আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ
২৬ নিরীক্ষককে জরিমানা করল এফআরসি
সবচেয়ে বেশি জরিমানা করা হয়েছে এফআরসির অনুমোদন ছাড়া নিরীক্ষা প্রতিবেদন তৈরি করায়।
জরিমানা করা হয়েছে সর্বনিম্ন ১০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ সাড়ে ৬ লাখ টাকা পর্যন্ত।
আইন অমান্য করায় ২৬ সনদপ্রাপ্ত হিসাব নিরীক্ষককে (সিএ) প্রথমবারের মতো জরিমানা করেছে ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (এফআরসি)। এসব প্রতিষ্ঠানকে সব মিলিয়ে ৩৮ লাখ ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। সম্প্রতি জরিমানার অর্থও আদায়ও করেছে এফআরসি। এসব প্রতিষ্ঠানকে আইন লঙ্ঘনের দায়ে ১০ হাজার থেকে সাড়ে ছয় লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা করা হয়েছে।
এফআরসি বলছে, পেছনের তারিখ দিয়ে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে স্বাক্ষর করা এবং অনুমোদনহীন নিরীক্ষার দায়ে এ জরিমানা করা হয়।
জানতে চাইলে এফআরসির চেয়ারম্যান মো. সাজ্জাদ হোসেন ভূইয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘নিরীক্ষা প্রতিবেদনে পেছনের তারিখ দিয়ে স্বাক্ষর দেওয়ার অর্থই হচ্ছে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হওয়া। তবে এ বিষয়ে স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা না থাকায় আমরা এক বছরের কম সময়কে জরিমানা করার জন্য বিবেচনা করিনি। সেটা করলে আরও বেশি সিএ ও সিএ প্রতিষ্ঠান জরিমানার মুখে পড়ত। কোনো জনস্বার্থ প্রতিষ্ঠানের নিরীক্ষা কোনো নিরীক্ষা ফার্ম করতে পারবে না, যদি না ওই ফার্ম এফআরসি থেকে অনুমোদন নেয়। অথচ অনেকে এ কাজ করেছে। আশা করছি, ভবিষ্যতে কেউ এ ধরনের কাজে যুক্ত হবে না।’
জরিমানা দিলেন যাঁরা
সবচেয়ে বেশি জরিমানা আরোপ করা হয়েছে এফআরসির অনুমোদন ছাড়া নিরীক্ষা প্রতিবেদন করার জন্য। এ জন্য হুদা হোসেন অ্যান্ড কোম্পানির অংশীদার মো. আমিনুল ইসলামকে সর্বোচ্চ ৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। একই দায়ে মাহফেল হক অ্যান্ড কোম্পানির অংশীদার মিয়া ফজলে করিমকে জরিমানা করা হয় ৪ লাখ টাকা।
এ ছাড়া কেএসআর অ্যান্ড কোম্পানির স্বত্বাধিকারী কাজী সাইফুর রহমান ও রহমান মোস্তফা আলম অ্যান্ড কোম্পানির অংশীদার ফাতেমা খাতুনকে সাড়ে তিন লাখ টাকা করে, এস ইসলাম অ্যান্ড কোম্পানির স্বত্বাধিকারী শাহাজুল ইসলাম এবং কাজী জহির খান অ্যান্ড কোম্পানির অংশীদার মো. এমরান হোসেন দুই লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে।
এক লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে নাসির মোহাম্মদ অ্যান্ড কোম্পানির অংশীদার নুরুল হুদা মনসুরী, মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ অ্যান্ড কোম্পানির অংশীদার মিয়া মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ, শরিফুল ইসলাম অ্যান্ড কোম্পানির স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ শরিফুল ইসলাম এবং এম হান্নান অ্যান্ড কোম্পানির অংশীদার আবদুল হককে। ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয় আলম এম জামান অ্যান্ড কোম্পানির অংশীদার ফখর উদ্দিন, এস আহমেদ অ্যান্ড কোম্পানির অংশীদার মোহাম্মদ নবি-উল-আলম, শফিকুল আলম অ্যান্ড কোম্পানির অংশীদার হুমায়ুন কবির, অরুণ অ্যান্ড কোম্পানির অংশীদার শুভ্র পাল এবং আলম ফারহানা অ্যান্ড কোম্পানির অংশীদার ফারহানা মেহজাবিনকে।
