ভালো ব্যবসার আশা হোটেল–রিসোর্টে, নানা প্যাকেজ বিনোদনকেন্দ্রে
পবিত্র ঈদুল ফিতর সামনে রেখে সাত দিনের সরকারি ছুটি শুরু হয়ে গেছে এরই মধ্যে। ঈদের পরে ২৪ ও ২৫ মার্চ অফিস খোলা। এরপর আবার তিন দিনের ছুটি। ফলে ঈদের আগে ও পরে মিলিয়ে দীর্ঘ ছুটি কাজে লাগাতে অনেকেই পরিবার–পরিজন নিয়ে ছুটছেন দেশের বিভিন্ন বিনোদনকেন্দ্রে। অনেকে ঈদের পরপর বেড়ানোর পরিকল্পনা চূড়ান্ত করছেন। দীর্ঘ এই ছুটিকে কাজে লাগাতে বিনোদনকেন্দ্রগুলোও সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইতিমধ্যে দেশের বিভিন্ন বিনোদনকেন্দ্র ও হোটেল–রিসোর্টে আগাম বুকিং সম্পন্ন হয়েছে। ঈদ উপলক্ষে এসব প্রতিষ্ঠান নতুন রাইড, গেম ও প্যাকেজ চালু করেছে। দীর্ঘ ছুটিতে ভ্রমণপিপাসু গ্রাহক টানতে বিভিন্ন অফার ও মূল্যছাড়ও দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানগুলো। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, করোনা, দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি, উচ্চমূল্যস্ফীতিসহ নানা কারণে দীর্ঘ সময় তাঁদের ব্যবসায় মন্দাভাব ছিল। গত বছর থেকে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। গত কয়েক বছরের মধ্যে এবার পর্যটক–দর্শনার্থীদের কাছ থেকে ভালো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে।
নানা অফার ও মূল্যছাড়
ঈদের ছুটিতে পরিবার নিয়ে অনেকেই পার্ক কিংবা চিড়িয়াখানার মতো জায়গায় ঘুরতে যান। রাজধানী ও আশপাশে এমন কিছু বিনোদনকেন্দ্র রয়েছে। ঢাকা আশুলিয়ার জামগড়ায় অবস্থিত ফ্যান্টাসি কিংডম তার মধ্যে অন্যতম। ঈদ উপলক্ষে ফ্যান্টাসি কিংডম ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে অনলাইনে আগাম টিকিট বিক্রি শুরু করে। তিন ধরনের অফার রয়েছে তাদের। এর মধ্যে ১ হাজার ১৯০ টাকায় একজন ব্যক্তি ফ্যান্টাসি কিংডমে প্রবেশ, মধ্যাহ্নভোজসহ ১২টি রাইড উপভোগ করতে পারবেন। আর ১ হাজার ৬৯০ টাকার অফারের সঙ্গে ওয়াটার কিংডমে যত খুশি রাইড–সুবিধা পাবেন। এ ছাড়া দর্শনার্থীদের জন্য ‘ভ্যালু প্যাক’ নামেও একটি অফার রয়েছে। ঈদ উপলক্ষে মূল্যছাড় দিয়ে প্যাকেজটি বিক্রি করা হচ্ছে ২ হাজার ৫০০ টাকায়। এই প্যাকেজের আওতায় রয়েছে ফ্যান্টাসি কিংডমে প্রবেশ ও ১২টি রাইড উপভোগের পাশাপাশি ওয়াটার কিংডমের সব রাইড ব্যবহারসহ আনুষঙ্গিক নানা সুবিধা। ফ্যান্টাসি কিংডম কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই প্যাকেজে ভ্রমণে আগ্রহীদের প্যাকেজটি আগাম কিনতে হবে। যিনি কিনবেন তাকেই এটি ব্যবহার করতে হবে।
ফ্যান্টাসি কিংডম পরিচালনা করে কনকর্ড গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান কনকর্ড এন্টারটেইনমেন্ট কোম্পানি। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান বিপণন কর্মকর্তা অনুপ কুমার সরকার প্রথম আলোকে বলেন, ‘গত বছর ঈদের সময় দর্শনার্থীদের ভালো উপস্থিতি ছিল। সেই অভিজ্ঞতায় এবার নতুন কিছু রাইড যুক্ত করা হয়েছে। আশা করছি, এবারও ভালো সাড়া পাব। ইতিমধ্যে ২৫ শতাংশ আগাম টিকেট বিক্রি হয়েছে।’
রাজধানীর অদূরে আশুলিয়ায় রয়েছে আরেক জনপ্রিয় বিনোদনকেন্দ্র নন্দন পার্ক। ঈদ উপলক্ষে তারাও বিভিন্ন প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এসব প্যাকেজের দাম সর্বনিম্ন ৪৫০ টাকা থেকে ৭ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত। নন্দন পার্ক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ঈদ উপলক্ষে নন্দন পার্কে সাধারণ প্রবেশ টিকিটের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে জনপ্রতি ৪৫০ টাকা, যেখানে দুটি ড্রাই পার্ক রাইড বিনা মূল্যে উপভোগ করা যাবে। এ ছাড়া স্ট্যান্ডার্ড প্যাকেজের দাম ধরা হয়েছে ৭৫০ টাকা, এতে ১০টি ড্রাই পার্ক রাইড রয়েছে। আরও বেশি রাইড উপভোগ করতে চাইলে রয়েছে ৮০০ টাকায় ‘ওয়াটার ওয়ার্ল্ড প্যাকেজ’, ১ হাজার ৫০ টাকার ‘সুপার সেভার প্যাকেজ’ এবং ১ হাজার ১৫০ টাকার ‘এক্সক্লুসিভ প্যাকেজ’। এ ছাড়া পরিবারের জন্য তিনটি আলাদা প্যাকেজ রয়েছে। এসব প্যাকেজের দাম ১ হাজার ৩০০ টাকা থেকে ৭ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত। ঈদের বন্ধে প্রতিদিনই খোলা থাকবে বিনোদন পার্ক দুটি।
