নারায়ণগঞ্জে তৈরি গাউনে বিয়ে করেন ইউরোপ–আমেরিকার কনেরা, বছরে রপ্তানি ৫০ লাখ ডলারের বেশি
ইউরোপ–আমেরিকার বিয়েতে লম্বা সাদা গাউন পরে কনেরা বিয়ের অনুষ্ঠানে যান। বিয়ের দিন এমন সাদা গাউন পরাই রেওয়াজ। সিনেমা, টেলিভিশনে এমন দৃশ্য দেখেই অভ্যস্ত এ দেশের মানুষ। কিন্তু আপনি কি জানেন, ইউরোপ–আমেরিকায় বিয়েতে কনেদের এমন গাউন বাংলাদেশে তৈরি হয়। বাংলাদেশে তৈরি গাউন ওই সব দেশে রপ্তানি হয়। এসব বিয়ের গাউনের নকশা করা হয় স্পেনে।
নারায়ণগঞ্জের আদমজী ইপিজেডের ইউবিএফ ব্রাইডাল নামের কারখানায় বিয়ের সাদা গাউন তৈরি হয়। প্রতিষ্ঠানটি প্রতিবছর ৫০ লাখ ডলারের বেশি বিয়ের গাউন রপ্তানি করে। ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ লেখা এসব গাউন পরেই কনেরা জীবনের অন্যতম স্মরণীয় ঘটনা ‘বিয়ের পিঁড়ি’তে বসেন।
নারায়ণগঞ্জ আদমজী ইপিজেডের ইউবিএফ ব্রাইডাল থেকে এসব পোশাক চলে যাচ্ছে জার্মানি, ইতালি, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ বিশ্বের প্রায় ৩৭টি দেশে। এসব গাউনের দাম ৫০০ থেকে দেড় হাজার ডলার। মূলত বিশ্ববাজারের মধ্যম দরের ক্রেতাদের জন্য এসব পোশাক তৈরি করা হয়।
প্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা গেছে, গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৫২ লাখ ৭০ হাজার ডলারের বিয়ের গাউন রপ্তানি করেছে। চলতি অর্থবছরে ৮০ থেকে ৯০ লাখ ডলারের রপ্তানি করতে চায় প্রতিষ্ঠানটি।
ইউবিএফ ব্রাইডাল ২০১৯ সালে টঙ্গীতে উৎপাদনকাজ শুরু করেছিল। শুরুতে বিশেষায়িত এ কাজের জন্য দক্ষ শ্রমিক পাওয়া যায়নি, এমন কথা জানান কোম্পানি–সংশ্লিষ্টরা। পরে জার্মানির এই কোম্পানি ২০২২ সালে আদমজী ইপিজেডে স্থানান্তর করা হয়।
প্রতিষ্ঠানটির চিফ অপারেটিং অফিসার (সিওও) মো. রবিউল হক সিদ্দিকী প্রথম আলোকে বলেন, ‘নতুন ধরনের কাজের কারণে শুরুর দিকে কর্মী পাওয়া যেত না। পরে আমরা ছয় মাসের প্রশিক্ষণ শুরু করি। নিজেরা কর্মীদের দক্ষ করে কাজে লাগাতাম। এভাবে শ্রমিকের চাহিদা মেটানো হয়।’
কারখানাটিতে বিভিন্ন নকশার বিয়ের গাউনের পাশাপাশি পশ্চিমা বিয়েতে ব্যবহার হয়, এমন নানা ধরনের পোশাকসামগ্রী তৈরি করা হয়। যেমন সাটিন ও লেসের পোশাক, বিয়ের ঘোমটা (ভেইল), বোলেরো (একধরনের জ্যাকেট), গয়না ইত্যাদি।
সরেজমিনে যা দেখা গেল
সম্প্রতি এই প্রতিবেদক নারায়ণগঞ্জ আদমজী ইপিজেডের ইউবিএফ ব্রাইডালের কারখানায় যান। সেখানে গিয়ে দেখা গেল, শ্রমিকেরা মনোযোগ দিয়ে কাজ করছেন। শ্রমিকদের বেশির ভাগই নারী কর্মী।