পেছনের তারিখ দিয়ে স্বাক্ষর করার দায়ে ১০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে ১১ জনকে। তাঁরা হলেন আতিক অ্যান্ড ওয়াহিদের স্বত্বাধিকারী আতিকুর রহমান খান, সিরাজ খান বসাক অ্যান্ড কোম্পানির অংশীদার ভূধর চক্রবর্তী, চৌধুরী সাজ্জাদ মনোয়ার চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টসের অংশীদার মোহাম্মদ মোস্তফা সাজ্জাদ হাসান, আতিক খালেদ চৌধুরীর অংশীদার মো. আতিকুর রহমান, এমজি কিবরিয়া অ্যান্ড কোম্পানির স্বত্বাধিকারী মো. গোলাম কিবরিয়া, আহমেদ হক সিদ্দিকী অ্যান্ড কোম্পানির অংশীদার মোশতাক আহমেদ সরওয়ার, নাসির মোহাম্মদ অ্যান্ড কোম্পানির অংশীদার রাজদেওয়ান রকিবুদ্দিন মোহাম্মদ, হক ভট্টাচার্য দাস অ্যান্ড কোম্পানির অংশীদার শতদল দাস, এস আর বোস অ্যান্ড কোম্পানির স্বত্বাধিকারী শিশির রঞ্জন বোস, জোহা জামান কবির রশিদ অ্যান্ড কোম্পানির অংশীদার তারেক রশিদ, বসু ব্যানার্জি নাথ অ্যান্ড কোম্পানির অংশীদার গোবিন্দ চন্দ্র পালকে।
এদিকে এফআরসি প্রথমবারের মতো ‘ব্যাকডেটে নিরীক্ষা প্রতিবেদন স্বাক্ষর প্রতিরোধ নীতিমালা, ২০২৬’ জারি করেছে। নীতিমালায় বলা আছে, পেছনের তারিখ অর্থাৎ ব্যাকডেটে নিরীক্ষা প্রতিবেদন স্বাক্ষর একটি গুরুতর পেশাগত অসদাচরণ হিসেবে গণ্য হবে। এ ধরনের স্বাক্ষর করা, ভুল তারিখ দেওয়া বা স্বাক্ষর–সংক্রান্ত অনিয়ম শনাক্ত হলে নিরীক্ষক ও নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে এফআরসি। নীতিমালায় বলা হয়েছে, এখন থেকে আর্থিক বিবরণীর পাদটিকায় কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদনের তারিখ উল্লেখ থাকতে হবে। আর্থিক বিবরণী ও নিরীক্ষা প্রতিবেদন পর্ষদ যে তারিখে অনুমোদন করবে, সে তারিখেই তা পরিচালক বা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে স্বাক্ষরিত হতে হবে। এমনকি স্বাক্ষর হওয়ার একই তারিখে নিরীক্ষা প্রতিবেদন ও আর্থিক বিবরণীতে স্বাক্ষর করবেন নিরীক্ষক।
নীতিমালায় আরও বলা হয়েছে, নিরীক্ষকের স্বাক্ষরের পাঁচ দিনের মধ্যে আইসিএবি থেকে নিতে হবে ডকুমেন্ট ভেরিফেকেশন কোড (ডিভিসি)। কোনো কারণে ডিভিসি নিতে দেরি হলে এফআরসিকে যথাযথ কারণ ব্যাখ্যা করতে হবে, তবে ১৫ দিনের মধ্যে তা নিতেই হবে। মোট ২০ দিনের মধ্যে ডিভিসি নিতে ব্যর্থ হলে তা ‘ব্যাকডেটে নিরীক্ষা প্রতিবেদন স্বাক্ষর’ হিসেবে গণ্য হবে।
এদিকে, ১০ হাজার টাকা জরিমানা দেওয়া আতিক অ্যান্ড ওয়াহিদ কোম্পানির স্বত্বাধিকারী আতিকুর রহমান খান এবং এক লাখ টাকা জরিমানা দেওয়া এম হান্নান অ্যান্ড কোম্পানির সনদপ্রাপ্ত হিসাববিদ আবদুল হকের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে কেউই এ বিষয়ে কথা বলতে চাননি।
তবে আইসিএবি সভাপতি এন কে এ মবিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আইন বা বিধিতে স্পষ্টতা না থাকায় ৫০ বছর ধরে একটা চর্চা চলে আসছিল। এখন নিয়ম হয়েছে, যাকে আমরা স্বাগত জানাই। আমরা এফআরসিকে অনুরোধ করেছিলাম, এ দফায় শুধু সতর্ক করে ছেড়ে দেওয়া হয়। কিন্তু এফআরসি জরিমানা করলই। তবে আমি নিশ্চয়তা দিতে পারি যে আগামী জুলাইয়ের পর এমন চর্চা প্রায় শূন্যের কোটায় নেমে আসবে।’