বাজেটে করমুক্ত আয়সীমা বাড়তে পারে

  • সারা বছর রিটার্ন দেওয়ার সুবিধা চালু হতে পারে। এতে আগে রিটার্ন দিলে পাওয়া যাবে করছাড়ও।

  • ন্যূনতম ৫% করহার তুলে নেওয়া হতে পারে। এতে কারও কারও করের পরিমাণ বাড়তে পারে।

আগামী বাজেটে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতার করমুক্ত আয়সীমা বাড়তে পারে। করমুক্ত আয়সীমা বেড়ে হতে পারে পৌনে চার লাখ টাকা। বর্তমানে এই সীমা সাড়ে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে বাজেট ঘোষণা করবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এটি হবে ক্ষমতাসীন বিএনপির এ মেয়াদের প্রথম বাজেট।

মূলত উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে, তাই কম আয়ের করদাতাদের স্বস্তি দিতে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে এনবিআরের দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে।

অবশ্য চলতি অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার সময়ই বিদায়ী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ আগামী অর্থবছর করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর ঘোষণা দিয়ে রেখেছিলেন। নতুন সরকার এসে সীমিত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের স্বস্তির কথা চিন্তা করে অন্তর্বর্তী সরকারের ঘোষণা অনুসারে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে।

বর্তমানে দেশে ১ কোটি ২৮ লাখ কর শনাক্তকরণ নম্বরধারী (টিআইএন) রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে প্রতিবছর ৪০ থেকে ৪২ লাখ করদাতা রিটার্ন দেন। এসব করদাতাকে রিটার্ন দাখিলের সময় করমুক্ত আয়সীমা হিসাব করে কর দিতে হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সাধারণ করদাতাদের পাশাপাশি নারী করদাতা এবং ৬৫ বছরের বেশি বয়সী করদাতা, তৃতীয় লিঙ্গের করদাতা ও প্রতিবন্ধী স্বাভাবিক ব্যক্তি করদাতা, গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা করদাতা, গেজেটভুক্ত জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ২০২৪-এর আহত জুলাই যোদ্ধা করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমাও বাড়বে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তির মাতা-পিতা বা আইনানুগ অভিভাবকের প্রত্যেক সন্তান বা পোষ্যের জন্য করমুক্ত আয়ের সীমাও বাড়বে।

বর্তমানে দেশে ১ কোটি ২৮ লাখ কর শনাক্তকরণ নম্বরধারী (টিআইএন) রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে প্রতিবছর ৪০ থেকে ৪২ লাখ করদাতা রিটার্ন দেন। এসব করদাতাকে রিটার্ন দাখিলের সময় করমুক্ত আয়সীমা হিসাব করে কর দিতে হয়।

করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধির বিষয়ে গবেষণা সংস্থা পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ প্রথম আলোকে বলেন, ‘চার বছরের বেশি সময় ধরে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। সাধারণ মানুষই উচ্চ মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে বেশি চাপে আছে। এ অবস্থায় করমুক্ত আয়সীমা যদি কিছুটা বাড়ানো হয়, এতে ছোট–বড় করদাতাসহ সবাই সুবিধা পেত। গতবার কেন বাড়ানো হয়নি, তাতেই আশ্চর্য হয়েছি। ছোট করদাতাদের ওপর করের বোঝা না চাপিয়ে যাদের আয় বেশি তাদের কাছ থেকে বেশি কর আদায়ের ব্যবস্থা করা দরকার।’

উচ্চ মূল্যস্ফীতির এই সময়ে সাধারণ করদাতাদের কথা চিন্তা করে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো যৌক্তিক।
মোহাম্মদ আবদুল মজিদ, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান

ছোট করদাতাদের চাপ বাড়বে

গ্রাফিকস: প্রথম আলো

আগামী অর্থবছরে বার্ষিক করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো হলেও যাঁরা করমুক্ত আয়সীমার কিছুটা ওপরে থাকবেন, তাঁদের করের চাপ কমবে না; বরং কিছুটা বাড়তে পারে। কারণ, আগামী অর্থবছরে ৫ শতাংশের করহার তুলে দেওয়া হতে পারে। এর পরিবর্তে যাঁদের বার্ষিক আয় পৌনে চার লাখ টাকার বেশি তাঁদের ক্ষেত্রে করমুক্ত আয়সীমা পরবর্তী প্রথম ৩ লাখ টাকার ওপর ১০ শতাংশ, পরবর্তী ৪ লাখ টাকার জন্য ১৫ শতাংশ, পরবর্তী ৫ লাখ টাকার জন্য ২০ শতাংশ, পরবর্তী ২০ লাখ টাকার জন্য ২৫ শতাংশ এবং অবশিষ্ট আয়ের জন্য ৩০ শতাংশ হারে করারোপ করা হতে পারে। এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে এতে করমুক্ত আয়সীমার একটু ওপরে থাকা করদাতাদের কর বাড়বে।

বর্তমান নিয়মে, সাড়ে তিন লাখ টাকার বেশি প্রথম এক লাখ টাকার ওপর ৫ শতাংশ হারে কর দিতে হয়। কোনো করদাতার যদি সাড়ে চার লাখ টাকা বার্ষিক আয় হয়, তাহলে ওই করদাতাকে বর্তমান নিয়মে পাঁচ হাজার টাকা কর দিতে হচ্ছে। আগামী বাজেটে যদি সর্বনিম্ন করহার ৫ শতাংশ তুলে দেওয়া হয় এবং কোনো করদাতার বার্ষিক আয় সাড়ে চার লাখ টাকা হয় তাহলে ওই করদাতার ৭৫ হাজার টাকার ওপর কর বসবে। আর সেই আয়ের ওপর যদি ১০ শতাংশ হারে কর বসে তাহলে সাড়ে সাত হাজার টাকা কর দিতে হবে। এতে আগের চেয়ে তাঁর করের পরিমাণ আড়াই হাজার টাকা বাড়তে পারে।

