সংস্কারের শর্তে এলডিসি উত্তরণের সময় পেছাতে পারে

স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের জন্য প্রস্তুতি নিতে আরও তিন বছর পেছানোর আবেদন জানিয়েছিল বর্তমান সরকার। সরকারের এই আবেদন জাতিসংঘের জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) আমলে নেয়। তবে তিন বছর নয়, স্বল্প সময় দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছে সিডিপি। এ জন্য আর্থিক খাত, রাজস্ব খাতসহ বিভিন্ন খাতে সংস্কার করার তাগিদ দিয়েছে সিডিপি।

বাংলাদেশের কাছে উত্তরণ পেছানোর আবেদন পাওয়ার পর বাংলাদেশ নিয়ে সংকট মূলায়ন (ক্রাইসিস অ্যাসেসমেন্ট) প্রতিবেদন তৈরি করেছে সিডিপি। ইতিমধ্যে সেই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে উত্তরণ পেছানো, সংস্কার—এসব বিষয় নিয়ে বলা হয়েছে।

এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যু্ক্ত দায়িত্বশীল সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এলডিসি পেছানোর সময় এক থেকে দুই বছর বাড়তে পারে। তবে এ জন্য সংকট কাটিয়ে প্রস্তুতির জন্য যেসব সংস্কার করতে চায় বাংলাদেশ, তা নিয়ে একটি কর্মপরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন পন্থা জানাতে হবে।

গত আট বছরের নানা প্রক্রিয়া ও একাধিক মূল্যায়ন শেষে ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর এলডিসি থেকে বের হবে বাংলাদেশ—এমন সিদ্ধান্ত জাতিসংঘের।

বিএনপি সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে আসার পরপরই গত ১৮ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘের সিডিপির কাছে এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতিকাল তিন বছর বৃদ্ধি করে ২৪ নভেম্বর ২০২৯ পর্যন্ত করার আবেদন জানায়। আবেদনে বলা হয়, গত পাঁচ বছরে একাধিক বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ ধাক্কার কারণে দেশটি উত্তরণের জন্য কার্যকর প্রস্তুতি নিতে বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

পরবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত ৬ এপ্রিল এ বিষয়ে জাতিসংঘের মহাসচিবের কাছে এক চিঠিতে তাঁর ব্যক্তিগত সহযোগিতা কামনা করেন।

বাংলাদেশের উত্তরণের প্রস্তুতিকাল বৃদ্ধির অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে ইতিবাচক অবস্থান জানিয়েছে সিডিপি। গত মঙ্গলবার রাতে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। সেখানে বলা হয়েছে, এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিকাল ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর অনুরোধে ইতিবাচক অবস্থান জানিয়েছে সিডিপি।

জাতিসংঘের সিডিপির সদস্য হলেন বাংলাদেশের বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, সিডিপির সুপারিশ বাংলাদেশের জন্য ব্যতিক্রমী সুযোগ। এই সুযোগকে যথাযথভাবে কাজ লাগানোর জন্য দ্রুততার সঙ্গে সরকার সংস্কারের প্রতিশ্রুতি এবং পরিবীক্ষণযোগ্য বাস্তবায়নের পরিকল্পনা জাতিসংঘে জানানো বাঞ্ছনীয়। তাহলে ইকোসক ও জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বিবেচনার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য আরও বলেন, এই সংস্কারকে আর্থসামাজিক অগ্রাধিকার হিসেবে না দেখে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি হিসেবে দেখা উচিত। ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের পথনকশা এখানেই আছে।

‘সিডিপির সুপারিশ বাংলাদেশের জন্য ব্যতিক্রমী সুযোগ। এই সুযোগকে যথাযথভাবে কাজ লাগানোর জন্য দ্রুততার সঙ্গে সরকার সংস্কারের প্রতিশ্রুতি এবং পরিবীক্ষণযোগ্য বাস্তবায়নের পরিকল্পনা জাতিসংঘে জানানো বাঞ্ছনীয়। তাহলে ইকোসক ও জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বিবেচনার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, সদস্য, সিডিপি

সিডিপির প্রতিবেদনে কী আছে

সিডিপির বাংলাদেশ নিয়ে সংকট মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এলডিসি উত্তরণের তিনটি নির্ধারিত সূচকেই প্রয়োজনীয় সীমা অনেক ব্যবধানে অতিক্রম করেছে। নিকট বা মধ্যমেয়াদে কোনো সূচকেই নির্ধারিত সীমার নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকি খুবই কম। সর্বশেষ আন্তর্জাতিক পূর্বাভাসও এ বিষয়টি নিশ্চিত করে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও সরবরাহব্যবস্থায় এর প্রভাব, বৈশ্বিক বাণিজ্য নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতা বাংলাদেশের জন্য গুরুতর চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

