শিল্প ও সেবায় কর্মসংস্থান কম, অর্থনীতিবিদদের উদ্বেগ কেন
সাধারণত উন্নয়নশীল দেশগুলোয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে শিল্প ও সেবা খাতে কর্মসংস্থান বেশি বাড়ে। তুলনামূলক কম কর্মসংস্থান হয় কৃষি খাতে। কিন্তু বাংলাদেশে গত এক দশকে উল্টো চিত্র দেখা গেছে। এ সময়ে প্রবৃদ্ধির বিপরীতে শিল্প ও সেবা খাতে কাজের সুযোগ কমেছে, বেড়েছে কৃষি খাতে। এ অবস্থাকে উদ্বেগজনক বলেছেন অর্থনীতিবিদেরা।
আজ শনিবার সকালে রাজধানীর মহাখালীতে ব্র্যাক সেন্টার ইনে বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) আয়োজিত বার্ষিক অর্থনীতিবিদ সম্মেলনের একটি অধিবেশনে এসব তথ্য উঠে আসে।
তিন দিনব্যাপী সম্মেলনের আজ ছিল দ্বিতীয় দিন। সকালের ওই অধিবেশনে দেশের শ্রমবাজারের রূপান্তর নিয়ে আলোচনা হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) কান্ট্রি ডিরেক্টর ম্যাক্স টুনন। আলোচক ছিলেন সানেমের গবেষণা পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মাহতাব উদ্দিন।
এ অধিবেশনে বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংকের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ নাজমুস সাদাত খান ‘কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কাঠামোগত পরিবর্তন’ নিয়ে করা গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করেন। গবেষণায় মোট দেশজ আয় (জিডিপি) ১ শতাংশ বাড়লে কর্মসংস্থান কত শতাংশ বাড়ে (কর্মসংস্থান স্থিতিস্থাপকতা) তা দেখানো হয়েছে। এতে দেখা যায়, ২০১০-১৭ সময়ে কৃষি খাতে কর্মসংস্থান স্থিতিস্থাপকতা শূন্য দশমিক ২৫ পয়েন্ট ঋণাত্মক ছিল। এটি ২০১৭-২৪ সময়ে বেড়ে শূন্য দশমিক ৯৮ পয়েন্ট হয়েছে। অর্থাৎ কৃষি খাতে জিডিপি বৃদ্ধির সঙ্গে বেশি চাকরি তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে শিল্প খাতে এটি শূন্য দশমিক ৩৩ পয়েন্ট থেকে কমে শূন্য দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ ঋণাত্মক হয়েছে। সেবা খাতেও কর্মসংস্থান স্থিতিস্থাপকতা প্রায় অর্ধেক কমেছে।
এ প্রসঙ্গে গবেষক নাজমুস সাদাত খান বলেন, ‘বাংলাদেশে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির ক্ষেত্রে গত প্রায় এক দশকে একটি কাঠামোগত পরিবর্তন ঘটছে। এ সময়ে কৃষি খাতে বেশি কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে, যা আদর্শ প্রবণতা নয়। আসলেই কৃষি খাতে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে, নাকি অন্য খাতে কাজ না পেয়ে মানুষ কম আয়ের (কৃষিতে) অনানুষ্ঠানিক কাজে যুক্ত হচ্ছেন, সেটি খুঁজে দেখা প্রয়োজন।
নাজমুস সাদাত আরও জানান, গত এক দশকে মোট নতুন কর্মসংস্থানের প্রায় ৪৩ শতাংশ হয়েছে কৃষি, বনায়ন ও মৎস্য খাতে। এ ধরনের কাজ সাধারণত কম আয়ের এবং অনানুষ্ঠানিক হয়। কৃষি ও মৎস্য খাতে ব্যবস্থাপক মর্যাদা ও পেশাজীবী শ্রেণিতে কর্মসংস্থানের হার ১০ শতাংশের নিচে। বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা স্নাতক শেষ করে কৃষি খাতের এ ধরনের কাজে যোগ দিতে চায় না। এটি শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে হতাশা তৈরি করছে।
