যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি অনুযায়ী প্রতিবছর দেশটি থেকে প্রায় সাড়ে তিন বিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্য আমদানি করবে বাংলাদেশ। গত সোমবার দুই দেশের মধ্যে সই হওয়া চুক্তির ‘বাণিজ্যিক সমঝোতা’ অংশের ৬ নম্বর ধারায় এই প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
তবে এত বিপুল পরিমাণ আমদানি বাস্তবে কতটা সম্ভব—তা নিয়ে ব্যবসায়ী ও গবেষকদের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। আমদানিকারকেরা বলছেন, বাণিজ্যিক সমঝোতা পূরণ করতে হলে আমদানি করা কৃষিপণ্যের কাঁচামালনির্ভর শিল্পকে সুরক্ষা ও নীতি সহায়তা দিতে হবে। অন্যদিকে গবেষকদের মতে, চুক্তি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি হওয়া বিপুলসংখ্যক পণ্যে শুল্কছাড় দিলে রাজস্বে চাপ তৈরি হতে পারে।
বাণিজ্যচুক্তির ৬ নম্বর ধারায় ‘বাণিজ্যিক সমঝোতা’ অংশের ৩ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্য কেনার উদ্যোগ নেবে বাংলাদেশ। এর মধ্যে থাকবে গম (পাঁচ বছর ধরে প্রতিবছর অন্তত ৭ লাখ টন), সয়াবিন ও সয়াবিনজাত পণ্য (এক বছরে অন্তত ১২৫ কোটি ডলার বা ২৬ লাখ টন) এবং তুলা। সব মিলিয়ে বছরে আমদানি করা কৃষিপণ্যের মোট আনুমানিক মূল্য হবে সাড়ে তিন বিলিয়ন বা ৩৫০ কোটি ডলার।
বাংলাদেশ বছরে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্য আমদানি করে। দূরত্ব ও পরিবহন ব্যয় বেশি হওয়ায় এত দিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি তুলনামূলক কম ছিল। তবে পাল্টা শুল্ক আরোপের পর নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগে আমদানি বাড়তে শুরু করেছে। তবু চলতি অর্থবছরের সাত মাসে তা এখনো এক বিলিয়ন ডলার ছাড়ায়নি।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে কী কী কৃষিপণ্য আসে
যুক্তরাষ্ট্র থেকে অনিয়মিতভাবে গম আমদানি হতো। পাশাপাশি তুলা, সয়াবিনবীজ ও বাদামও আসত, তবে পরিমাণ কম ছিল। পাল্টা শুল্ক আরোপের পর গত জুলাই মাসে সরকার যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম আমদানির উদ্যোগ নেয়। একই সময়ে ব্যবসায়ীদের একটি প্রতিনিধিদল যুক্তরাষ্ট্র সফরে গিয়ে আমদানি বাড়ানোর অঙ্গীকার করে। এর পর থেকেই আমদানির পরিমাণ বাড়তে শুরু করে।
গত ২০২৪–২৫ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই–জানুয়ারি) যুক্তরাষ্ট্র থেকে কৃষিপণ্য আমদানি হয়েছিল ২৭ কোটি ডলারের। চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের একই সময়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯২ কোটি ডলারে। এ সময়ে সবচেয়ে বেশি এসেছে সয়াবিনবীজ—প্রায় ৪৭ কোটি ডলারের সমমূল্যের ১১ লাখ টন সয়াবিনবীজ আমদানি হয়েছে। এ ছাড়া তুলা আমদানি হয়েছে প্রায় ২১ কোটি ডলার এবং গম এসেছে প্রায় ১৩ কোটি ডলারের।
শীর্ষ আমদানিকারকেরা যা বলছেন
চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সবচেয়ে বেশি কৃষিপণ্য আমদানি করেছে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ বা এমজিআই। গ্রুপটি ২৬ কোটি ডলারে ৬ লাখ ৩৩ হাজার টন সয়াবিনবীজ এনেছে, যা দেশটি থেকে মোট আমদানির ২৮ শতাংশ। এসব বীজ থেকে সয়াবিন তেল ও প্রাণিখাদ্য উৎপাদন করা হয়।
জানতে চাইলে এমজিআই গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল প্রথম আলোকে বলেন, বছরে ২৬ লাখ টন সয়াবিনবীজ আমদানি করতে হলে স্থানীয় সয়াবিন মাড়াইশিল্পকে সুরক্ষা দিতে হবে। এ জন্য সয়াবিনবীজ থেকে উৎপাদিত সয়াকেকের মতো প্রস্তুত পণ্যে শুল্ক আরোপ করলে কাঁচামাল আমদানি বাড়বে।
চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিতে দ্বিতীয় শীর্ষ আমদানিকারক হিসেবে উঠে এসেছে সরকারের খাদ্য অধিদপ্তর। প্রায় ১১ কোটি ৮৪ লাখ ডলারের গম আমদানি করেছে তারা। এ ছাড়া সাড়ে আট কোটি ডলারের তুলা আমদানি করে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে সায়হাম গ্রুপ।
সামুদা গ্রুপ ও সীকম গ্রুপের যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ডেলটা এগ্রোফুড ইন্ডাস্ট্রিজ ৭ কোটি ৬৬ লাখ ডলারের সয়াবিনবীজ আমদানি করে চতুর্থ এবং সিটি গ্রুপ ৪ কোটি ২১ লাখ ডলারের সয়াবিনবীজ আমদানি করে পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে।
জানতে চাইলে ডেলটা এগ্রোফুড ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিরুল হক বলেন, প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা পেলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বছরে সাড়ে তিন বিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্য আমদানি সম্ভব।
তবে বস্ত্র খাতের ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাণিজ্যচুক্তিতে মার্কিন তুলা ব্যবহার করে পোশাক রপ্তানিতে পাল্টা শুল্ক না থাকার যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, তাতে দেশটি থেকে তুলা আমদানি বাড়তে পারে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বছরে সাড়ে তিন বিলিয়ন ডলার কৃষিপণ্য আমদানি করতে হলে বাজারের স্বাভাবিক প্রতিযোগিতা আংশিকভাবে পাশ কাটাতে হবে। সরকার হয়তো অন্য দেশে কম দামে পেলেও যুক্তরাষ্ট্র থেকে বেশি দামে কিনবে। তবে বেসরকারি খাত সাধারণত সস্তা উৎস থেকেই পণ্য আনে। যুক্তরাষ্ট্রমুখী আমদানি বাড়াতে হলে তাদের ভর্তুকি বা বিশেষ সুবিধা দিতে হতে পারে—সেখানে নীতিগত প্রশ্ন উঠতে পারে।