‘বিশ্বে কি মন্দা আসন্ন’ শীর্ষক একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিশ্বব্যাংক। মূল্যস্ফীতি কমাতে চলতি মাসেই বৈঠকে বসছে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ (ফেড) ও ব্যাংক অব ইংল্যান্ড। এই বৈঠক সামনে রেখেই বিশ্বব্যাংক গবেষণাটি করেছে।

ওয়াশিংটন থেকে গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বে অর্থনৈতিক শক্তির দিক দিয়ে শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ইউরোপ। এই তিন শক্তির অর্থনীতির চাকা দ্রুত গতি হারাচ্ছে। এর মধ্যে আগামী বছরে বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর মাঝারি কোনো আঘাত এলেও তার পরিণতি গড়াতে পারে মন্দায়। এই মন্দায় মারাত্মক পরিণতি ভোগ করবে মূলত উঠতি বাজার ও উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশগুলো।

বিশ্বব্যাংক বলছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো যেভাবে একযোগে সুদের হার বাড়াচ্ছে, তা গত পাঁচ দশকে আর দেখা যায়নি। এই প্রবণতা আগামী বছরও থাকবে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে করোনা মহামারির আগে মূল্যস্ফীতি যে পর্যায়ে ছিল, সেখানে ফিরে যেতে এসব পদক্ষেপ যথেষ্ট না-ও হতে পারে বলে ধারণা। বিনিয়োগকারীরা মনে করছেন, ২০২৩ সালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার বাড়িয়ে ৪ শতাংশ করবে, যা ২০০১ সালের গড় হারের দ্বিগুণের বেশি।

১৯৭০ সালের মন্দার পর বৈশ্বিক অর্থনীতি এখন সবচেয়ে সংকটে রয়েছে। আর আগের মন্দা শুরুর আগে মানুষের ব্যয়ের যে প্রবণতা ছিল, সে তুলনায় বর্তমানে মানুষ অনেক কম খরচ করছে। অর্থাৎ কমে গেছে ভোক্তার আস্থা।

বিশ্ব মন্দা হলে রপ্তানির ওপর একটি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। আবার মন্দা হলে জ্বালানি তেলের দাম হয়তো কিছু কমবে, বিশ্ববাজারে পণ্যের দরও কমবে, যা বাংলাদেশের জন্য ভালো দিক। তবে বৈশ্বিক সুদহার বাড়লে বিদেশি বিনিয়োগ বা বিদেশি পুঁজি ব্যয়বহুল হবে। ফলে ব্যবসা-বাণিজ্যের খরচ বেড়ে যাবে।
আহসান এইচ মনসুর, অর্থনীতিবিদ

বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ডেভিড ম্যালপাস এ নিয়ে বলছেন, বিশ্বে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি ব্যাপকভাবে কমে আসছে। ভবিষ্যতে যখন বিভিন্ন দেশ মন্দার কবলে পড়বে, তখন এই গতি আরও কমে আসতে পারে। ডেভিড ম্যালপাসের শঙ্কা, প্রবৃদ্ধি কমে আসার যে হাওয়া বইছে, তা অব্যাহত থাকবে। এর মারাত্মক পরিণতি ভোগ করতে হবে উঠতি বাজার ও উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশগুলোকে।

বিশ্বব্যাংকের দেওয়া তথ্য বলছে, সরবরাহব্যবস্থার সংকট এবং শ্রমবাজারের ওপর থাকা চাপ যদি প্রশমিত না হয়, তাহলে ২০২৩ সালে জ্বালানি খাত বাদে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়াবে ৫ শতাংশে। এই অঙ্কটা করোনা মহামারির আগের পাঁচ বছরের গড় মূল্যস্ফীতির প্রায় দ্বিগুণ। এ অবস্থায় মূল্যস্ফীতি কমাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সুদের হার অতিরিক্ত ২ শতাংশ বাড়ানোর প্রয়োজন পড়তে পারে। তবে চলতি বছরেই এরই মধ্যে এ হার গড়ে ২ শতাংশের বেশি বাড়িয়েছে তারা।

বিশ্বব্যাংকের শঙ্কা, একে তো চলছে অর্থনৈতিক সংকট, তারপর সুদের হার বৃদ্ধির এই পরিমাণ ২০২৩ সালে বিশ্বে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ কমিয়ে দিতে পারে বা শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ মাথাপিছু আয় সংকোচন করতে পারে। এমন পরিস্থিতিকেই সংজ্ঞাগতভাবে বৈশ্বিক মন্দা বলা হয়ে থাকে।