সফেদ কাপড়ে নিখুঁতভাবে বিভিন্ন ধরনের পুঁতি, পাথর, লেস ও জরি বসাচ্ছেন মিনা আক্তার ও সোনিয়া বেগম। তাঁদের মতো প্রায় সাড়ে ৪০০ শ্রমিকের কেউ সুই-সুতায় নকশার কাজ করছেন, কেউবা মেশিনের মাধ্যমে কাপড় কাটছেন। তাঁদের হাতের ছোঁয়ায় তৈরি হচ্ছে পশ্চিমা দেশের নববধূর চোখধাঁধানো বিশাল গাউন। জানা গেছে, একটি পোশাক তৈরিতে সময় লাগে প্রায় ১০ ঘণ্টার মতো।
মিনা আক্তার পাগলায় ও সোনিয়া বেগম আনন্দনগরে থাকেন। তাঁদের বেতন ১৫ হাজার টাকা। তাঁরা দুজনেই প্রথম আলোকে জানান, কারখানার কাজের পরিবেশ ভালো, তিন বছর ধরে এখানে কাজ করছেন। তাঁরা মূলত গাউনের লেস তৈরি করেন।
এই কারখানায় কাজ করেন নরসিংদীর বেলাব উপজেলার রত্না বেগম। তিনি চার বছর ধরে কাজ করছেন। বেতন পান সাড়ে ১৮ হাজার টাকা। তিনি মূলত পোশাকের মান দেখেন। গাড়িচালক স্বামী ও স্কুলপড়ুয়া মেয়েকে নিয়ে সংসারে স্বাচ্ছন্দ্য আছে তাঁর।
আরও বিনিয়োগের চিন্তা
পাঁচতলা ভবনে অবস্থিত এই কারখানায় একসময় মাত্র একটি উৎপাদন লাইন (প্রোডাকশন লাইন) থাকলেও এখন তা বেড়ে হয়েছে আটটি। প্রতি লাইনে কাজ করেন ২৩ জন শ্রমিক। এ ছাড়া কাটিং, মান যাচাই ও প্যাকেজিংয়ে আলাদাভাবে কাজ করা হয়।
ইউবিএফ ব্রাইডালের সিওও মো. রবিউল হক সিদ্দিকী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আরও ছয় মিলিয়ন ডলারের মতো বিনিয়োগ করতে চাই।’ নকশার জন্য কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে কথা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
বিয়ের পোশাকের বাজার কত
বৈশ্বিক বাজার পর্যবেক্ষণকারী যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বেসরকারি সংস্থা গ্র্যান্ড ভিউ রিসার্চের জুলাই মাসের তথ্য অনুসারে, ২০২৬ সালে বিশ্বজুড়ে বিয়ের পোশাকের বাজারের আকার হবে ৯২ বিলিয়ন ডলার। ২০৩০ সালের মধ্যে এ বাজারের আকার ১০৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে, এমন পূর্বাভাস সংস্থাটির। বিলাসবহুল বিয়ের পোশাকের ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে ২০২৫ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে এই বাজারের আকার বার্ষিক চক্রবৃদ্ধি সাড়ে ১৩ শতাংশ হারে বাড়বে বলে মনে করছে ভিউ রিসার্চ।
আদমজী ইপিজেড সূত্রে জানা গেছে, নদীতীরবর্তী ২৯২ একর জমির ওপর গড়ে উঠেছে আদমজী ইপিজেড। যেখানে রয়েছে ২৭৬টি শিল্প প্লট। ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত বিনিয়োগ হয়েছে ৮৪৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। আর রপ্তানি হয়েছে ১১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য।