলক ও করনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাই আমরা ন্যূনতম করের বিধানটি তুলে নেওয়ার দাবি করছি। আবার আমরা বাজেটে দেখেছি, ৩ কোটি টাকার বেশি যাঁদের সম্পদ রয়েছে, তাঁদের জন্য ছাড় দেওয়া হয়েছে। আগে ৩ কোটি টাকার সম্পদ থাকলে সারচার্জ দিতে হতো। বাজেটে সেটি বাড়িয়ে ৪ কোটি টাকা করা হয়েছে। এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’
ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘কারও একাধিক গাড়ি থাকলে সে ক্ষেত্রে বাড়তি করের প্রস্তাব করা হয়েছে। এটিকে আমরা সমর্থন করছি। এ পদক্ষেপ কর বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবেশের কথা চিন্তা করে করা হয়েছে।’
এদিকে করদাতা খুঁজতে বেসরকারি এজেন্ট নিয়োগের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তাতে একধরনের ব্রোকার বা মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণি তৈরি হতে পারে। এতে অনিয়মেরও আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছেন ফাহমিদা খাতুন।
খেলাপি ঋণ ও ব্যাংক কমিশনের দাবি
সিপিডির বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘২০০৯ সালে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার যখন ক্ষমতা গ্রহণ করে, তখন দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২১ হাজার কোটি টাকা। সেটি এখন বেড়ে ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। এটা নিয়ে কি কারও কোনো দুশ্চিন্তা নেই? কারোরই ঘুম হারাম হচ্ছে না। এ টাকা কারা নিচ্ছে, কোথায় যাচ্ছে—এ নিয়ে কারোরই কোনো মাথাব্যথা নেই। এ খেলাপি ঋণের কারণে করদাতার ওপর চাপ পড়ছে। খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকঋণের সুদ বেড়ে যাচ্ছে। এ কারণে আমরা একটি ব্যাংকিং কমিশন গঠনের দাবি জানিয়ে আসছি বহুদিন ধরে। একেবারে জিরো টলারেন্স নিয়ে কাজটি করতে হবে। প্রয়োজনীয় ইচ্ছাকৃত খেলাপি ও অনিচ্ছাকৃত খেলাপিদের আলাদাভাবে চিহ্নিত করা যেতে পারে।’
সামাজিক সুরক্ষা খাত
সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী খাতে বাজেটে যে বরাদ্দ ও আওতা বাড়ানো হয়েছে, তা পর্যাপ্ত নয় বলে জানিয়েছে সিপিডি। তারা বলেছে, চলমান মূল্যস্ফীতির কারণে সবচেয়ে বেশি অসুবিধায় পড়েছেন নিম্ন আয়ের ও দরিদ্র মানুষেরা। তাঁদের জন্য বরাদ্দ ও আওতা আরও বেশি বাড়ানো প্রয়োজন ছিল।
পেনশনের বরাদ্দকে সামাজিক নিরাপত্তা খাতের মধ্যে না দেখাতে বলে আসছে সিপিডি। গতকালও বিষয়টি পুনরায় জানান ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেন, পেনশন বাদ দিলে এই খাতে বরাদ্দ অনেক কম।
এ প্রসঙ্গে খন্দকার গোলাম মোয়োজ্জেম বলেন, বাজেটে বিভিন্ন ধরনের ভাতাভোগীর জন্য জনপ্রতি যে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে, তা আসলে এক-দুই কেজি চালের দামের সমান। জনপ্রতি বরাদ্দ গড়ে আড়াই হাজার টাকায় উন্নীত করার পরামর্শ দেন তিনি।
আইএমএফের শর্তের প্রতিফলন
গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘প্রত্যক্ষ কর বাড়ানোর ব্যাপারে সরকারের এখনো চরম অনীহা রয়েছে। বড় বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ও আয়ের মানুষকে প্রত্যক্ষ করের আওতায় আনতে চাচ্ছে না সরকার। আর অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তব্যে আইএমএফের সংস্কার নিয়ে সরাসরি কিছু বলেননি। তবে সংস্কার সম্পর্কিত বিভিন্ন সূচকে আমরা আইএমএফের শর্তের প্রতিফলন কমবেশি দেখতে পেয়েছি।’
খাতভিত্তিক বরাদ্দ
সিপিডি বাজেট পর্যালোচনায় বলেছে, প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ৩ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। তবে সেখানে উন্নয়ন বাজেটে বরাদ্দ কমেছে ১৭ শতাংশ। তার বিপরীতে অনুন্নয়ন খাতের বরাদ্দ ২৪ শতাংশ বেড়েছে। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ অনেক কম উল্লেখ করে ফাহমিদা খাতুন বলেন, সরকারি বরাদ্দ কম থাকায় মানুষের নিজের পকেট থেকে অনেক বেশি অর্থ খরচ করতে হয়।
স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন খাতে বরাদ্দ করা বাজেটের অর্থ ব্যবহারের দিক থেকেও সক্ষমতা কমেছে বলে জানিয়েছে সিপিডি। সংস্থাটি বলছে, বিভিন্ন খাতে ও প্রকল্পে প্রতিবছর যে বরাদ্দ দেওয়া হয়, তার পুরোটা সঠিকভাবে খরচ করা হয় না। সামগ্রিক কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে এটা হচ্ছে বলে মনে করে সিপিডি।
সিপিডি বলছে, ঘোষিত বাজেটে শিল্প এবং প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ বেড়েছে। তবে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ কমেছে। এ ছাড়া যুবকদের উন্নয়নের জন্য যে বিশেষ বরাদ্দ ছিল, তা প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে।
অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা অনুসারে ২০২৪ সালে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জিডিপির ৩ শতাংশ হওয়ার কথা। কিন্তু শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ধারাবাহিকভাবে জিডিপির ২ শতাংশের নিচে রয়েছে বলে পর্যালোচনায় তুলে ধরেছে সিপিডি।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বরাদ্দ চলতি অর্থবছরের তুলনায় ৪ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে। তবে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের বরাদ্দ কমেছে। সিপিডি বলেছে, বর্তমান বাস্তবতায় গ্যাস অনুসন্ধানসহ এই খাতে বরাদ্দ বাড়ানো প্রয়োজন।