ভারত থেকে আমদানি কমার পাশাপাশি দেশটিতে রপ্তানিও কমেছে বাংলাদেশের। চলতি বছরের জুলাই-অক্টোবর সময়ে দেশ থেকে ভারতে ৪ লাখ ৪ হাজার ৯৪২ হাজার টন পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে প্রায় ৫০ হাজার টন কম।

মূলত দেশে কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্য আমদানি কমে যাওয়ায় রপ্তানিতে কিছুটা ভাটা পড়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। জানা গেছে, বড় আমদানিকারকেরা পণ্য আমদানি করতে পারলেও ছোটদের আমদানি করতে নানা ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। তাদের এলসি খুলতে অনেক ব্যাংকের শাখা অনীহা দেখাচ্ছে। স্থলবন্দরগুলো দিয়ে মূলত ভোগ্যপণ্য, শিল্পের কাঁচামাল, মধ্যবর্তী পণ্য, পোশাক খাতের সুতা, পাথর ইত্যাদি বেশি আমদানি হয়।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. আলমগীর প্রথম আলোকে বলেন, অর্থনীতির সার্বিক প্রভাব পড়েছে স্থলবন্দরগুলোয়। আমদানি কমেছে প্রায় ২৫-৩০ শতাংশের মতো। ছোট আমদানিকারকদের এলসি খুলতে কষ্ট হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, স্থলবন্দর দিয়ে যেহেতু ভারত থেকেই পণ্য আমদানি হয়। তাই আমরা ভারতের সঙ্গে টাকা-রুপিতে বাণিজ্য (সোয়াপ) করার কথা বলেছি। ভারতও এই প্রস্তাব দিয়েছে। কিন্তু ভারতের সঙ্গে আমাদের বাণিজ্যঘাটতি অনেক বেশি। তাই পর্যাপ্ত রুপি না থাকায় টাকা-রুপিবাণিজ্য করা যাচ্ছে না।

একমাত্র টেকনাফ স্থলবন্দর ছাড়া দেশের বাকি সব স্থলবন্দর দিয়েই ভারত থেকে পণ্য আমদানি হয়। গত মে মাস থেকে ডলারের দাম বাড়তে থাকে। ৮৬ টাকার ডলার এখন ১০০ টাকা ছাড়িয়ে গেছে। রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যায়। বিশ্বব্যাপী পণ্য সরবরাহব্যবস্থাও বিঘ্নিত হয়।

ফলে বাড়তি দামে জ্বালানি তেল, মূলধনি যন্ত্রপাতিসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্য আমদানি করতে গিয়ে খরচ বেড়ে যায়। এতে বাজারে চাপ বেড়ে ডলার–সংকট জোরালো হয়ে ওঠে। যে কারণে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪ হাজার ৮০০ কোটি ডলার থেকে কমে ৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলারে নেমে আসে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ডলারের বাজার ও রিজার্ভ ঠিক রাখতে আমদানিনীতি কঠোর করে। এলসি মার্জিন বাড়িয়ে দেওয়া হয়। ফলে আমদানির জন্য ঋণপত্র (এলসি) খোলা কমতে থাকে। সর্বশেষ গত অক্টোবর মাসে আমদানি ঋণপত্র খোলা কমেছে প্রায় ৪৫০ কোটি ডলার।

বড় চার স্থলবন্দরের হালচাল

স্থলবন্দরগুলো দিয়ে মোট আমদানির দুই-তৃতীয়াংশই আসে বেনাপোল, ভোমরা, সোনামসজিদ ও বুড়িমারী হয়ে আসে। চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে এই চার বন্দর দিয়ে আমদানি প্রায় ১৪ লাখ টন পণ্য কম হয়েছে।

জুলাই-অক্টোবর মাসে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে সোয়া ছয় লাখ টন পণ্য আমদানি হয়েছে। আমদানি কমেছে প্রায় ২ লাখ টন। গত চার মাসে ভোমরা, বুড়িমারী ও সোনামসজিদ স্থলবন্দর দিয়ে যথাক্রমে ১০ লাখ, ৯ লাখ ও ৮ লাখ ৯০ হাজার টন পণ্য আমদানি হয়েছে। এই তিন স্থলবন্দর দিয়ে মোট প্রায় ১০ লাখ টন কম পণ্য আমদানি হয়েছে।

রপ্তানিতে ভাটা

চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় স্থলবন্দরগুলো দিয়ে ভারতে প্রায় ৫০ হাজার টন কম পণ্য রপ্তানি হয়েছে। সবচেয়ে বিপদে পড়েছে সোনামসজিদ স্থলবন্দর। গত অর্থবছরে এই স্থলবন্দর দিয়ে যেখানে ২০ হাজার টন পণ্য রপ্তানি হয়েছিল, সেখানে এবার প্রথম চার মাসে মাত্র ৫ টন পণ্য রপ্তানি হয়েছে। মূলত ভোগ্যপণ্য রপ্তানি হয় এই স্থলবন্দর দিয়ে। রপ্তানিনির্ভর স্থলবন্দর আখাউড়া ও বিবিরবাজারের অবস্থাও খারাপ।

এই দুই স্থলবন্দর দিয়ে জুলাই-অক্টোবর সময়ে যথাক্রমে ১৬ হাজার ও ২৩ হাজার টন পণ্য রপ্তানি হয়েছে। অথচ এই দুটি স্থলবন্দর দিয়ে গড়ে এক লাখ টন পণ্য রপ্তানি হয়।

চট্টগ্রাম বন্দর দিয়েই মূলত দেশের সিংহভাগ পণ্য আমদানি হয়। কিন্তু স্থলপথে ভারত থেকে পণ্য আমদানি-রপ্তানির জন্য স্থলবন্দরগুলোর দিকেই মুখাপেক্ষী থাকতে হয়। ভারত হলো বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার।