যুক্তরাষ্ট্র থেকে সামরিক সরঞ্জাম, এলএনজি, কৃষি ও খাদ্যপণ্যের আমদানি বাড়ানোর শর্ত

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সই হওয়া পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশকে শুল্ক, শ্রম আইন, ডিজিটাল নীতি, কৃষি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ ও জাতীয় নিরাপত্তা–সংক্রান্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে বড় ধরনের সংস্কার করতে হবে। চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশকে সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাড়াতে হবে আর কিছু নির্দিষ্ট দেশের ক্ষেত্রে সীমিত রাখার চেষ্টা করতে হবে।

গত সোমবার রাতে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে চুক্তিটি সই হয়। গতকাল মঙ্গলবার চুক্তির কপি যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির (ইউএসটিআর) ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। এটি বিশ্লেষণে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশকে অনেক পণ্য কিনতে হবে, যাতে দেশটির বাণিজ্যঘাটতি কমে। বর্তমানে বাংলাদেশের সঙ্গে দেশটির বাণিজ্যঘাটতির পরিমাণ ৬০০ কোটি ডলারের বেশি।

চুক্তি অনুযায়ী, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের বেসামরিক উড়োজাহাজ, যন্ত্রাংশ ও সেবা কেনা বাড়ানো হবে। প্রথম ধাপে ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ এবং পরে আরও উড়োজাহাজ কিনবে বাংলাদেশ।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ক্রয়ের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করবে বাংলাদেশ। আগামী ১৫ বছরে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি মার্কিন ডলারের জ্বালানি আমদানি করতে হবে। এ ছাড়া প্রতিবছর ৭ লাখ টন গম ও ২৬ লাখ টন সয়াবিন ও সয়াজাত পণ্য এবং তুলা কিনবে বাংলাদেশ, যেগুলোর দাম ৩৫০ কোটি ডলার।

চুক্তি কার্যকর হওয়ার ছয় মাসের মধ্যে বাংলাদেশকে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) সব ধরনের ভর্তুকির পূর্ণাঙ্গ তথ্য জমা দিতে হবে।

চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা অনেক পণ্যে আমদানি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক ও নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক ধাপে ধাপে কমিয়ে আনতে হবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যে কোনো ধরনের কোটা আরোপ করা যাবে না। অশুল্ক বাধা কমানোর নির্দেশনাও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য যাতে প্রতিযোগিতায় ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে বাংলাদেশকে।

চিকিৎসা সরঞ্জাম, ওষুধ ও শিল্পপণ্যের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদনই চূড়ান্ত বলে স্বীকৃতি দিতে হবে। দেশটির খাদ্য ও কৃষিপণ্যের সনদও মেনে নিতে হবে। চুক্তি কার্যকর হওয়ার দুই বছরের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য বাংলাদেশে বাজারজাতকরণের সুযোগ দিতে হবে।

- প্রথম ধাপে ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনা হবে।
- ১৫ বছরে আনা হবে ১,৫০০ কোটি ডলারের এলএনজি।
- বছরে ৭ লাখ টন গম ও ২৬ লাখ টন সয়াবিন-সয়াজাত পণ্য ও তুলা কিনতে হবে।

চুক্তিতে বলা হয়েছে, কপিরাইট, ট্রেডমার্ক ও পেটেন্ট সুরক্ষায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়াসহ সব ক্ষেত্রে মেধাস্বত্ব লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি ও সীমান্তভিত্তিক ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। বাংলাদেশকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মাদ্রিদ প্রটোকল, পেটেন্ট কো-অপারেশন ট্রিটি ও একাধিক ডব্লিউআইপিও চুক্তিতে যোগ দিতে হবে এবং বিদ্যমান আইন কাঠামোয় বড় পরিবর্তন আনতে হবে।

চুক্তি অনুযায়ী, শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার অধিকার নিশ্চিত ও শ্রম আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। বাস্তবায়ন করতে হবে পরিবেশ সুরক্ষা আইন। বাণিজ্যে পরিবেশগত অসাম্য সৃষ্টি হয়—এমন পদক্ষেপ নেওয়া যাবে না। যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানির ওপর বৈষম্যমূলক ডিজিটাল করারোপ করা যাবে না এবং দেশটির ইলেকট্রনিক কনটেন্টে শুল্ক আরোপ করা যাবে না।

২০৩০ সালের মধ্যে পুরোপুরি ডিজিটাল ও কাগজবিহীন শুল্ক ব্যবস্থা চালু করা এবং ই-ডকুমেন্ট ও স্বয়ংক্রিয় ক্লিয়ারেন্স বাধ্যতামূলক করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানিতে করছাড়–সংক্রান্ত কোনো ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ডব্লিউটিওর কাছে আপত্তি তুলতে পারবে না।

চুক্তিতে আরও বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ, নিষেধাজ্ঞা ও বিনিয়োগ নিরাপত্তা নীতির সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে। তৃতীয় কোনো দেশের কোম্পানি বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে কম দামে পণ্য রপ্তানি করলে তা ঠেকানোর ব্যবস্থা নিতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বার্থের সংঘাত আছে—এমন দেশ থেকে পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর বা জ্বালানি কেনার ওপর কড়াকড়ি আরোপের শর্তও রাখা হয়েছে।

বাণিজ্য উপদেষ্টা যা বললেন

গতকাল বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে এক অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে চুক্তির বিষয়ে কথা বলেন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন ও বাণিজ্যসচিব মাহবুবুর রহমান।

বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাজার বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ। চুক্তিটি বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ৬০০ কোটি ডলারের বেশি বাণিজ্যঘাটতি কমিয়ে আনতে ভূমিকা রাখবে। ঘাটতি কমানোর লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাঠামোগত সংস্কার ও আমদানি উদারীকরণের উদ্যোগ নেয়। চুক্তিটিকে আনুষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার পাশাপাশি আলোচনার মাধ্যমে বাড়তি সুবিধা আদায় করতেও সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ।

শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, দুটি বড় অর্জন হয়েছে—পাল্টা শুল্কহার ২০ শতাংশ থেকে কমে হয়েছে ১৯ শতাংশ। আর যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ব্যবহার করে পোশাক পণ্য রপ্তানি করলে পাল্টা শুল্কহার হবে শূন্য।

বাণিজ্য উপদেষ্টা আরও বলেন, চুক্তিতে একটি শর্ত সংযুক্ত রাখা হয়েছে, যার মাধ্যমে প্রয়োজনে উপযুক্ত নোটিশ দিয়ে বাংলাদেশ এই চুক্তি থেকে বের হয়ে আসতে পারবে। ফলে ভবিষ্যতে কোনো সরকার যদি মনে করে এই চুক্তি দেশের স্বার্থের অনুকূল নয়, তাহলে তারা সে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।