রপ্তানিকারকদের আগ্রহ কম, তবু বিদেশে ১০ মেলা আয়োজন করতে চায় ইপিবি

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)

যুক্তরাজ্য, জার্মানি, জাপান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, তুরস্ক ও ভারতে খাদ্যপণ্য, পাোশাকসহ বিভিন্ন বাংলাদেশি পণ্যের প্রদর্শনীর আয়োজনের উদ্যোগ নিয়েছিল রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)। গত অর্থবছরে এমন ১০টি মেলা বা প্রদর্শনীর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অংশগ্রহণের জন্য আহ্বান করা হলেও বাংলাদেশি কোনো রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাতে আগ্রহ দেখায়নি। শেষ পর্যন্ত ওই সব মেলা হয়নি।

এ দেশের উদ্যোক্তাদের প্রদর্শনী বা মেলায় অংশগ্রহণ নিয়ে আগ্রহ না থাকলেও চলতি অর্থবছরে আবার নিজেদের ক্যালেন্ডারে ওই ১০টি মেলা রেখেছে ইপিবি, যা নিয়ে এখন প্রশ্ন তুলেছেন উদ্যোক্তাসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

ইপিবির এবারের মেলা ক্যালেন্ডারে ৫০টি মেলা রয়েছে। একে একে এগুলোর প্রজ্ঞাপন জারি করা হচ্ছে। এবারের ক্যালেন্ডারের মধ্যে তৈরি পোশাক খাতে ১৮টি, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্যে ৭টি, সাধারণ শ্রেণিতে ১৩টি, ওষুধে ৩টি; গৃহসামগ্রী, হস্তশিল্প ও গৃহসজ্জাসামগ্রীতে ৪টি এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ২টি মেলা রয়েছে। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য এবং প্লাস্টিক ও রাবার খাতে রয়েছে একটি করে মেলা।

গত অর্থবছরে যেসব মেলায় কোনো বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়নি, এবার সেগুলোর কয়েকটিও রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে তুরস্কের হালাল এক্সপো ও বিশ্ব হালাল সম্মেলন, যুক্তরাজ্যের আন্তর্জাতিক খাদ্য ও পানীয় মেলা ও সোর্স ফ্যাশন, জার্মানির এশিয়া অ্যাপারেল এক্সপো, দুবাইয়ের ইনডেক্স দুবাই, ভারতের ইন্ডিয়া ইন্টারন্যাশনাল মেগা ট্রেড ফেয়ার, জাপানের লাইফস্টাইল উইক টোকিও, মালয়েশিয়ার গিফট ফেয়ার এবং জার্মানির ইউরোবাইক।

আগের বছর অংশগ্রহণ না থাকা মেলা আবার তালিকায় রাখার কারণ জানতে চাইলে ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাসান আরিফ প্রথম আলোকে বলেন, ‘অনেক চিন্তা করেই নতুন মেলা ক্যালেন্ডার করা হয়েছে। নতুন এরই মধ্যে খবর পেয়েছি কিছু মেলা হবে না। যেমন: আফ্রিকায় ওষুধ খাতের মেলায় অংশ নিতে কেউ যেতে চাচ্ছেন না। “বেস্ট অব বাংলাদেশ ইন ইউরোপ” মেলাটিও না হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। চামড়ার জন্য একটি থাকলেও ফ্যাশনবিষয়ক মেলায় চামড়া খাতও অংশ নিতে পারবে। ভালো হলে নতুন মেলা আয়োজনের ব্যবস্থা করার সুযোগ রয়েছে।’

চামড়া–প্লাস্টিকে কমেছে মেলা

বাংলাদেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাত চামড়া। পোশাকের বাইরে রপ্তানি বাড়াতে দীর্ঘদিন ধরেই এ খাতকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে বড় বড় মেলায় অংশ নেওয়াও এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়। কিন্তু মেলার সংখ্যা কমে যাওয়ায় সেই নীতির সঙ্গে ক্যালেন্ডারের সামঞ্জস্য নিয়ে অভিযোগ উঠেছে।

ইপিবি সূত্রে জানা গেছে, আগের বছরগুলোতে চামড়া খাতের জন্য চার থেকে পাঁচটি মেলা থাকলেও এবার রাখা হয়েছে মাত্র একটি। এটি হলো ইতালির গার্দাব্যাগস মেলা। গত অর্থবছরেও এ খাতের জন্য ছিল হংকংয়ের এপিএলএফ চামড়া ও উপকরণ মেলা।

প্লাস্টিক খাতেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরের ক্যালেন্ডারে এ খাতের জন্য চারটি মেলা থাকলেও পরের অর্থবছরে তা নেমে আসে একটিতে। এবারও রাখা হয়েছে একটি মেলা। এবারেরটি হংকংয়ে অনুষ্ঠেয় খেলনা ও ক্রীড়াসামগ্রীর মেলা।