ডেভিড ম্যালপাসের ভাষ্যমতে, আসন্ন মন্দার ঝুঁকি এড়াতে ভোগ কমানোর চেয়ে বরং উৎপাদন বাড়ানোর দিকে নজর দেওয়া উচিত নীতিনির্ধারকদের। একই সঙ্গে তাঁদের বিনিয়োগ বাড়ানোর চেষ্টা করতে হবে, বাড়াতে হবে উৎপাদনশীলতা।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগের বিভিন্ন সময়ের মন্দা আমাদের দেখিয়েছে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যখন দুর্বল থাকে, তখন লম্বা সময় ধরে মূল্যস্ফীতি বাড়তে দেওয়া কতটা ঝুঁকির হতে পারে। এ ক্ষেত্রে উদাহরণ দেওয়া হয়েছে ১৯৮২ সালের মন্দার। তখন বিভিন্ন দেশের ঋণ পরিশোধের ক্ষমতা হারানোর ৪০টির বেশি ঘটনা ঘটেছিল। এ ছাড়া উন্নয়নশীল অনেক দেশ এক দশক ধরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হারিয়েছিল।

বিশ্বব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট আয়হান কোসে বলেন, সম্প্রতি বিভিন্ন দেশের আর্থিক ও রাজস্বসংক্রান্ত নীতিমালা আরও কঠোর করা হয়েছে। এই কৌশল মূল্যস্ফীতি কমাতে কাজে লাগতে পারে। তবে এসব পদক্ষেপের এমন কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যেগুলো পরিস্থিতি জটিল করে তুলতে পারে এবং বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির গতি আরও কমিয়ে দিতে পারে।

সমস্যা সমাধানে কিছু পরামর্শও দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। তারা বলছে, মূল্যস্ফীতি মোকাবিলা করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে তাদের নীতিগত সিদ্ধান্ত আরও সুস্পষ্টভাবে জানাতে হবে। একই সঙ্গে নীতিনির্ধারকদের এমন সব মধ্যমেয়াদি রাজস্ব পরিকল্পনা করতে হবে, যেগুলোর গ্রহণযোগ্যতা থাকবে এবং দরিদ্র ও দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে আছে এমন পরিবারকে সহায়তা অব্যাহত রাখতে হবে।

বিশ্বব্যাংক গবেষণায় মূলত বৈশ্বিক প্রবণতাকেই তুলে ধরেছে। সেখানে নির্দিষ্ট কোনো দেশের কথা উল্লেখ নেই। তবে বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদেরা মনে করেন, বিশ্বমন্দা হলে বাংলাদেশ এর বিরূপ প্রভাব থেকে বাইরে থাকতে পারবে না। তবে বৈশ্বিক মন্দা বাংলাদেশকে কিছু সুবিধাও দেবে। এ জন্য প্রয়োজনীয় নীতি ব্যবস্থা নিতে হবে।

অর্থনীতিবিদ, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সাবেক কর্মকর্তা আহসান এইচ মনসুর এ নিয়ে প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিশ্ব মন্দা হলে রপ্তানির ওপর একটি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। আবার মন্দা হলে জ্বালানি তেলের দাম হয়তো কিছু কমবে, বিশ্ববাজারে পণ্যের দরও কমবে, যা বাংলাদেশের জন্য ভালো দিক। তবে বৈশ্বিক সুদহার বাড়লে বিদেশি বিনিয়োগ বা বিদেশি পুঁজি ব্যয়বহুল হবে। ফলে ব্যবসা-বাণিজ্যের খরচ বেড়ে যাবে। আমরা জানি যে আমাদের বেসরকারি খাতের ২ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের বিদেশি ঋণ রয়েছে। এ ক্ষেত্রেও সুদহার বাড়বে। এতে আমাদের খরচও বেড়ে যাবে। আর ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে আমরা দুটি জায়গায় পিছিয়ে ছিলাম। যেমন বিনিময় হার ও সুদহার বৃদ্ধি। এর মধ্যে বিনিময় হারে অবমূল্যায়ন ঘটছে। কিন্তু সুদহার বাড়ানো যাচ্ছে না। এটা একটা সমস্যা। কিন্তু অন্যান্য দেশ ঠিকই পরিস্থিতির সঙ্গে মিলিয়ে নীতির সমন্বয় করছে। এ ক্ষেত্রে আমাদের ব্যর্থতা আছে।’