জাপানের সঙ্গে ইপিএ হলে কী কী সুবিধা পাবে বাংলাদেশ
বাংলাদেশের ৭,৩৭৯টি পণ্য তাৎক্ষণিক শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে।
বিনিয়োগ, সেবা ও কর্মসংস্থানে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের এক সপ্তাহ আগে জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) সই করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। জাপানের রাজধানী টোকিওতে আগামী ৬ ফেব্রুয়ারি এই চুক্তি সই হবে।
বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন ও বাণিজ্যসচিব মাহবুবুর রহমান এই চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
ভুটানের সঙ্গে অগ্রাধিকার বাণিজ্যচুক্তি (পিটিএ) ছাড়া আর কোনো দেশের সঙ্গেই বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় কোনো অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যচুক্তি নেই। জাপানের সঙ্গে ইপিএ সইয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ এ প্রক্রিয়া শুরু করবে। সরকার মনে করছে, এতে শুধু বাণিজ্যই নয়, বরং বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের নতুন সম্ভাবনার দ্বারও খুলবে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও যুক্তরাষ্ট্রনির্ভরতা কমবে, অন্যদিকে জাপানই বাংলাদেশের বড় বাজার হয়ে উঠবে। তবে কিছু ঝুঁকিও দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশ-জাপান ইপিএর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের আমলে। তখন দর-কষাকষির ভিত্তি তৈরিতে গঠন করা হয় যৌথ গবেষণা দল। ২০২৩ সালের ২৭ ডিসেম্বর দলটির প্রকাশিত প্রতিবেদনে ১৭টি খাত তুলে ধরে সমন্বিতভাবে দর-কষাকষির পরামর্শ দেওয়া হয়। ওই প্রতিবেদনের আলোকে পরবর্তী আলোচনা এগোয়।
২০২৪ সালের ১২ মার্চ উভয় দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে ইপিএ নিয়ে দর-কষাকষির ঘোষণা দেয় এবং মে মাসে ঢাকায় প্রথম রাউন্ডের আলোচনা শুরু করে। একই বছরের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আলোচনা থমকে যায়। অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিয়ে নতুন করে আলোচনায় বসে এবং এক বছরের মধ্যে চুক্তি সইয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করে।
এরপর ঢাকা-টোকিও-ঢাকা—এভাবে মোট সাত দফা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ২০২৪ সালের নভেম্বর ঢাকায় দ্বিতীয়, ডিসেম্বরে টোকিওতে তৃতীয় রাউন্ড আলোচনা হয়। ২০২৫ সালে ঢাকায় চতুর্থ, টোকিওতে পঞ্চম, ঢাকায় ষষ্ঠ এবং সর্বশেষ সেপ্টেম্বরে টোকিওতে সপ্তম ও চূড়ান্ত রাউন্ডের আলোচনার মাধ্যমে চুক্তির খসড়া চূড়ান্ত হয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গত ২২ ডিসেম্বর সংবাদ সম্মেলন করে আনুষ্ঠানিকভাবে জাপানের সঙ্গে ইপিএ সইয়ের কথা জানায়।
এলডিসি উত্তরণকে টেকসই করার ক্ষেত্রে জাপানের সঙ্গে ইপিএ উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে। কারণ, এতে শুধু বাজার সুবিধা নয়, সেবা খাতের দুয়ারও খুলবে। আর রাজস্ব প্রভাব কতটা পড়বে—তা জানা নেই। তবে আন্দাজ করতে পারি ইপিএ থেকে বাংলাদেশ একটু বাড়তি সুবিধা পাবে
বাণিজ্যসচিব মাহবুবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘জাপানের সঙ্গে ইপিএ সই হবে আগামী ৬ ফেব্রুয়ারি। এ জন্য বাণিজ্য উপদেষ্টার সঙ্গে আমিও টোকিও যাচ্ছি। বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সুবিধা পাওয়ার পাশাপাশি এই ইপিএর বড় দিক হচ্ছে জাপানে বাংলাদেশিদের জন্য সেবা খাত উন্মুক্ত হচ্ছে।’
ইপিএ মূলত দুই দেশের মধ্যে মুক্তবাণিজ্য পরিসর তৈরির পরিকল্পনা। এর আওতায় শুল্ক ও অশুল্ক বাধা কমানো, আমদানি কোটা সংশোধন, পণ্য ও সেবাবাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং বিনিয়োগ সহযোগিতার কাঠামো তৈরি করা হয়। চলতি ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ ঘটবে। উত্তরণের পর উন্নত দেশগুলোর বাজারে শুল্কসুবিধা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই জাপানের সঙ্গে ইপিএ দীর্ঘ মেয়াদে বাজারসুবিধা ধরে রাখার একটি কৌশল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
শুল্কমুক্ত বাজার প্রবেশাধিকার