কমিটির মতে, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর বিষয়টি অনুমোদনপ্রক্রিয়ার সময় প্রশংসনীয় হবে, যদি এ সময়ে বাংলাদেশ তার স্থায়ী কাঠামোগত দুর্বলতা মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় অভ্যন্তরীণ সংস্কারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করে।

সিডিপি আরও বলেছে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সংস্কার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে রয়েছে আর্থিক খাতকে স্থিতিশীল করা, কর রাজস্ব বাড়িয়ে অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ দ্রুত বাড়ানো এবং অর্থনীতিক টেকসই করে এবং রূপান্তরে ভূমিকা রাখে, এমন ব্যয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া। এ ধরনের সংস্কারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ছাড়া প্রস্তুতিকাল বাড়ানো টেকসই উত্তরণ ও মসৃণ রূপান্তরে কীভাবে সহায়তা করবে তা স্পষ্ট নয়। তাই প্রস্তুতিকাল বাড়ানোকে সংস্কার বিলম্বিত করার অজুহাত হিসেবে দেখা উচিত নয়।

সব দিক বিবেবচনা করে সিডিপি বলেছে, অপেক্ষাকৃত স্বল্প মেয়াদের প্রস্তুতিকাল বৃদ্ধি আরও টেকসই উত্তরণের জন্য উপযোগী হতে পারে।

এরপর কী প্রক্রিয়া

এলডিসি থেকে কোন দেশ বের হবে, কীভাবে বের হবে, সময় বাড়ানো হবে কি না, এসব বিষয়ে পর্যালোচনা করে সুপারিশ করে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের (ইকোসক) অধীন গঠিত সিডিপি।

গত এপ্রিল মাসে ইকোসকে যে প্রতিবেদন পাঠিয়েছিল সিডিপি, তাতে শুধু বাংলাদেশ এলডিসি উত্তরণ পেছানোর আবেদন করেছে, তা উল্লেখ করা হয়; কিন্তু আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে একাধিক দফায় বাংলাদেশ প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করে সিডিপির সদস্যরা। এরপর মে মাসে বাংলাদেশ নিয়ে সংকট মূলায়ন (ক্রাইসিস অ্যাসেসমেন্ট) প্রতিবেদন তৈরি করে সিডিপি।

এই সংকট মূলায়ন (ক্রাইসিস অ্যাসেসমেন্ট) প্রতিবেদন ইতিমধ্যে ইকোসকে পাঠিয়ে দিয়েছে সিডিপি। চলতি মাসেই ইকোসকের একটি সভা অনুষ্ঠানের কথা রয়েছে। এর মধ্যে যদি সংকট কাটিয়ে প্রস্তুতির জন্য যা যা করতে চায় বাংলাদেশ, তা নিয়ে একটি কর্মপরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের পন্থা ইকোসককে জানাতে হবে, তাহলে ইকোসক নিজেদের মতামত দিয়ে তা জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে পাঠাতে পারে।

এরপর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ইকোসকের মতামতের ভিত্তিতে অনুমোদন দেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারে।

এখানেই শেষ নয়। ইকোসক যদি উত্তরণের সময় পেছানোর সুপারিশ না–ও করে, তাহলেও বাংলাদেশ চাইলে সরাসরি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে সময় বাড়ানোর আবেদন নিয়ে যেতে পারে। তখন সাধারণ পরিষদই সিদ্ধান্ত নেবে। সে ক্ষেত্রে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভূমিকা রাখতে পারে, এমন শক্তিশালী দেশের সহায়তা লাগবে এবং যৌক্তিক কারণ দেখাতে হবে।

এ বিষয়ে উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে—কয়েক বছর আগে আফ্রিকার দেশ অ্যাঙ্গোলা এলডিসি উত্তরণ পেছানোর আবেদন করে। সব প্রক্রিয়া শেষ হয়ে যাওয়ায় দেশটি সরাসরি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে আবেদন করে। দেশটি কারণ দেখায়, তেলের দাম পড়ে যাওয়ায় তাদের অর্থনীতি ও সামাজিক খাতের সব সূচক পড়ে গেছে। জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে পর্তুগালের সহায়তায় তারা বাড়তি সময় পায়।