প্যাকেজিং, গৃহস্থালি সামগ্রী, শিল্পপণ্যসহ নানা ধরনের পণ্য তৈরি করে দেশের প্লাস্টিক খাত। এ খাতের জন্য কোনো আলাদা আন্তর্জাতিক প্লাস্টিক মেলা রাখা হয়নি। রাখা হয়েছে খেলনা ও ক্রীড়াসামগ্রীর মেলা।

বাংলাদেশ প্লাস্টিক দ্রব্য প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিপিজিএমইএ) সভাপতি শামীম আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, প্লাস্টিকের সবকিছু বিবেচনায় নিলে পোশাক খাতের পরই এ খাতের রপ্তানি অবদান সবচেয়ে বেশি। রপ্তানির পরিমাণ দুই বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ইপিবি পাশাপাশি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ও প্লাস্টিক খাতকে অবহেলা করছে। এ খাতের জন্য ক্যালেন্ডারে আরও মেলা থাকা দরকার।

সামুদ্রিক খাদ্য খাতেও মেলা কমেছে

সামুদ্রিক খাদ্য খাতেও মেলার সংখ্যা কমেছে। আগেরবার দক্ষিণ কোরিয়া, চীন ও রাশিয়ার কয়েকটি সামুদ্রিক খাদ্য মেলা ছিল। এবার এ খাতের জন্য রাখা হয়েছে শুধু বার্সেলোনার বৈশ্বিক সামুদ্রিক খাদ্য মেলা। কোন বাজারে বাংলাদেশের সামুদ্রিক খাদ্যের নতুন ক্রেতা পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি, তা বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অভিযোগ করেছেন।

এবারের ক্যালেন্ডারে নেদারল্যান্ডসে ‘বেস্ট অব বাংলাদেশ ইন ইউরোপ’ নামে একটি মেলাকে পোশাক খাতের তালিকায় রাখা হয়েছে। এটি হবে আগামী ২৪ ও ২৫ নভেম্বর। আগের অর্থবছরের ক্যালেন্ডারে একই ধরনের মেলা ছিল সাধারণ শ্রেণিতে। এবার সেটিকে পোশাক খাতের ১৮টি মেলার মধ্যে রাখা হয়েছে। এ মেলা দূতাবাস করার কথা থাকলেও করে থাকেন একজন ব্যক্তি। তিনি বাংলাদেশ অ্যাপারেল এক্সচেঞ্জের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোস্তাফিজ উদ্দিন।

জানা গেছে, ২০২৩ সালের ৪ ও ৫ সেপ্টেম্বর নেদারল্যান্ডসে মোস্তাফিজ উদ্দিনের ব্যবস্থাপনায় একই ধরনের মেলা হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, সেখানে একটি বুথের মূল্য ছিল প্রায় ১৫ লাখ টাকা, যা সাধারণ আন্তর্জাতিক মেলায় অংশ নেওয়ার খরচের তুলনায় অস্বাভাবিক বেশি। ওই মেলার জন্য ইপিবি থেকে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা ব্যয় করেছে বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশ অ্যাপারেল এক্সচেঞ্জের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোস্তাফিজ উদ্দিনকে মোবাইল ফোনে চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি।

মেলা বাছাইয়ের ভিত্তি কতটা স্পষ্ট

বিদেশি মেলায় অংশগ্রহণের মূল উদ্দেশ্য নতুন ক্রেতা খোঁজা ও রপ্তানি আদেশ পাওয়া। তাই মেলা নির্বাচনের আগে আগের অংশগ্রহণের ফলাফল বিশ্লেষণ করা গুরুত্বপূর্ণ। কোনো মেলায় কতজন ক্রেতা এসেছেন, কতটি ব্যবসায়িক যোগাযোগ তৈরি হয়েছে, কতটি রপ্তানি আদেশ পাওয়া গেছে এবং সরকারি অর্থ কত ব্যয় হয়েছে—এসব তথ্যের ভিত্তিতে পরবর্তী মেলা নির্বাচন করা হলে সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা স্পষ্ট হয়।

নতুন ক্যালেন্ডার অনুমোদনের বিষয়ে জানতে চাইলে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির গত শনিবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘এ তথ্য একেবারে বাতিল করে দেব না। তবে সততার সঙ্গে জবাব দিলে এটা বলতেই হবে, আমার হাতে এ পরিমাণ সময় নেই যে কোথায় কী মেলা হবে, তা দেখব। ইপিবি যা নিয়ে এসেছে, তাতে বলা হয়েছে এসব জায়গায় রপ্তানি সম্ভাবনা আছে। তাই অনুমোদন দিয়েছি। এমন কোনো জায়গা যদি ঠিক করা হয়ে থাকে যে অংশগ্রহণকারীরা যেতে চাচ্ছেন না, সেসব মেলা হবে না।’