চুক্তি সইয়ের দিন থেকেই বাংলাদেশের ৭ হাজার ৩৭৯টি পণ্য জাপানের বাজারে তাৎক্ষণিকভাবে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে। অন্যদিকে জাপানের ১ হাজার ৩৯টি পণ্য বাংলাদেশের বাজারে একই সুবিধা পাবে। ইপিএর মাধ্যমে বাংলাদেশের ৯৭টি উপখাত জাপানের জন্য উন্মুক্ত হবে। অন্যদিকে জাপানের ১২০টি উপখাত উন্মুক্ত হবে বাংলাদেশের জন্য। পণ্যের পাশাপাশি সেবা, বিনিয়োগ এবং সহযোগিতাও এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, এটি বাংলাদেশের সামনে পণ্য রপ্তানির জন্য বড় সুযোগ তৈরি করবে। জাপান বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) দেওয়া এক নোটিফিকেশনে ২০২৯ সাল পর্যন্ত এলডিসি ও এলডিসি থেকে উত্তরণ হওয়া দেশগুলোকে জিএসপি সুবিধা দেওয়ার কথা জানিয়েছে। ইপিএকে বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদি নিশ্চয়তা হিসেবে দেখছে। কারণ, জিএসপি সাময়িক হলেও ইপিএ একটি বাধ্যতামূলক চুক্তি।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, বাংলাদেশকে সব সময় ভিয়েতনামের সঙ্গে তুলনা করা হয়। কিন্তু ভিয়েতনামের চুক্তি আছে ৩০টি দেশের সঙ্গে। বাংলাদেশ মাত্র শুরু করছে। ভবিষ্যতে আরও অনেক অর্থনৈতিক চুক্তি করা যাবে। এতে এলডিসি থেকে উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সহজ হবে।
জাপান বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (জেবিসিসিআই) মহাসচিব মারিয়া হাওলাদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘চুক্তির খসড়ায় কী আছে, তা পুরোপুরি জানি না। তবে বুঝতে পারি যে এতে বাংলাদেশ লাভবান হবে। বাংলাদেশের শুল্কপ্রক্রিয়া নিয়ে জাপানের মাথাব্যথার কথা বরাবরই জেনে এসেছি। ইপিএ সই হলে তা থাকবে না বলে ধরে নিতে পারি।’
সম্ভাব্য লাভ ও ক্ষতি
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, আগে জাপানের কাছে বেশি বিনিয়োগ চাইলেও কাঠামোগত চুক্তি না থাকায় বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হতো। সেই বাধা দূর করবে ইপিএ। অবকাঠামো, উৎপাদন, অটোমোবাইল যন্ত্রাংশ ও প্রযুক্তি খাতে জাপানি বিনিয়োগ বাড়বে। জাপানের আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ভ্যালু চেইনে বাংলাদেশের শিল্প যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
এ ছাড়া ইপিএ কার্যকর হলে প্রথমেই দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বাড়বে। তৈরি পোশাক, চামড়া, হালকা প্রকৌশল, কৃষিপণ্য ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য জাপানের বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক হবে। দ্বিতীয়ত, বিনিয়োগ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে জাপানের বিনিয়োগ প্রায় ৫০ কোটি মার্কিন ডলার, যা বৈশ্বিক পরিসরে খুবই কম।
চুক্তির খসড়ায় কী আছে, তা পুরোপুরি জানি না। তবে বুঝতে পারি যে এতে বাংলাদেশ লাভবান হবে। বাংলাদেশের শুল্কপ্রক্রিয়া নিয়ে জাপানের মাথাব্যথার কথা বরাবরই জেনে এসেছি। ইপিএ সই হলে তা থাকবে না বলে ধরে নিতে পারি
এ ছাড়া কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রযুক্তি স্থানান্তর ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হবে। জাপানের উচ্চ মানদণ্ড অনুসরণ করতে গিয়ে দেশীয় শিল্পের মানোন্নয়নও হবে। ২০২৬ সালের পর এলডিসি সুবিধা কমবে। জাপানের সঙ্গে ইপিএ এই ধাক্কা সামাল দিতে সহায়ক হতে পারে।
তবে ইপিএ পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়। শুল্ক কমলে জাপানের উন্নত প্রযুক্তির পণ্য সহজে বাংলাদেশের বাজারে ঢুকবে। এতে কিছু দেশীয় শিল্প, বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা প্রতিযোগিতার চাপে পড়তে পারেন। আমদানি শুল্ক কমার কারণে সরকারের রাজস্ব আয় কমার আশঙ্কাও রয়েছে। এ ছাড়া জাপানের বাজারে প্রবেশের জন্য কঠোর মান, স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত শর্ত পূরণ করতে হবে। প্রস্তুতি না থাকলে প্রত্যাশিত রপ্তানি সুবিধা পুরোপুরি না–ও মিলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইপিএ থেকে সর্বোচ্চ সুফল পেতে হলে খাতভিত্তিক প্রস্তুতি, শিল্পের সক্ষমতা বাড়ানো এবং রাজস্ব কাঠামোয় সংস্কার জরুরি। সঠিক প্রস্তুতি থাকলে জাপানের সঙ্গে প্রথম ইপিএ বাংলাদেশের জন্য এলডিসি-পরবর্তী সময়ে বড় সহায়ক হয়ে উঠতে পারে।
জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, এলডিসি উত্তরণকে টেকসই করার ক্ষেত্রে জাপানের সঙ্গে ইপিএ উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে। কারণ, এতে শুধু বাজারসুবিধা নয়, সেবা খাতের দুয়ারও খুলবে। আর রাজস্ব প্রভাব কতটা পড়বে, তা জানা নেই। তবে আন্দাজ করতে পারি ইপিএ থেকে বাংলাদেশ একটু বাড়তি সুবিধা পাবে। জাপান বিনিয়োগ সরিয়ে আনছে চীন থেকে। এটা কাজে লাগানো যায়।
মোস্তাফিজুর রহমান আরও বলেন, জাপানের সঙ্গে ইপিএ করার মাধ্যমে বাংলাদেশের একটি দর-কষাকষি করার পুল তৈরি হচ্ছে, যা পরে অন্যান্য দেশ বা অর্থনৈতিক জোটের সঙ্গে দর-কষাকষির ক্ষেত্রে কাজে লাগবে।