সংস্কার নিয়ে বৈঠক

জাতিসংঘের সিডিপির প্রতিবেদন প্রকাশ ও ইতিবাচক অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল সকালে জরুরি বৈঠকে বসেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সেখানে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জুনায়েদ আবদুর রহিম সাকি (জোনায়েদ সাকি), বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান, গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমানসহ ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

বৈঠকে আর্থিক খাত, রাজস্ব খাত, রপ্তানি পণ্য বৈচিত্র৵করণ, ওষুধশিল্পের মেধাস্বত্ব আইন, দেশি–বিদেশি ঋণের ঝুঁকি কমানো, কর অব্যাহতি কমানো, সরকারি সেবায় সুশাসন জোরদার করা, ক্যাশলেস লেনদেন শক্তিশালী করা, বন্দরের খরচ কমানো, বিভিন্ন দেশের সঙ্গে এফটিএ করাসহ ২৫টি খাতের সংস্কার নিয়ে আলোচনা করা হয়। কোন সংস্কার কবে সম্পন্ন হবে, তা–ও আলোচনায় আসে।

বৈঠকের দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, সংস্কার কার্যক্রম তদারকির জন্য অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি গঠন করার সিদ্ধান্ত হয়। ওই কমিটি প্রতি মাসে সংস্কারের অগ্রগতি নিয়ে বৈঠক করবে। এ ছাড়া সংস্থাগুলো নিয়ে মতামত জানাতে এক সপ্তাহ সময় দিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হবে।

জানা গেছে, মন্ত্রণালয়গুলো থেকে মতামত পাওয়ার পর সংস্কার নিয়ে কর্মপরিকল্পনা এবং বাস্তবায়নে কর্মপন্থা প্রতিবেদন জাতিসংঘের ইকোসকে পাঠানো হবে।

বৈঠকে অংশ নেওয়া একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, চলতি মাসের মধ্যেই ইকোসকে সংস্কার নিয়ে প্রতিবেদন পাঠানো হবে। সংস্কার উদ্যোগগুলো মন্ত্রণালয়ভিত্তিক তদারকি করা হবে।

আট দেশের এলডিসি উত্তরণ

বর্তমানে বিশ্বে ৪৪টি স্বল্পোন্নত দেশ রয়েছে। এলডিসি দেশগুলোও একধরনের উন্নয়নশীল দেশ। যেসব দেশের সক্ষমতা তুলনামূলক কম, সেগুলোকে এই তালিকায় রাখা হয়। আগামী পাঁচ বছরে এলডিসি তালিকা থেকে বের হতে অপেক্ষায় আছে ছয়টি দেশ। বাংলাদেশ ছাড়াও ২০২৬ সালে এলডিসি থেকে উত্তরণের তালিকায় লাওস ও নেপাল আছে।

১৯৭১ সালে প্রথম স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা করা হয়। এ পর্যন্ত গত পাঁচ দশকে সব মিলিয়ে আটটি দেশ এলডিসি থেকে বের হয়েছে। দেশগুলো হলো ভুটান, বতসোয়ানা, কেপ ভার্দে, ইকুয়েটোরিয়াল গিনি, মালদ্বীপ, সামোয়া, ভানুয়াতু, সাও টোমো অ্যান্ড প্রিন্সেপ।

উত্তরণের ধাপগুলো কী কী

তিন বছর পরপর এলডিসিভুক্ত দেশগুলোর ত্রিবার্ষিক মূল্যায়ন করা হয়। মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ এবং জলবায়ু ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা—এই তিন সূচকের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয় কোনো দেশ উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের যোগ্য কি না। যেকোনো দুটি সূচকে উত্তীর্ণ হলে অথবা মাথাপিছু আয় নির্ধারিত সীমার দ্বিগুণ হলে এলডিসি থেকে বের হওয়ার সুপারিশ করে জাতিসংঘ।

বাংলাদেশ ১৯৭৫ সালে এলডিসি তালিকাভুক্ত হয়। এলডিসিভুক্ত থাকার সুবাদে পণ্য রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধাসহ নানা সুযোগ পেয়ে এসেছে। ২০১৮ ও ২০২১ সালের ত্রিবার্ষিক মূল্যায়নে তিন সূচকেই উত্তীর্ণ হয় বাংলাদেশ এবং ২০২১ সালেই চূড়ান্তভাবে সুপারিশ করা হয়, ২০২৪ সালে বাংলাদেশ এলডিসি থেকে বের হবে। তবে করোনার কারণে প্রস্তুতির জন্য দুই বছর সময় বাড়ানো হয়। আগামী সেপ্টেম্বর মাসে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বৈঠকে বাংলাদেশের সময় বাড়ানোর অনুরোধ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।