একদিকে মাইলের পর মাইল বিস্তৃত সুনীল সমুদ্রের গর্জন, অন্যদিকে উত্তরের শান্ত সমতল ভূমি। ভূগোলের এই দুই বিপরীত মেরুকে এক সুতায় বেঁধে দিয়েছে রুপালি মাছের শুঁটকি। ভোরের আলো ফোটার আগেই চারপাশ ম ম করে ওঠে চেনা সেই কড়া সুবাসে। চারদিকে কেবল শুঁটকির স্তূপ আর শত শত মানুষের হাঁকডাক। গত কয়েক দশকে নিভৃতেই সৈয়দপুরে গড়ে উঠেছে শুঁটকির এক সুবিশাল বাজার।
চট্টগ্রাম দেশের বৃহত্তম শুঁটকির বাজার হলেও এর পরেই নিজের অবস্থান পাকা করেছে উত্তরের শহর সৈয়দপুর। প্রাচীনকাল থেকেই রোদে শুকিয়ে মাছ সংরক্ষণের যে ইতিহাস বাংলার জনপদে মিশে আছে, গত কয়েক দশকে সেই ঐতিহ্যের ওপর ভর করেই এই শহরের পরিচয়ে নতুন মাত্রা যোগ করেছে শুঁটকির বাজার। বছরে ১০০ কোটি টাকার বেশি শুঁটকি বেচাকেনা হয় এখানে। একসময় যেমন বাংলার মসলিন বা মসলা প্রাচীন বাণিজ্য পথ ধরে দূরদেশে যেত, তেমনি আজ দেশের গণ্ডি পেরিয়ে এখানকার শুঁটকির সুবাস ছড়াচ্ছে প্রতিবেশী দেশ ভারতেও।
শুঁটকি আড়ত সম্পর্কে এখানকার দীর্ঘদিনের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই বাজারের বয়স ৪২-৪৫ বছর। উত্তরের এই বাজারে শুঁটকির বাণিজ্যের গোড়াপত্তন করেছিলেন পাবনা থেকে আসা ব্যবসায়ীরা।
দ্বিতীয় প্রজন্মের শুঁটকি ব্যবসায়ী আলমগীর হোসেন জানান, তাঁর দাদা আবুল হোসেন বিশ্বাস এবং বাবা আফতাব উদ্দিন বিশ্বাস শুরু দিকের ব্যবসায়ী। তবে এই বাজারের প্রথম ভিত গড়েছিলেন আমির হোসেন দেওয়ানি নামের এক ব্যবসায়ী। প্রায় চার দশক আগে মাত্র চার-পাঁচটি আড়ত নিয়ে নীলফামারী সদরে যে ব্যবসার সূচনা হয়েছিল, তা আজ সৈয়দপুরে এসে মহিরুহে পরিণত হয়েছে।
বর্তমানে এই বাজারে নিবন্ধিত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ৩০০। এর বাইরেও প্রতিদিন সকালে রাস্তার ধারে বসে অসংখ্য ভাসমান দোকান, যেগুলোর হিসাব রাখা কঠিন। পাবনা থেকে আসা ব্যবসায়ীরাই মূলত এই বাজারের হাল ধরেছেন, এখানেই বসতবাড়ি গড়ে তুলেছেন এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখছেন।
আড়াই শ প্রজাতির শুঁটকি ও দেশি-বিদেশি সংযোগ
সৈয়দপুরের এই বাজারে গেলে শুঁটকির বৈচিত্র্য দেখে যে কারও চোখ কপালে উঠবে। ব্যবসায়ীদের তথ্যমতে, এই বাজারে প্রায় ২৫০ প্রজাতির শুঁটকি পাওয়া যায়।
● উৎস: দেশের অন্যতম বড় বন্দর চট্টগ্রাম থেকে সরাসরি শুঁটকি আসে এখানে। পাশাপাশি খুলনা, মহিপুর, কুয়াকাটা, ভোলা, বরিশাল থেকেও সামুদ্রিক শুঁটকি আসে। আর দেশি মিঠাপানির মাছের শুঁটকি আসে পাবনা, আত্রাই ও কুটি থেকে।
● জনপ্রিয় জাত: সৈয়দপুর ও এর আশপাশের মানুষের কাছে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় চেলা, ভেটকি, লইট্টা, কাঁচকি এবং চিংড়ি শুঁটকি।
● ঐতিহ্যবাহী সিদল: উত্তরবঙ্গের ঐতিহ্যবাহী খাবার ‘সিদল’ তৈরির একটি বড় কেন্দ্র এই বাজার। দেশি ছোট মাছ—যেমন পুঁটি, দারকিনা, চান্দা, খলসে—একসঙ্গে মিশিয়ে বিশেষ প্রক্রিয়ায় গাঁজন বা ফার্মেন্ট করে এই সিদল তৈরি করা হয়, যার চাহিদা এ অঞ্চলে ব্যাপক।
শুঁটকির দামের ক্ষেত্রেও রয়েছে ব্যাপক ভিন্নতা। বাজারে সর্বনিম্ন ১৫০ থেকে শুরু করে মান ও প্রজাতিভেদে ১৪০০, ১৫০০ এমনকি ২০০০ টাকা কেজি শুঁটকিও বিক্রি হয়। বিশেষ করে সামুদ্রিক শোল, বাইন মাছের শুঁটকির দাম তুলনামূলক অনেক বেশি।
একটা সময় ছিল যখন অনেকেই শুঁটকির কড়া গন্ধের কারণে এটি এড়িয়ে চলতেন। কিন্তু এখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানকার আড়ত মুন্সি মার্কেটের বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ীদের মতে, শুঁটকির চাহিদা গত কয়েক বছরে অন্তত ২৫ শতাংশ বেড়েছে। এর পেছনে একটি বড় কারণ হলো স্বাস্থ্যসচেতনতা।
শুঁটকিতে কোনো রাসায়নিকের ব্যবহার করা হয় না। সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে শুকানো এই মাছে প্রোটিনের মাত্রা থাকে অনেক বেশি। ব্যবসায়ীরা জানান, এখন অনেক চিকিৎসকই রোগীদের প্রাকৃতিক প্রোটিনের উৎস হিসেবে শুঁটকি খাওয়ার পরামর্শ দেন। বিশেষ করে দামি শুঁটকিগুলো (যেমন শোল, বাইন) চিকিৎসকেরা বা স্বাস্থ্যসচেতন মানুষেরাই বেশি অর্ডার দিয়ে কিনে নেন। গ্রামের সাধারণ কৃষক বা দিনমজুর থেকে শুরু করে ঢাকার অভিজাত এলাকার বাসিন্দারাও এখন সৈয়দপুরের শুঁটকির বড় ভোক্তা।
সৈয়দপুরের শুঁটকি শুধু দেশের বাজারেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি নিয়মিত রপ্তানি হচ্ছে ভারতেও। ১৯৯৬-৯৭ সাল থেকে এলসির (লেটার অব ক্রেডিট) মাধ্যমে এই রপ্তানিপ্রক্রিয়া শুরু হয়। বিশেষ করে অগ্রহায়ণ থেকে ফাল্গুন মাস পর্যন্ত পুঁটি মাছের শুঁটকির ব্যাপক চাহিদা থাকে ভারতে। সিকিম থেকে শুরু করে ভারতের অন্ধ্র প্রদেশ পর্যন্ত যায় এখানকার শুঁটকি। যদিও সরাসরি সৈয়দপুর স্থলবন্দর দিয়ে এই রপ্তানি হয় না, তবে বড় ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে বৈধ পথে এলসি হয়ে এই শুঁটকি ভারতের বাজারে প্রবেশ করছে। এ ছাড়া মিয়ানমার ও দুবাই থেকেও কিছু শুঁটকি এই বাজারে আসে, আবার এখানকার কিছু শুঁটকি প্রবাসীদের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশেও যায়।
প্রতিদিন শুঁটকি বাজার খোলা থাকলেও মূল বেচাকেনা জমে ওঠে সপ্তাহে দুই দিন—শনিবার ও মঙ্গলবার। এই দুই দিন ভোরে পাইকারেরা এসে জড়ো হন। রাস্তার দুই ধারে চাটাই বিছিয়ে বস্তা ধরে চলে মাছের নিলাম ও বেচাকেনা। লাইসেন্সধারী আড়তদারেরাই মূলত নিলামে অংশ নিয়ে চাহিদামতো মাছ কিনে মজুত করেন।
ভোক্তার প্লেটে শুঁটকি পৌঁছাতে ৭ থেকে ৮টি ধাপ পার হয়। জেলে থেকে শুরু করে উৎপাদনকারী, ফড়িয়া, আড়তদার, পাইকার হয়ে তবেই তা খুচরা বাজারে আসে। প্রতিদিন ১৮ থেকে ২০ টন শুঁটকি এই বাজার থেকে দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে যায়।
শুঁটকির ব্যবসায় লাভের পরিমাণ যেমন বেশি, তেমনি ঝুঁকিও প্রচুর। এখানকার ব্যবসায়ীদের মতে, গড়ে ১০% লাভ থাকলেও একটি মাত্র দুর্যোগ পুরো মূলধন ধসিয়ে দিতে পারে। শুঁটকি ব্যবসার সবচেয়ে বড় শত্রু হলো স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়া। টানা ৭ থেকে ১৫ দিন আবহাওয়া খারাপ থাকলে বা ড্যাম্প থাকলে শুঁটকি নষ্ট হতে শুরু করে। মাছে গন্ধ ও পচন ধরলে ৫০০ টাকা কেজি দরের শুঁটকি বাধ্য হয়ে ৬০ টাকায় বিক্রি করতে হয়।
এই বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি এড়াতে ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের দাবি একটি বিশেষায়িত কোল্ড স্টোরেজ বা হিমাগার নির্মাণের। আলু সংরক্ষণের জন্য যেমন হিমাগার রয়েছে, তেমনি শুঁটকি সংরক্ষণের জন্য সৈয়দপুর, রংপুর বা দিনাজপুর অঞ্চলে একটি হিমাগার স্থাপন করা হলে দেশের এই সম্ভাবনাময় খাতটি আরও কয়েক গুণ বড় হতে পারত বলে মনে করেন ব্যবসায়ীরা।
কাঁচা মাছের সহজলভ্যতা কমে যাওয়া এবং শুঁটকির পুষ্টিগুণ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির কারণে শুঁটকির বাজার এখন আর কেবল প্রান্তিক পর্যায়ে আটকে নেই। তরুণ উদ্যোক্তারা এখন অনলাইনে ‘শুঁটকি ভর্তা’ বা ‘ডিহাইড্রেটেড ফিশ স্ন্যাকস’ বানিয়ে বিক্রি করছেন। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সৈয়দপুরের এই শুঁটকি বাজারও যদি আধুনিক সংরক্ষণের ছোঁয়া পায়, তবে এটি দেশের অর্থনীতিতে আরও বড় ধরনের বিপ্লব ঘটাতে সক্ষম।