চকচকে চালের কাছে হেরে যাচ্ছে লালচে চাল, বন্ধ হচ্ছে হাসকিং মিল

শ্রমিকসংকট, পুঁজির অভাব, বাজারে চকচকে চালের চাহিদা, করপোরেট প্রতিযোগিতা ও সরকারি নীতিমালার কারণে দিনাজপুরের হাসকিং মিলগুলো টিকতে পারছে না।

দিনাজপুর সদরের বড়ইল গ্রামের মফিজ উদ্দীন হাসকিং মিল ইতিমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। একসময়ের ব্যস্ত এই হাসকিং মিলটি এখন গোখাদ্যের তুষ তৈরির কাজ করে টিকে থাকার চেষ্টা করছেছবি : প্রথম আলো

গত শতকের আশির দশকে চালের শহরখ্যাত দিনাজপুরে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে হাসকিং মিল বা ছোট চালকলের যাত্রা শুরু হয়। এসব চালকলে ধান আসত ময়মনসিংহ, নেত্রকোনাসহ বিভিন্ন জেলা থেকে। ব্যবসাটির বিকাশও ঘটছিল ভালো। ২০০০ সালের পর এ ধরনের চালকলের সংখ্যা বেড়ে আড়াই হাজার ছাড়িয়ে যায়। কিন্তু ২০১৫ সালের পর থেকে ধীরে ধীরে জৌলুশ হারাতে থাকে শিল্পটি।

শ্রমিক ও পুঁজির সংকট, বাজারে চকচকে চালের চাহিদা, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা, বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের প্রতিযোগিতা এবং সরকারি নীতিমালার কঠিন শর্তের কারণে টিকতে না পেরে এখন বিলীনের পথে শ্রমঘন এ শিল্প। সরেজমিনে ছোট চালকলমালিক ও শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে।

দিনাজপুরের রানীগঞ্জ এলাকার একটি হাসকিং মিলে গিয়ে দেখা যায়, সেটিতে তেমন ব্যস্ততা নেই। এর উদ্যোক্তা হাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে জানান, ১৯৯০ সালের দিকে প্রায় দুই একর জমিতে এই হাসকিং মিল গড়ে তোলেন। আগে ধানের মৌসুমে নারী-পুরুষ মিলিয়ে ১৫ জন শ্রমিক নিয়মিত কাজ করতেন। দিন-রাত ধান ভাপানো, শুকানো ও ভাঙানোর কাজ চলত। এখন শ্রমিকসংকট যেমন প্রকট, তেমনি বাজারে তাঁদের উৎপাদিত লালচে চালের চাহিদাও কম। সরকারিভাবেও এসব মিলের চাল কেনা হচ্ছে না।

৬৫ বছরের হাফিজুর রহমান জানান, একদিকে চাল বিক্রির টাকা বাকি পড়ে গেছে, অন্যদিকে ঋণের চাপ এবং মিল টিকিয়ে রাখার দুশ্চিন্তায় আছেন। ইতিমধ্যে তিনি হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। রিং পরানোর জন্য তাঁকে দ্রুত ঢাকায় যেতে হবে। আক্ষেপ করে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘এগুলান যারা করত তাদের ৯৯ জনই ভাগছে। এসব আর টিকবে না।’ তাঁর মতে, শ্রমিকসংকটই প্রধান কারণ। সরকার চাল কিনলেও মিলগুলো টিকে থাকতে পারত।

পারিবারিক এই ব্যবসা ধরে রাখতে না পারার হতাশায় ভুগছেন হাফিজুর রহমানের ছেলে সেলিম হোসেন। জানান, চাতালের কিছু সংস্কার করে

এবং ভুট্টা শুকিয়ে তাঁরা লাইসেন্স টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন।

