বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহে ধীরগতি, চাপে বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধি

গ্রাফিক্স: প্রথম আলো।

বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ লক্ষ্যমাত্রার নিচে নেমে আসায় বিনিয়োগ ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে চাপ তৈরি হয়েছে। কঠোর মুদ্রানীতি ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাবে চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিক অক্টোবর-ডিসেম্বরে ব্যক্তি খাতে ব্যাংকঋণের প্রবৃদ্ধি কমে ৬ দশমিক ১০ শতাংশ হয়েছে, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও কম।

নতুন বিনিয়োগ না বাড়ায় প্রবৃদ্ধির গতি মন্থর হয়ে পড়েছে। তবে প্রবাসী আয়ের শক্তিশালী প্রবাহ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বা মজুত বাড়িয়েছে এবং সার্বিক লেনদেনের ভারসাম্যে (বিওপি) কিছুটা স্থিতি ফিরেছে।

সোমবার মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) পক্ষ থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকের অর্থনৈতিক পর্যালোচনায় দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এভাবেই তুলে ধরা হয়েছে।

এমসিসিআই বলেছে, শিল্প খাতে ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত মিলেছে। প্রথম প্রান্তিক জুলাই–সেপ্টেম্বের শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৬ দশমিক ৯৭ শতাংশ হয়েছে, যা আগের প্রান্তিকে ছিল ২ দশমিক ৩৮ শতাংশ। জিডিপিতে শিল্পের হিস্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ। উৎপাদন খাতের প্রবৃদ্ধিও বেড়ে ৬ দশমিক ১৭ শতাংশ হয়েছে। সেবা খাতের প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ হলেও জিডিপিতে এ খাতের অংশ সামান্য কমে ৫১ দশমিক ৮২ শতাংশে নেমেছে।

প্রভাবশালী ব্যবসায়ী–শিল্পপতিদের এই সংগঠন মনে করে, ব্যাংক খাতে তারল্য বেড়েছে। অক্টোবরের শেষে তফসিলি ব্যাংকগুলোর মোট তারল্য দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ২৬ হাজার ৪৬ কোটি টাকা, যা ন্যূনতম চাহিদার তুলনায় প্রায় ৩ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা বেশি। তবে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ লক্ষ্যমাত্রার নিচে রয়েছে, ডিসেম্বর শেষে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬ দশমিক ১০ শতাংশ। বিপরীতে সরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বেড়েছে ২৮ দশমিক ১৩ শতাংশ।

রাজস্ব ও উন্নয়ন ব্যয়

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) জুলাই-ডিসেম্বরে ১ লাখ ৮৫ হাজার ২২৯ কোটি টাকা আদায় করেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৪ দশমিক ১৯ শতাংশ বেশি। তবে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঘাটতি প্রায় ২০ শতাংশ। পুরো বছরের লক্ষ্য অর্জনে এনবিআরকে বাকি ছয় মাসে ৩ লাখ ১৩ হাজার ৭৭১ কোটি টাকা সংগ্রহ করতে হবে। এদিকে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন ২০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। জুলাই-ডিসেম্বরে এডিপির মোট বরাদ্দের মাত্র ১৭ দশমিক ৫৪ শতাংশ ব্যয় হয়েছে।

রপ্তানিতে ভাটা

জুলাই-ডিসেম্বরে রপ্তানি আয় শূন্য দশমিক ৫৪ শতাংশ কমে ২৪ দশমিক ৪০ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। তৈরি পোশাক খাত মোট রপ্তানির ৮০ শতাংশের বেশি জোগান দিলেও নিট ও ওভেন উভয় খাতে ধীরগতি ছিল। বিপরীতে জুলাই-নভেম্বরে আমদানি বেড়েছে ৫ দশমিক ১৬ শতাংশ।

তবে স্বস্তির জায়গা হলো প্রবাসী আয়। ডিসেম্বর মাসে প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন ৩ দশমিক ২২ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ২২ শতাংশ বেশি। ছয় মাসে মোট প্রবাসী আয় এসেছে ১৬ দশমিক ২৬ বিলিয়ন ডলার। এ ক্ষেত্রে ১৮ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে।

ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে ডিসেম্বর শেষে ৩৩ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে, যা তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। তবে চলতি হিসাবে ঘাটতি বেড়েছে ৯ দশমিক ৪১ বিলিয়ন ডলারে।

ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতি

ডিসেম্বরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ হয়েছে, যা নভেম্বরে ছিল ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৭ দশমিক ৭১ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ হয়েছে। শহরাঞ্চলে মূল্যস্ফীতির চাপ তুলনামূলক বেশি দেখা গেছে।

এদিকে অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে বিদেশে কর্মী পাঠানোর হার আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬ দশমিক ২৯ শতাংশ কমে ২ লাখ ৯৩ হাজার ৪৫২ জনে নেমেছে।

সব মিলিয়ে প্রবাসী আয় ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ইতিবাচক প্রবণতা থাকলেও রপ্তানি, বিনিয়োগ ও উন্নয়ন ব্যয়ে ধীরগতির কারণে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এখনো ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে। নীতিনির্ধারকদের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো—মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রেখে প্রবৃদ্ধিকে টেকসই পথে ফেরানো।