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদ প্রথম আলোকে বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির এই সময়ে সাধারণ করদাতাদের কথা চিন্তা করে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো যৌক্তিক। এতে কিছু করদাতা হয়তো করের আওতার বাইরে চলে আসবেন; কিন্তু যাঁরা করজালের মধ্যে থাকবেন, তাঁদের একদিকে মূল্যস্ফীতির চাপ সামলাতে হবে, অন্যদিকে কর বাবদ খরচও বাড়বে। আয়ের ওপর করহার যদি বাড়িয়ে দেওয়া হয়, তাহলে করের বোঝা বেড়ে যাবে। তাই সরকারের উচিত, মূল্যস্ফীতি কমিয়ে সাধারণ মানুষ ও করদাতাদের স্বস্তি দেওয়া।

বাজেটে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর বিষয়টি সক্রিয়ভাবে চিন্তা করা হচ্ছে। ছোট ছোট করদাতাদের কষ্টের কথা বিবেচনায় নিয়ে নতুন সরকার হয়তো করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর কথা ভাবছে।
ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক), আয়কর বিভাগ, এনবিআর

মানুষের প্রকৃত আয় কমেছে

সর্বশেষ ২০২৩ সালের বাজেটে করমুক্ত আয়সীমা তিন লাখ থেকে বাড়িয়ে সাড়ে তিন লাখ টাকা করা হয়েছিল। এরপর আর করমুক্ত আয়সীমা বাড়েনি; কিন্তু গত তিন বছরে মূল্যস্ফীতির চাপ বেড়েছে। প্রতিবছর গড়ে ১০ শতাংশ হারে মূল্যস্ফীতি হয়েছে। এতে যেসব করদাতা করমুক্ত সীমার একটু ওপরে ছিলেন, তাঁদের কর দিতে হচ্ছে। আবার উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে তাঁদের জীবনযাত্রার খরচও বেড়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো বা বিবিএসের হিসাবে, সর্বশেষ গত এপ্রিলে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। গত ছয় মাসের মধ্যে পাঁচ মাসই মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের বেশি ছিল। অথচ গত এপ্রিলে জাতীয় গড় মজুরি হার ছিল ৮ দশমিক ১৬ শতাংশ। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতির তুলনায় মজুরি বেড়েছে কম।

অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, মূল্যস্ফীতির চেয়ে মজুরি বা আয় বৃদ্ধি কম হলে সাধারণ মানুষের কষ্ট বাড়ে। কারণ, তাঁদের প্রকৃত আয় কমে যায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনবিআরের আয়কর বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, বাজেটে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর বিষয়টি সক্রিয়ভাবে চিন্তা করা হচ্ছে। ছোট ছোট করদাতাদের কষ্টের কথা বিবেচনায় নিয়ে নতুন সরকার হয়তো করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর কথা ভাবছে।

এনবিআরের আয়কর বিভাগের পরিকল্পনা অনুসারে, যাঁরা আগে রিটার্ন দেবেন, তাঁদের জন্য কিছুটা করছাড় থাকবে। যাঁরা পরে দেবেন, তাঁদের খরচ বাড়বে।

শুরুতেই রিটার্ন দিলে করছাড়

আয়কর রিটার্ন
প্রতীকী ছবি

আগামী অর্থবছর থেকে বছরজুড়েই রিটার্ন দেওয়া যাবে, বাজেটে এমন ঘোষণা দেওয়া হতে পারে। বর্তমানে প্রতিবছর ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত রিটার্ন দেওয়ার নির্ধারিত সময়সীমা রয়েছে। তবে প্রতিবছর একাধিক দফায় এই সময় বাড়ানো হয়। তাই এনবিআর আগামী বছর থেকে রিটার্ন জমার নির্দিষ্ট সময় বেঁধে না দিয়ে সারা বছর রিটার্ন জমার ব্যবস্থা করতে চায়।

এনবিআরের আয়কর বিভাগের পরিকল্পনা অনুসারে, যাঁরা আগে রিটার্ন দেবেন, তাঁদের জন্য কিছুটা করছাড় থাকবে। যাঁরা পরে দেবেন, তাঁদের খরচ বাড়বে। অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) রিটার্ন দিলে যত কর আসবে, এর ৫ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দেওয়া হতে পারে। আর দ্বিতীয় প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) রিটার্ন দিলে যা কর নির্ধারণ হবে, তা দিলেই হবে। তৃতীয় প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) দিলে নিয়মিত করের পাশাপাশি জরিমানা হিসেবে ২-৫ শতাংশ করের সমপরিমাণ বাড়তি কর দিতে হতে পারে। আর চতুর্থ প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) রিটার্ন দিলে বাড়তি অর্থের পরিমাণ হতে পারে করের ৫-১০ শতাংশ। আর যাঁদের করযোগ্য আয় নেই, কিন্তু রিটার্ন দেন তাঁদের ক্ষেত্রে কিছু জরিমানা করা হতে পারে।

এখন যেহেতু সব করদাতাকে অনলাইনে রিটার্ন দিতে হয় তাই স্বয়ংক্রিয়ভাবে করের পাশাপাশি করছাড় কিংবা বাড়তি করের পরিমাণ জানা যাবে। বাড়তি কর না দিলে অনলাইনে রিটার্ন জমা দেওয়া যাবে না—এমন ব্যবস্থাও চালু করা হতে পারে।