হাসকিং মিলের লালচে চালে পুষ্টি ও খনিজ বেশি থাকে। দীর্ঘ সময় অতিরিক্ত চকচকে চাল খেলে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যেতে পারে। ভোক্তাদের মাঝে সচেতনতা বাড়ানো ছাড়া এ প্রবণতা বদলানো কঠিন।
—মারুফ আহমেদ, অধ্যাপক, ফুড প্রসেসিং অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

একই অবস্থা ১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত মুসলেম উদ্দীনের হাসকিং মিলের। একসময় সেখানে ৩০ থেকে ৪০ জন শ্রমিক কাজ করতেন। দুই বছর আগেও উৎপাদনে থাকা চাঁদগঞ্জের এ মিল এখন ভুট্টা শুকানোর জন্য ভাড়া দেওয়া হয়েছে।

মুসলেম উদ্দীনও অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। এখন মিলের দেখভাল করেন তাঁর ছেলে রাসেল রানা। প্রথম আলোকে রাসেল রানা বলেন, আবহাওয়ার বিরূপ আচরণও কাজকে কঠিন করে তুলেছে। রোদ না থাকলে ধান শুকানো যায় না, বৃষ্টি হলে কাজ থেমে যায়। কাজ না থাকলে বস্তাভিত্তিক চুক্তির শ্রমিক পাওয়া যায় না। অথচ অটো রাইস মিলের উৎপাদন বন্ধ হয় না। আবার অটো রাইস মিলের এজেন্টদের কারণে হাসকিং মিলে ধানের সরবরাহ কমে গেছে। সব মিলিয়ে চাতালভিত্তিক ব্যবসার মডেল ভেঙে পড়ছে।

হাফিজুর রহমান কিংবা মুসলেম উদ্দীনের মতো একই গল্প দিনাজপুরের প্রায় সব হাসকিং মিলের। গত কয়েক দিনে দিনাজপুর সদর, বিরল, বোচাগঞ্জ ও বীরগঞ্জ উপজেলার ১২টি মিল ঘুরে এমন চিত্রই দেখা গেছে। চালকলকে কেউ গুদামঘর, কেউবা চাতাল হিসেবে ভাড়া দিয়েছেন; কেউ আবার ধানের তুষ থেকে গোখাদ্য তৈরি করছেন, কেউ কেউ চালকলের জ্বালানি বানাচ্ছেন। মিলের শ্রমিকদের অনেকেই কাজ ছেড়ে দিয়ে অটোরিকশা চালাচ্ছেন।

দেশে উৎপাদিত প্রায় চার কোটি টন ধান ছাঁটাই করতে কত মিল প্রয়োজন, সে বিষয়ে কোনো জরিপ নেই। প্রয়োজনের তুলনায় বেশি মিল গড়ে ওঠায় অনেকে ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে পারছেন না। ঋণ করে মিল নির্মাণ করলেও পর্যাপ্ত আয় না হওয়ায় অনেকে ঋণখেলাপিও হয়ে গেছেন।
—মনিরুল ইসলাম, জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক, দিনাজপুর।

সরকারি পরিসংখ্যানও একই চিত্র দেখাচ্ছে। জেলা খাদ্য বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৯ সালে দিনাজপুরে ২ হাজার ১৮০টি হাসকিং মিল চালু ছিল, যা ২০২৫ সালে কমে ৭০৩টিতে নেমে গেছে। অর্থাৎ পাঁচ বছরের ব্যবধানে দুই–তৃতীয়াংশ বন্ধ, টিকে আছে মাত্র এক-তৃতীয়াংশ। তবে কাগজে–কলমে চালু থাকা অনেক মিলেও এখন আর উৎপাদন হয় না। কেউ অটো রাইস মিল থেকে চাল কিনে সরকারি গুদামে জমা দিয়ে টিকে আছেন, কেউ লাইসেন্স ভাড়া দিয়েছেন ফড়িয়াদের কাছে।

