একাধিক নয়, দেশে একক ভ্যাটহার চালুর সুপারিশ

জাতীয় কর কাঠামো পুনর্বিন্যাস–সংক্রান্ত কমিটির প্রতিবেদনে দেশের করব্যবস্থাকে অপ্রয়োজনীয় জটিল ও অদক্ষ বলা হয়েছে। এতে করব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কারের সুপারিশ করা হয়েছে।

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) বাংলাদেশের চেয়ারম্যান জায়েদী সাত্তারের নেতৃত্বে ১১ সদস্যের কর পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত কমিটি প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে প্রতিবেদন হস্তান্তর করে। আজ মঙ্গলবার ঢাকায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায়ছবি : প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের সৌজন্যে

মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ব্যবস্থায় একাধিক হারের পরিবর্তে একক ভ্যাটহারের দিকে অগ্রসর হওয়ার সুপারিশ করেছে জাতীয় কর কাঠামো পুনর্বিন্যাস–সংক্রান্ত কমিটি। বর্তমানে ভ্যাটের মূল হার ১৫ শতাংশ হলেও বিভিন্ন খাতে তা কমিয়ে একাধিক স্তরে নির্ধারণ করা হয়েছে। এই বহুমাত্রিক হার করব্যবস্থাকে জটিল করে তুলেছে বলে মনে করে কমিটি।

আজ মঙ্গলবার ঢাকায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার কাছে জাতীয় কর কাঠামো পুনর্বিন্যাসের সুপারিশসংবলিত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। প্রতিবেদন জমা দেন কমিটির সভাপতি এবং পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) বাংলাদেশের চেয়ারম্যান জায়েদী সাত্তার।

প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময় উপস্থিত ছিলেন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী, অর্থ বিভাগের সচিব মো. খায়রুজ্জামান মজুমদার, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সচিব মো. আবদুর রহমান খান।

যা রয়েছে প্রতিবেদনে

দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং অভ্যন্তরীণ ও বহির্বাণিজ্য সহায়ক করনীতি প্রণয়নের লক্ষ্য নিয়ে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। ‘উন্নয়নের জন্য করনীতি: করব্যবস্থার পুনর্গঠনে সংস্কার কর্মসূচি’ শীর্ষক এই প্রতিবেদনে মোট ৫৫টি নীতিগত বিষয়ে সুপারিশ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে দেশের করব্যবস্থাকে অপ্রয়োজনীয় জটিল ও অদক্ষ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, বাংলাদেশের করব্যবস্থা পরোক্ষ করের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল। সে জন্য খণ্ডিত পরিবর্তনের বদলে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে করব্যবস্থার মৌলিক ও কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন।

প্রতিবেদনে অগ্রাধিকারভিত্তিতে সাতটি নীতিগত বিষয়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ২০৩০ সালের মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাত ১০ শতাংশ থেকে ১২ শতাংশে এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে তা ১৫ থেকে ২০ শতাংশে উন্নীত করা। একই সঙ্গে কাঠামোগত পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ করের অনুপাত বর্তমান ৩০: ৭০ থেকে ৫০: ৫০ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া করব্যবস্থার আধুনিকায়ন, অটোমেশন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ঝুঁকি বিশ্লেষণ, সহজ কর কাঠামো, প্রণোদনা পুনর্গঠন, ঝুঁকিভিত্তিক নিরীক্ষা এবং বাণিজ্য কর থেকে সরে এসে দেশীয় করের দিকে কৌশলগত পরিবর্তনের সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। শুল্ক কাঠামো আধুনিকায়নের ক্ষেত্রে রপ্তানি ও আমদানির বিকল্প পণ্যের কার্যকর সুরক্ষা সমান করার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, পণ্য খালাসের ক্ষেত্রে আলাদা ভ্যালুয়েশন ডেটাবেজের প্রয়োজন নেই। বন্দরে মূল্যায়নের পরিবর্তে পোস্ট ক্লিয়ারেন্স নিরীক্ষা কার্যকর করার সুপারিশ করা হয়েছে।

রাজস্ব পদ্ধতি আরও স্পষ্ট হবে

প্রতিবেদন গ্রহণ করে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস জানান, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের হাতে সময় খুবই কম। তাই এসব নীতি বাস্তবায়নের পথচলা এখনই শুরু করতে চান তাঁরা। তাঁর ভাষায়, এসব নীতি বাস্তবায়িত হলে রাজস্ব আদায়ের খাত ও পদ্ধতি আরও স্পষ্ট হবে এবং এটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় একটি বড় নীতিগত পরিবর্তন আনবে।

অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, এই প্রতিবেদন সরকারকে একটি গাইডলাইন দেবে। এর মাধ্যমে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধির পাশাপাশি এ খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

জাতীয় কর কাঠামো পুনর্বিন্যাস–সংক্রান্ত কমিটির সভাপতি জায়েদী সাত্তার বলেন, গত এক দশকে রাজস্ব আদায়ের পদ্ধতি অত্যন্ত জটিল হয়ে গেছে। এসব পদ্ধতির সংস্কার ছাড়া রাজস্ব আদায়ের পরিসর বাড়ানো কঠিন। দ্রুত সংস্কার করা গেলে অর্থনীতিতে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সচিব মো. আবদুর রহমান খান বলেন, প্রতিবেদনে এই খাতের সংকটগুলো স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি দ্রুততর ও টেকসই করতে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ানো জরুরি।

কমিটিতে যাঁরা ছিলেন

প্রতিবেদন দাখিলের সময় আরও উপস্থিত ছিলেন জাতীয় কর কাঠামো পুনর্বিন্যাস–সংক্রান্ত কমিটির সদস্য—ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের প্রফেসরিয়াল ফেলো সুলতান হাফিজ রহমান, কনকর্ডিয়া ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ইমেরিটাস সৈয়দ মইনুল আহসান, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের (বিকেবি) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জাহিদ হোসাইন, পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক খুরশীদ আলম, ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশের (আইসিএমএবি) সভাপতি মাহতাব উদ্দিন আহমেদ, ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশের (আইসিএবি) সহসভাপতি মুহাম্মদ মেহেদী হাসান, লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এলএফএমইএবি) সভাপতি সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর, ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বারস অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) জ্যেষ্ঠ অতিরিক্ত মহাসচিব শাহ মো. আব্দুল খালেক, বাজেট এক্সপার্ট কমিটির সদস্য স্নেহাশীষ বড়ুয়া এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান পাটওয়ারী।