এ অবস্থায় সরকারকে শুধু প্রবৃদ্ধি না বাড়িয়ে ‘কর্মসংস্থানমুখী প্রবৃদ্ধির’ দিকে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন নাজমুস সাদাত খান। তিনি বলেন, যেসব খাতে কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা বেশি, সেগুলো চিহ্নিত করতে হবে। যেসব খাত ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বেশি কর্মসংস্থান তৈরি করতে সক্ষম, তাদের বিশেষ প্রণোদনা দিতে হবে।
করোনার সময় থেকে কৃষিতে কর্মসংস্থান বাড়ছে
সানেমের গবেষণা পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মাহতাব উদ্দিন বলেন, কৃষি খাতে কর্মসংস্থানে হঠাৎ প্রবৃদ্ধি মূলত ২০১৭ সাল থেকে ২০২২-২৩ সময়ের। করোনা–পরবর্তী সময়ে অনেক মানুষ শহরের অনানুষ্ঠানিক খাতে চাকরি হারিয়ে গ্রামে ফিরে কৃষিকাজে যুক্ত হয়েছিলেন। তাই এটি হয়তো কাঠামোগত পরিবর্তন নয়, বরং করোনার ধাক্কার কারণে শ্রমের অস্থায়ী পুনর্বিন্যাস হতে পারে। তবে নীতিনির্ধারকদের এ অবস্থা পর্যালোচনার পরামর্শ দেন তিনি।
আইএলওর কান্ট্রি ডিরেক্টর ম্যাক্স টুনন বলেন, ‘কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি নিঃসন্দেহে একটি জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশেই এর মুখোমুখি হচ্ছে। এটি মোকাবিলায় দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা প্রয়োজন। কিন্তু প্রচলিত শিক্ষাপদ্ধতি এটি পারছে না। বেসরকারি খাতের সঙ্গে যথেষ্ট সংযোগ তৈরি করতে পারছি না। এ অবস্থায় আমরা এখন ধীরে ধীরে শিল্প খাতকে কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণকে সাজানোর চেষ্টা করছি।’
উৎপাদন খাতে কারা যেতে চান, কারা চান না
এ অধিবেশনে সানেমের গবেষণা সহযোগী দীপা দাস বাংলাদেশের উৎপাদন খাতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির চালিকা শক্তি নিয়ে আরেকটি গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। দীপা দাস বলেন, উৎপাদন খাতে মোট কর্মসংস্থান যেমন কমছে, তেমনি নারীর অংশগ্রহণও দ্রুত কমছে। যেমন তৈরি পোশাক খাতে আগে যেখানে প্রায় অর্ধেক কর্মী নারী ছিলেন, এখন তা প্রায় ৩৫ শতাংশে নেমে এসেছে। এর পেছনে সামাজিক ও পারিবারিক বাধা, শিশুসেবা ও সাংস্কৃতিক কারণ থাকতে পারে।
এ সময় উৎপাদন খাতে যাওয়া কিংবা না যাওয়ার পেছনে কিছু প্রবণতা তুলে ধরেন দীপা দাস। তিনি জানান, শহুরে এলাকা, দেশের পূর্বাঞ্চল, ভূমিহীন পরিবার এবং উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিরা উৎপাদন খাতে বেশি যুক্ত হতে চান। বিপরীতে নারীরা, বৃহৎ পরিবার, বেশি জমির মালিকানা থাকলে এবং কম বা কোনো শিক্ষা নেই, এমন ব্যক্তিরা কৃষি খাতে বেশি থাকেন।
৩৫ থেকে ৪৪ বছর বয়সী ব্যক্তিরা তরুণ বা বয়স্কদের তুলনায় ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। যদি কোনো পরিবারের একজন সদস্য ইতিমধ্যে উৎপাদন খাতে কাজ করেন, তাহলে অন্য সদস্যদেরও সেই খাতে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় আট গুণ বেড়ে যায়। আবার তবে নারীপ্রধান পরিবার, বিধবা বা বিচ্ছিন্ন ব্যক্তি এবং উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিরা উৎপাদন খাতে কাজ করতে চান। ভাড়া বাড়িতে বসবাসকারীরা কৃষির তুলনায় উৎপাদন খাতে বেশি যুক্ত হন।