পুরোনো যন্ত্রপাতি ঘোষণা দিয়ে আনা হলো বিলাসবহুল বিএমডব্লিউ, লেক্সাস, রেঞ্জ রোভার গাড়ি
আমদানিকারক ঘোষণা দিয়েছিলেন, চালানে আছে হেডলাইট, ব্যবহৃত দরজা, সাসপেনশন শক অ্যাবজরভার, টেইল লাইট, এয়ার ক্লিনার বক্স, রাবার চ্যানেল, স্টিয়ারিং হুইল—গাড়ির এসব যন্ত্রাংশ। গাড়ির ব্যবহার করা এসব যন্ত্রাংশের পরিবর্তে আনা হয়েছে বিএমডব্লিউ, লেক্সাস, রেঞ্জ রোভার ও টয়োটার বিলাসবহুল গাড়ি। এই চারটি বিলাসবহুল গাড়ি কয়েকটি অংশে ভাগ করে (সিকেডি) এনে পুরোনো গাড়ির যন্ত্রাংশ হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল।
কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের এক গোয়েন্দা অভিযানে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আনা এসব গাড়ি জব্দ করা হয়েছে। এসব গাড়ির প্রতিটির মূল্য কোটি টাকার ওপরে। মোংলা বন্দরে এ ঘটনা ঘটে।
আজ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য দেওয়া হয়েছে। শতভাগ কায়িক পরীক্ষা, বিআরটিএ ও কুয়েটের বিশেষজ্ঞদের কারিগরি সহায়তা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে আমদানি করা একটি চালান থেকে ওই চারটি বিলাসবহুল গাড়ির শুল্ক ফাঁকির ঘটনা ধরা হয়।
এনবিআরের একজন কর্মকর্তা বলেন, এসব গাড়ির শুল্কায়নযোগ্য দাম কত, তা নির্ধারণ করে শুল্ক আরোপ করা হবে। এরপর আমদানিকারকের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কোন মডেলের গাড়ি ও দাম কত
এনবিআর জানিয়েছে, ওই চারটি গাড়ির মডেল হলো রেঞ্জ রোভার ভোগ, বিএমডব্লিউ ৬৫আই, লেক্সাস এলএক্স৫৭০ ও টয়োটা ক্রাউন অ্যাথলেট। এসব গাড়ির সম্ভাব্য মোট বাজারমূল্য প্রায় সাড়ে ৪ কোটি থেকে ৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা।
কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের তদন্ত অনুসারে, যুক্তরাজ্যের তৈরি রেঞ্জ রোভার ভোগ গাড়িটি ২০১৭ সালের মডেল। বাংলাদেশে এর আনুমানিক বাজারমূল্য ১ কোটি ৬০ লাখ থেকে ১ কোটি ৮৫ লাখ টাকা।
জাপানে তৈরি লেক্সাস এলএক্স৫৭০ গাড়ির আনুমানিক বাজারমূল্য ২ কোটি থেকে সাড়ে ৩ কোটি টাকা। এর মডেল বছর ২০১৬।
জার্মানির তৈরি বিএমডব্লিউ ৬৫আই মডেলের গাড়ি ২০১০ সালের মডেল। বাংলাদেশে এর মূল্য ৬০ লাখ থেকে ৯০ লাখ টাকা। টয়োটা ক্রাউন অ্যাথলেট গাড়িটি তৈরি হয়েছে জাপানে। এর দাম ৩০-৪০ লাখ টাকা।
এই গাড়িগুলো আমদানি করে রাজধানীর গেন্ডারিয়ার ক্রাউন অটোমোবাইল সার্ভিসেস।
কীভাবে ধরা পড়ল
গত জুলাই মাসে গোয়েন্দা সূত্র থেকে খবর পেয়ে ওই চারটি গাড়ির চালান স্থগিত করে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের খুলনা আঞ্চলিক কার্যালয়।
পরে ১৯ জুলাই চালানটির শতভাগ কায়িক পরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়। বিআরটিএ ও কুয়েটের বিশেষজ্ঞ টিমের কারিগরি সহায়তা, পণ্যের বিভিন্ন স্থানে লাগানো বা খোদাই করা স্টিকার, লেবেল, চিহ্ন ও নম্বর বিশ্লেষণ এবং এআইয়ের সহায়তায় গাড়িগুলোর পরিচয় শনাক্ত করা হয়।
তদন্তে দেখা গেছে, এসব চালানে পুরোনো গাড়ির সাধারণ যন্ত্রাংশ আনার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। যেমন হেডলাইট, ব্যবহৃত দরজা, সাসপেনশন শক অ্যাবজরভার, টেইল লাইট, এয়ার ক্লিনার বক্স, রাবার চ্যানেল, স্টিয়ারিং হুইল ইত্যাদি।
কিন্তু সাধারণ খুচরা যন্ত্রাংশ হিসেবে সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন করার পরিবর্তে আস্ত গাড়িগুলোকে মাত্র তিন-চারটি বড় অংশে কেটে সেমি নকড ডাউন বা সিকেডি অবস্থায় আমদানি করা হয়েছে। শুল্কায়নযোগ্য মূল্য দেখানো হয়েছে প্রায় মাত্র ৯ লাখ ৯৩ হাজার ৫৪৭ টাকা।
ঘটনাটিকে বড় অঙ্কের সম্ভাব্য শুল্ক-কর ফাঁকির প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচনা করা হলেও চূড়ান্ত রাজস্ব ফাঁকির অঙ্ক যথাযথ শুল্কায়ন শেষে নির্ধারিত হবে বলে জানিয়েছে এনবিআর। কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের আঞ্চলিক কার্যালয় চূড়ান্ত তদন্ত শেষে মোংলা কাস্টম হাউসকে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করবে।
গাড়ির ওপর আমদানি শুল্ক, নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক, অগ্রিম কর, ভ্যাট, সম্পূরক শুল্ক—এসব নানা ধরনের শুল্ক-কর বসে। তবে দামি ও বেশি সিসির ইঞ্জিনক্ষমতাবিশিষ্ট গাড়ির ওপর সম্পূরক শুল্ক বেশি বসে। সিসিভেদে গাড়ির ওপর ৩০ থেকে ৫০০ শতাংশ পর্যন্ত সম্পূরক শুল্ক বসে। এই শুল্ক ফাঁকি দিতেই নানা কৌশল ব্যবহার করেন আমদানিকারকেরা।