শর্তের মারপ্যাঁচ

দেশে ২০১০ সালের পর থেকে আধুনিক প্রযুক্তির অটো রাইস মিলের সংখ্যা বাড়তে থাকে। বড় করপোরেট কোম্পানিগুলো ব্যাপক বিনিয়োগ নিয়ে এ খাতে নামে। এসব মিলে ‘সটার’ করে চকচকে চাল উৎপাদন করা হয়। অন্যদিকে হাসকিং মিলের চাল কিছুটা খসখসে ও লালচে হয়ে থাকে।

২০১৫ সালে খাদ্য মন্ত্রণালয় চাল সংগ্রহে নতুন নির্দেশনা দেয়। তখন খাদ্যমন্ত্রী ছিলেন মো. কামরুল ইসলাম। মজুতের অভিযোগে বিভিন্ন মিলে অভিযান চালানো হয়। এর পর থেকেই ছোট মিলগুলোর সংকট বাড়তে থাকে।

কৃষিঋণের সুবিধা উত্তরাঞ্চলের ব্যবসায়ীরা পান না। আগে ৯ শতাংশ সুদে ঋণ পাওয়া গেলেও এখন ১৪ শতাংশ সুদ গুনতে হচ্ছে। ফলে মূলধন দিয়েই ব্যাংকঋণ শোধ করতে হচ্ছে। এতে গুটিকয় প্রতিষ্ঠানের হাতে বাজারের নিয়ন্ত্রণ চলে যাচ্ছে।
—সহিদুর রহমান পাটোয়ারি, সহসভাপতি, বাংলাদেশ অটো মেজর ও হাসকিং মিল মালিক সমিতি।

সরকারি নীতিমালার শর্ত অনুযায়ী, চালে ভাঙা দানা ২ থেকে ৬ শতাংশের বেশি থাকতে পারবে না। মরা দানা থাকতে পারবে সর্বোচ্চ শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ। প্রতি কেজি চালে একটির বেশি ধান থাকা যাবে না। অর্ধসেদ্ধ দানা থাকতে পারবে সর্বোচ্চ ১ শতাংশ।

দিনাজপুরের স্থানীয় খাদ্যগুদামের (এলএসডি) কর্মকর্তা মাহিদুল ইসলাম বলেন, এসব শর্ত পরীক্ষার জন্য তাঁদের কাছে কোনো যন্ত্র নেই। তবে দেখতে চকচকে না হলে চাল সংগ্রহ করা হয় না। ফলে হাসকিং মিলগুলো সরকারি সংগ্রহের বাইরে চলে যায়। বাধ্য হয়ে তারা অটো রাইস মিল থেকে চাল সটার বা চকচকে করাতে শুরু করে। এতে খরচ বাড়ে এবং তাদের লোকসান বৃদ্ধি পায়।

ধানের সংকট

হাসকিং মিলে ধান সেদ্ধ করার হাউস, চুল্লি ও ধান শুকানোর চাতাল থাকে। এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, দেশভাগের (১৯৪৭) আগে মাড়োয়ারিরা এ ব্যবসা শুরু করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে স্থানীয় উদ্যোক্তারা এ খাতে যুক্ত হন।

বর্তমানে ২০টি হাসকিং মিলের সমপরিমাণ সক্ষমতা নিয়ে গড়ে ওঠে একেকটি অটো রাইস মিল। কোনো কোনো বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের অটো রাইস মিলের সক্ষমতা ৩০টি অটো রাইস মিলের সমান। 

হাসকিং মিলগুলোতে ধানের সরবরাহও আগের মতো নেই। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, অটো রাইস মিলে চাল দিতে এজেন্ট নিয়োগ করা হয়। তারা কৃষকদের আগাম টাকা দিয়ে ধান কিনে নেয়। এমনকি কৃষকের গোলায়ও ধান মজুত করে রাখে বড় কোম্পানিগুলো। অন্যদিকে হাসকিং মিলগুলোর তেমন পুঁজি নেই।

জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মনিরুল ইসলাম বলেন, সারা বছর অটো রাইস মিল চালাতে একধরনের প্রতিযোগিতা চলে। তারা সক্ষমতার তিন গুণ পর্যন্ত ধান মজুত করতে পারে। এ পরিস্থিতিতে নীতিমালা পরিবর্তনের প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

টিকে থাকার চেষ্টা

নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও কিছু হাসকিং মিল এখনো টিকে আছে। সে রকম একটি হলো পুলহাট খোঁয়াড়ের মোড়ের মজিবুর রহমানের মিল। তিন দশক ধরে এ ব্যবসায়ে আছেন ৭৫ বছর বয়সী এই উদ্যোক্তা। তিনি বলেন, হাসকিং মিলের চালের ভাত মোলায়েম হয় এবং আট মাস পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়। অটো রাইস মিলের চাল দুই মাস পরই পোকায় ধরে, ভাতও শক্ত লাগে। এ কারণে সচেতন ক্রেতারা এখনো তাঁর কাছ থেকে চাল কেনেন। ঢাকা, রাজশাহীসহ বিভিন্ন এলাকায় যায় তাঁর চাল।

মিলার তথা চালকলমালিক ও বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষের খাদ্যাভ্যাস বদলে যাওয়াও হাসকিং শিল্পের পতনের বড় কারণ। দিন দিন চকচকে চালের প্রতি ভোক্তাদের আগ্রহ বাড়ছে এবং লালচে চালের চাহিদা কমেছে। এতে ভোক্তারা পুষ্টিগুণ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন।

হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুড প্রসেসিং অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মারুফ আহমেদ বলেন, হাসকিং মিলের লালচে চালে পুষ্টি ও খনিজ বেশি থাকে। দীর্ঘ সময় অতিরিক্ত চকচকে চাল খেলে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যেতে পারে। এ জন্য ভোক্তাদের সচেতন করে তোলা প্রয়োজন।

শুধু হাসকিং নয়, অটো রাইস মিলও সংকটে পড়ছে। জেলা খাদ্য বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৯ সালে জেলায় অটো রাইস মিল ছিল ৩৪৬টি। ২০২৫ সালে তা কমে হয়েছে ২২৩টিতে।

দিনাজপুরের খাদ্য নিয়ন্ত্রক মনিরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, দেশে উৎপাদিত প্রায় চার কোটি টন ধান ছাঁটাই করতে কত মিল প্রয়োজন, সে বিষয়ে কোনো জরিপ নেই। প্রয়োজনের তুলনায় বেশি মিল গড়ে ওঠায় অনেকে ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে পারছেন না। ঋণ করে মিল নির্মাণ করলেও পর্যাপ্ত আয় না হওয়ায় অনেকে ঋণখেলাপিও হয়ে গেছেন।

বাংলাদেশ অটো মেজর ও হাসকিং মিল মালিক সমিতির সহসভাপতি সহিদুর রহমান পাটোয়ারি বলেন, কৃষিঋণের সুবিধা উত্তরাঞ্চলের ব্যবসায়ীরা পান না। আগে ৯ শতাংশ সুদে ঋণ পাওয়া গেলেও এখন ১৪ শতাংশ সুদ গুনতে হচ্ছে। ফলে মূলধন দিয়েই ব্যাংকঋণ শোধ করতে হচ্ছে। এতে গুটিকয় প্রতিষ্ঠানের হাতে বাজারের নিয়ন্ত্রণ চলে যাচ্ছে।

তবে কিছু হাসকিং মিলের মালিক এখনো পুরোপুরি হাল ছাড়েননি। তেমনই একজন রানীগঞ্জ এলাকার হাসকিং মিলমালিক হাফিজুর রহমান জানান, তিনি লাইসেন্স ধরে রেখেছেন। তাঁর আশা, কোনো একদিন হয়তো আবার লালচে চালের চাহিদা বাড়বে। তবে সেই সুসময় ফিরবে কি না, তা অনেকটাই নির্ভর করছে ভোক্তার সচেতনতা ও পছন্দের ওপর।