রয়েছে ইনডোর গেমের ব্যবস্থা
রাজধানীর পান্থপথে বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্সে রয়েছে ইনডোর থিম পার্ক টগি ওয়ার্ল্ড। এই বিনোদনকেন্দ্রে শিশুসহ সবার জন্য বিভিন্ন ধরনের খেলার ব্যবস্থা রয়েছে। টগি ওয়ার্ল্ডের এক কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে তাদের ১৭০টির বেশি রাইড ও গেম রয়েছে। টগি ওয়ার্ল্ডে প্রবেশ ফি ১৫০ টাকা। প্রবেশের পরে বিভিন্ন প্যাকেজ আকারে বা নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দিয়ে রাইডগুলো ব্যবহারের সুযোগ পাবেন গ্রাহকেরা।
এ ছাড়া শিশু ও বড়দের ইনডোর বিনোদনের আরেক জনপ্রিয় জায়গা বাবুল্যান্ড। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ইশনাদ চৌধুরী জানান, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বাবুল্যান্ডের ১৫টি শাখা রয়েছে। এর বাইরে চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লায় রয়েছে আরও ৫টি শাখা। ঈদ উপলক্ষে বাবুল্যান্ডে ম্যাজিক শো, স্টেজ ড্রামাসহ বেশ কিছু আয়োজন রয়েছে। ৪৬০ টাকার টিকিটের বিনিময়ে ২ ঘণ্টার জন্য খেলাধুলার সুযোগ পাবে শিশুরা।
হোটেল রিসোর্টে ভালো ব্যবসার আশা
দেশে ভ্রমণপ্রিয় মানুষের অন্যতম পছন্দের জায়গা কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত। কক্সবাজারের হোটেল মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সাধারণত শীত মৌসুমে কক্সবাজারে সবচেয়ে বেশি ব্যবসা হয়। কিন্তু নির্বাচন ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে গত শীত মৌসুমে হোটেল–রিসোর্টে আশানুরূপ ব্যবসা হয়নি। তবে এবার ঈদের আগে থেকেই ভালো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে।
কক্সবাজার কলাতলী মেরিন ড্রাইভ হোটেল-রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘এবার ঈদে লম্বা ছুটি পড়েছে। তাই আমরা ভালো ব্যবসার আশা করছি। ইতিমধ্যে হোটেলভেদে ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত আগাম বুকিং হয়েছে। গত বছর ঈদুল ফিতরের টানা ছুটিতে ১০ লাখের মতো পর্যটক ভ্রমণ করেছিলেন কক্সবাজারে। এবার আরও বেশি পর্যটক আসবেন বলে আশা করছি।’
ঈদে ছুটি কাটানোর জন্য ভ্রমণপিপাসুদের কাছে আরেকটি গন্তব্য হবিগঞ্জের বাহুবলে অবস্থিত দ্য প্যালেস লাক্সারি রিসোর্ট। এই রিসোর্টে ২৪ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিভিন্ন প্যাকেজ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির এক কর্মকর্তা জানান, ঈদ উপলক্ষে আগামী ২৬ মার্চ পর্যন্ত দ্য প্যালেসের ৯০ শতাংশ রুম বুকিং হয়ে গেছে।
মৌলভীবাজার-শ্রীমঙ্গল এলাকায় অবস্থিত দুসাই রিসোর্টও অনেকের পছন্দের শীর্ষে। এই রিসোর্টে ২০ হাজার ৯০০ টাকা থেকে শুরু করে ৫২ হাজার ৯০০ টাকা পর্যন্ত বিভিন্ন প্যাকেজ রয়েছে। রিসোর্টটির একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে জানান, আগামী ২২ মার্চ পর্যন্ত তাদের ৮০ শতাংশের বেশি বুকিং হয়ে গেছে।
শ্রীমঙ্গলের গ্র্যান্ড সুলতান রিসোর্টও ভ্রমণপিপাসুদের কাছে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এরই মধ্যে। প্রতিষ্ঠানটির এক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে জানান, ঈদ উপলক্ষে ২৫ মার্চ পর্যন্ত তাদের ৯০ শতাংশের বেশি বুকিং হয়ে গেছে। এই রিসোর্টে সর্বনিম্ন ২৩ হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকার বিভিন্ন প্যাকেজ রয়েছে।
ছুটিতে নির্জন প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগের জন্য সুন্দরবন এলাকাকে পছন্দ করেন অনেকে। সুন্দরবনের দামি রিসোর্টগুলোর মধ্যে অন্যতম তিনটি হচ্ছে—সুন্দরী ইকো রিসোর্ট, বনবিবি ফরেস্ট রিসোর্ট ও জঙ্গলবাড়ি ম্যানগ্রোভ রিসোর্ট। এগুলোতে প্রিমিয়াম ক্যাটাগরির কাপল ভিলা, ডুপ্লেক্স ভিলা ও সাধারণ ভিলা রয়েছে। জনপ্রতি ২ হাজার ৬০০ টাকা থেকে সাড়ে ৬ হাজার টাকায় এসব রিসোর্টের ঈদ প্যাকেজ রয়েছে।