৮০% পরিবারের আয়ের চেয়ে খরচ বেশি, সংসার চলে ধারদেনায়
দেশের ৮০ শতাংশ পরিবার সংসার চালানোর খরচ জোগাড় করতে পারে না। প্রতি মাসে এসব পরিবার যত টাকা আয় করে, এর চেয়ে কম আয় করেন এসব পরিবারের সদস্যরা।
সম্প্রতি প্রকাশিত বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) এক গবেষণায় এ চিত্র উঠে এসেছে।
পিপিআরসির গবেষণা অনুসারে, সবচেয়ে নিচের দিকে থাকা ৪০ শতাংশ পরিবারের প্রতি মাসের গড় আয় ১৪ হাজার ৮৮১ কোটি টাকা। কিন্তু মাসে তার খরচ ১৭ হাজার ৩৮৭ টাকা। এ ছাড়া মধ্যবর্তী অবস্থানে থাকা ৪০ শতাংশ পরিবারের মাসে গড় আয় ২৮ হাজার ৮১৮ টাকা। কিন্তু সংসার চালাতে এসব পরিবারের খরচ করতে হয় ২৯ হাজার ৭২৭ কোটি টাকা।
এর মানে, দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ পরিবার নিজের প্রয়োজন অনুসারে আয় করতে পারছে না। তাদের ধারদেনা করে চলতে হয়। পিপিআরসি বলছে, ৫২ শতাংশ পরিবার কোনো না কোনো উদ্দেশ্যে ঋণ নিয়েছে। সংসার চালানোর খরচ মেটাতে সবচেয়ে বেশি পরিবার ঋণ নিয়েছে। এক–তৃতীয়াংশ পরিবার শুধু সংসার চালাতে ধারদেনা করতে বাধ্য হয়।
অন্যদিকে দেশের সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ পরিবার ভালো আছে। প্রতি মাসে যত টাকা খরচ হয়, এর চেয়ে বেশি আয় করতে পারে। এসব পরিবারের গড় আয় মাসে ৭৮ হাজার ৫০৩ টাকা। আর খরচ ৭০ হাজার ৭৭০ টাকা।
৮ হাজার ৬৭টি পরিবারের মতামতের ওপর ভিত্তিতে গবেষণাটি করে পিপিআরসি। অন্যদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, বর্তমানে দেশে চার কোটির বেশি পরিবার আছে।
এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান প্রথম আলোকে বলেন, দেশের জনগোষ্ঠীর বড় অংশের আয় তাঁদের খরচকে সহায়তা দিতে পারছে না। তাঁরা সরকারি–বেসরকারি নানা সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। অনেকেই আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকেন। কোভিডের পর এই চাপ আরও বেড়েছে। তাঁরা আরও বেশি প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে পড়ে গেছেন। এ ছাড়া বিরাজমান মূল্যস্ফীতিতে প্রকৃত আয় কমেছে। সেভাবে মজুরি বাড়েনি। এমনি একটু আয় থাকলে জামাকাপড় কিনত, সেই অবস্থাও নেই। বিনোদন তো ভুলেই গেছেন। এটাই বাস্তব চিত্র।
সংসার চালাতে বা জীবনধারণে প্রয়োজন অনুসারে আয় করতে না পারলে ধারদেনা করে দেশের অনেক পরিবার। একেকজনের প্রয়োজন একেক ধরনের। কেউ বিপাকে পড়লে সংসারের খরচ চালাতে ঋণ নেন। বাড়ি বানানো কিংবা মেরামত করায় অনেকে ঋণ নিয়ে থাকেন। আবার কেউ সন্তানের শিক্ষার খরচ কিংবা ব্যবসায়ে বিনিয়োগের জন্য ঋণ গ্রহণ করেন।
ধারদেনার শীর্ষ ৫ খাত
পিপিআরসির গবেষণায় ঋণ নেওয়ার নানা কারণ উঠে এসেছে। এখন শীর্ষ পাঁচটি কারণ নিয়ে আলোচনা করা হলো—
১. গৃহস্থালি খরচ
এ দেশে সংসারের খরচ মেটাতে সবচেয়ে বেশি ঋণ নেন দেশের মানুষ। দৈনন্দিন খরচ মেটাতে আয় যথেষ্ট না হওয়ায় মানুষ ঋণের ওপর নির্ভর করছেন। আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবদের কাছে ধারদেনা করে সংসার চালান তাঁরা। পিপিআরসির গবেষণায় এসেছে, ঋণ নেওয়া ২৯ শতাংশ পরিবার সংসারের খরচ মেটাতে ঋণ নিয়েছে।
২. চিকিৎসার খরচ
বড় ধরনের রোগ হলে খরচ চালাতে ঋণ নেওয়া ছাড়া আর বিকল্প থাকে না। অবশ্য দিন আনি দিন খাই মানুষ রোগবালাই হলেই চিকিৎসার প্রয়োজনে টাকাপয়সা ধার নিতে বাধ্য হন। তাই ঋণ নেওয়ার দ্বিতীয় বড় কারণ হলো চিকিৎসার খরচ মেটানো। পিপিআরসির গবেষণা বলছে, ঋণগ্রহীতা পরিবারগুলোর মধ্যে ১০ দশমিক ৭৫ শতাংশ পরিবার চিকিৎসার খরচ চালাতে ঋণ নেয়।
৩. বাড়ি নির্মাণ বা মেরামত
বাড়ি বা ফ্ল্যাট নির্মাণ বেশ খরচসাপেক্ষ। নিজের জমানো টাকাপয়সায় অনেকের পক্ষে নির্মাণ খরচ চালানো সম্ভব নয়। তাই তাঁদের অনেকে ঋণ নিয়ে নির্মাণ বা মেরামত খরচ চালান। পিপিআরসির গবেষণা অনুসারে, নির্মাণ বা মেরামতের উদ্দেশ্যে ঋণ নেয় ১০ দশমিক ১৩ শতাংশ পরিবার।
৪. দোকানে বাকি খাওয়া
পাড়া বা মহল্লার দোকানে বাকি খাওয়া অনেকটা সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষ মাসের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত বাকিতে নিত্যপণ্য নেন। টাকা না থাকায় তাঁরা বাকিতে পণ্য নিতে বাধ্য হন। মাস শেষে বেতন বা মজুরি পেলে সেই বাকির টাকা পরিশোধ করা হয়। অনেকে আবার ঋণ নিয়েও দোকানের বাকির টাকা পরিশোধ করেন। পিপিআরসির গবেষণায় দোকানে বাকি খাওয়া এ কারণটি ৪ নম্বরে এসেছে। গবেষণা অনুসারে, ঋণগ্রস্ত পরিবারগুলোর মধ্যে ৯ দশমিক ২৩ শতাংশ পরিবার দোকানে বাকি খায়।
৫. ব্যবসা বা শিল্পে বিনিয়োগ
নিজেদের ছোটখাটো ব্যবসায়ে বিনিয়োগ করার জন্য অনেকে ঋণ নেন। আবার অনেক ধনী পরিবার শিল্পকারখানা স্থাপনের জন্যও ঋণ নেয়। পিপিআরসির গবেষণা বলছে, ঋণ নেওয়া পরিবারগুলোর মধ্যে ৮ দশমিক ৯৬ শতাংশ পরিবার ব্যবসায় খাটানোর জন্য ঋণ নিয়েছে।
এ ছাড়া বেশ কয়েকটি কারণে ঋণ নেওয়া হয়। এগুলো হলো কৃষি খরচ, আগের ঋণ পরিশোধ, শিক্ষা খরচ, বিদেশে যাওয়ার খরচ, অস্থাবর সম্পত্তি কেনা, কৃষি যন্ত্রপাতি ভাড়া, ভাড়া মেটানো, যৌতুক প্রদান, মুঠোফোন কেনা, চাকরির জন্য ঘুষ, বিদ্যুৎ–সংযোগের খরচ ও চাঁদা বা জবরদস্তির খরচ মেটানো।