কিছু আয়রোজগারের আশায় ঢাকায় রয়ে গেছি

চা তৈরি করছেন মেহেদী হাসান। আজ শনিবার ঢাকার মানিক মিয়া এভিনিউতেছবি : প্রথম আলো

ঈদের নামাজ শেষ হয়ে গেছে। ততক্ষণে অনেকেই পরিবার নিয়ে কিংবা বন্ধুবান্ধবসহ ঘুরতে বেরিয়েছেন। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে জাতীয় সংসদ ভবনের সামনের মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতেও আসেন অনেকে। এই লোকসমাগমের সুযোগ কাজে লাগিয়ে কিছু আয়রোজগারের আশায় সেখানে বসে চা–সিগারেট, বিস্কুট–পাউরুটি, কলা, পানি–কোমলপানীয় ও আইসক্রিম—এসব বিক্রির ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দোকান। এ রকমই একটি দোকান নিয়ে এসেছেন মেহেদী হাসান নামের একজন।

২৩ বছরের যুবক মেহেদী হাসান ভ্যানের আদলে স্টিল কাঠামোয় তৈরি দোকান খুলেছেন। সঙ্গে ছিলেন তাঁর বাবা শফিকুল ইসলাম। তিনি আবার বেকারির পণ্য ডেলিভারির কাজ করেন। ঈদে বেচাকেনা ভালো হয়। তাই মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে এসেছেন। আলাপের শুরুতে এই প্রতিবেদকের প্রশ্নের জবাবে মেহেদী হাসান বলেন, ‘বাড়িতে গেলে তো এক হাজার টাকা ভাড়া লাগত। রোজার মাসে তেমন আয় হয়নি। টাকা নাই। তাই এবার আর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গ্রামের বাড়িতে ঈদ করতে যাই নাই। ঈদের সময় বেচাকেনা ভালো হয়। সে জন্য কিছু আয়–রোজগারের আশায় ঢাকায় রয়ে গেছি। এখানে দোকান খুলেছি, যদি বাড়তি কিছু আয় হয়।’

মেহেদী হাসান বলেন, ‘এইডা নিয়া দুইবার আম্মা আর ভাইবোনগো লগে ঈদ করতে যাই নাই। বাসায় থাকলে আম্মা সেমাই–পায়েস রান্না করে দিত। বেকারিতে আব্বার লগে খাইলাম। তারপর কামে চইলা আইছি।’

সামনে আবারও সংসদ অধিবেশন শুরু হলে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে দোকান করা যাবে না। তাই যে কদিন বন্ধ আছে, দোকান খোলা রাখতে চান মেহেদী। কিছু আয় হলে তারপর বাড়িতে যাবেন।

মেহেদীর বাবা শফিকুল ইসলামের সঙ্গেও প্রথম আলোর কথা হয়। তিনি বলেন, ‘পাঁচ হাজার টাকা বাড়িতে পাঠাইছি কেনাকাটার জন্য। এখন একটু আয় কম। এ ছাড়া ঈদে বেকারির কাজের জন্য থাকতে হয়। তাই এবার পরিবার ছাড়াই ছেলে আর আমি মিলে ঈদ করছি।’                

প্রায় তিন বছর আগে ঢাকায় আসেন মেহেদী। সে সময় হঠাৎ বাবার হার্টে ব্লক ধরা পড়ে। তখন বাবার ডেলিভারির কাজটা মেহেদী করেন। কিছুদিন পর বাবা সুস্থ হয়। এরপর কিছুদিন বসুন্ধরা শপিং কমপ্লেক্সে একটি দোকানের কর্মচারী হিসেবে কাজ করেন। কিন্তু বেতন কম হওয়ায় সেই কাজ এক সময় ছেড়ে দেন। পরে বাবার এক বন্ধু এই দোকানটি মেহেদীকে দিয়ে যান। যত দিন তিনি আসবেন না, তত দিন দোকানটি চালাবেন মেহেদী।

বাড়তি আয়রোজগারের আশায় ঈদের দিনে মেহেদি হাসান তাঁর দোকান গোছাচ্ছেন। আজ সকালে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে
ছবি : প্রথম আলো

প্রায় ছয় মাস ধরে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে দোকানটি চালাচ্ছেন মেহেদী। চা, সিগারেট, পাউরুটি, বিস্কুট, পানি, কোমলপানীয় ইত্যাদি বিক্রি করেন। মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজারে আড়াই হাজার টাকা ভাড়ায় এক রুম নিয়ে বাবা–ছেলে একসঙ্গে থাকেন।      

ঈদে বাড়ি যাওয়া নিয়ে প্রশ্ন করলে মেহেদী হাসান বলেন, ‘চাচা ও চাচাতো ভাইরা ফোন করে যেতে বলেছেন। পকেটে খুব বেশি টাকা নাই। বাড়িতে গিয়ে খরচ করতে পারবো না। সব মিলিয়ে আর বাড়িতে যাওয়া হয়নি।’ এ সময় গলা ভারী হয়ে আসে মেহেদীর। চোখে–মুখে হতাশা নিয়ে তিনি বলেন, ‘আম্মা আজকে সকালে ফোন দিছে। দিয়া বলছে, বাড়ির মানুষ বাড়িতে না থাকলে ঈদ কইরা লাভ কী। আব্বা হইলো পরিবারের ছাতা। সে না গেলে আমি গিয়া কী লাভ? কষ্ট হইলেও আমি আর আব্বা এবার যাই নাই। এখানেই ঈদ করতেছি।’