তবে এই বাস্তবতা সবার জন্য নয়, যাঁরা আমদানি করেন এবং আমদানি করা পণ্য যাঁদের ব্যবহার করতে হয়, তাঁদের অবস্থা শোচনীয়। বিশ্বের সিংহভাগ বৈদেশিক বাণিজ্য হয় ডলারের বিনিময়ে। ফলে বাংলাদেশ, তুরস্ক, মিসর ও ভারতের মতো যেসব দেশ কাঁচামাল আমদানি করে, তাদের অবস্থা ভালো নয়। এতে অধিকাংশ আমদানি করা পণ্যের দাম স্থানীয় বাজারে রেকর্ড উচ্চতায় উঠেছে।

গত বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিক থেকেই বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি হতে শুরু করে। প্রথম দিকে এটি ছিল সরবরাহব্যবস্থাজনিত মূল্যস্ফীতি, এখন তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডলারের বাড়তি বিনিময়মূল্য। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে এমনিতে জ্বালানি তেলের দাম বাড়তি, তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডলারের রেকর্ড দাম। ফলে সব দেশকে অতিরিক্ত দামি হয়ে ওঠা ডলারের বিনিময়ে বাড়তি দামে তেল কিনতে হচ্ছে। যার প্রভাব গিয়ে পড়ছে পণ্যমূল্যে।

ডলারের বাড়তি দামের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের সুবিধা হয়েছে। সেখানে আমদানি করা পণ্যের দাম কমেছে, আবার তাঁরা যখন বিদেশে যাচ্ছেন, তখন ডলারের বিনিময়ে বাড়তি অর্থ পাচ্ছেন। কিন্তু এতে যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানিকারকেরা পড়েছেন বিপদে। দাম বেড়ে যাওয়ায় তাঁদের পণ্যের বিক্রি কমে যাচ্ছে। যেসব মার্কিন কোম্পানি বিদেশে বড় অঙ্কের মুনাফা করে, তাদের বিক্রি কমে যাচ্ছে বলে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর এক সংবাদে বলা হয়েছে। মাইক্রোসফট ও কোকাকোলার মতো কোম্পানি ইতিমধ্যে তা টের পাচ্ছে। বিক্রি কমে গেছে, সে কথা তারা এরই মধ্যে শেয়ারধারীদের জানিয়ে দিয়েছে। পাশাপাশি সে দেশের সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ হাউসে নোটিশও পাঠিয়েছে। ওয়াল স্ট্রিট-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটির শেয়ারবাজারের এসঅ্যান্ডপি সূচকভুক্ত কোম্পানিগুলোর ৪০ শতাংশ রাজস্ব আসে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে থেকে।

বিশ্বের বৈদেশিক বাণিজ্যের সিংহভাগ লেনদেনই হয় মার্কিন ডলারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাব অনুসারে, বিশ্বের ১৪৯টি দেশের রিজার্ভের প্রায় সাত লাখ কোটি ডলারে সংরক্ষণ করা আছে। মূলত এ কারণেই বিশ্বে উত্তাপ ছড়ায় ডলার। বাণিজ্যসহ নানা লেনদেনে ডলার ব্যবহার হওয়ার কারণে সব সময় ডলারের চাহিদা থাকে, আর মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভও সব সময় ডলারের বাজার চাঙা রাখার চেষ্টা করে।

কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, মার্কিন অর্থনীতি যখন চাঙা থাকে, তখন যেমন ডলারের চাহিদা বাড়ে; আবার মার্কিন অর্থনীতি যখন মন্দার কবলে পড়ে, তখনো ডলারের কদর বাড়ে। একে বলা হয় ডলার স্মাইল, আক্ষরিকভাবেই ডলার যেন হাসছে। অর্থনীতি চাঙা থাকলে বিনিয়োগকারীরা ভাবেন, এবার নিশ্চয়ই যুক্তরাষ্ট্রে নীতি সুদহার বাড়বে। নীতি সুদহার বাড়লে তাতে বন্ডের সুদও বাড়ে। ফলে বিনিয়োগকারীরা যুক্তরাষ্ট্রের বন্ডে বিনিয়োগ করেন।

অন্যদিকে অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কা এখন সারা বিশ্বকেই তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। এই মন্দার আশঙ্কাও মার্কিন ডলারকে আরও শক্তিশালী করছে। তবে এটি হচ্ছে ভয় থেকে। বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা এখনো স্বাভাবিক হয়নি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ কবে থামবে, তার খবরও কারও কাছে নেই। চীনে এখনো শূন্য কোভিড নীতি চলছে, এসব কারণে ডলার আরও বেশি হাসছে।

বিষয়টি হলো, মার্কিন ডলার যে উত্তাপ ছড়াচ্ছে, সেটা পৃথিবীর নানা প্রান্তে, নানা পেশার, এমনকি সাধারণ মানুষ পর্যন্ত টের পাচ্ছে। মার্কিন ডলারের শক্তি এমন যে তার উত্থান-পতন নানা প্রান্তের সব স্তরের মানুষকেই স্পর্শ করে। বর্তমান বাস্তবতায় সেটি আরও বেশি করে অনুভূত হচ্ছে। ইউরোপ, এশিয়াসহ নানা অঞ্চলের মুদ্রাকে কেবল অস্থিরতায় ফেলে দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি ডলার, এ কারণে স্থানীয় মুদ্রার মান নিম্নমুখী।

মার্কিন ডলার হঠাৎ করে এমন তপ্ত হয়ে উঠল কেন, এ নিয়ে নানা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ আছে। তবে একটা ব্যাখ্যা প্রণিধানযোগ্য। সেটা হলো, বিশ্বের বাজারব্যবস্থা যখন অস্বাভাবিক আচরণ করতে শুরু করে, অনিশ্চয়তায় ভোগে, বিনিয়োগকারীরা তখন নিরাপদ আশ্রয় খুঁজতে থাকেন। অর্থনীতিতে মন্দার আশঙ্কা আর অস্থিরতায় সারা বিশ্বের বিনিয়োগকারীরা কি তা হলে মার্কিন ডলারেই নিরাপত্তা খুঁজছেন।

অর্থনীতি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন