জুনে আইএমএফের কাছে ঋণের পরবর্তী কিস্তি চায় বাংলাদেশ

গ্রাফিকস: প্রথম আলো

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে চলমান ঋণ কর্মসূচি থেকে ষষ্ঠ কিস্তির অর্থ পাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। শর্ত পূরণ করতে না পারায় বিষয়টি এত দিন ঝুলে ছিল। গত বছরের ডিসেম্বরে ষষ্ঠ কিস্তির অর্থ পাওয়ার কথা থাকলেও বাংলাদেশ এখনো তা পায়নি। অন্তর্বর্তী সরকার এবং আইএমএফ—উভয় পক্ষেরই চাওয়া ছিল নির্বাচিত সরকারের সময় এ জট খুলুক। সে জটই খুলতে যাচ্ছে এখন।

ষষ্ঠ কিস্তির অর্থ ছাড়ের আগে বাংলাদেশকে শর্ত পূরণ থেকে কিছু ছাড় দিতে পারে আইএমএফ। বিশেষ করে বাংলাদেশকে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় প্রতিবছর দশমিক ৫ শতাংশ হারে বাড়তি কর আদায়ের শর্তে ছাড় আসতে পারে। এর বদলে যুক্ত হতে পারে কিছু নতুন শর্ত, যা হবে তুলনামূলক নমনীয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

কিস্তি ও শর্ত পূরণ নিয়ে আলোচনা করতে ঢাকায় এসেছেন আইএমএফের এশিয়া ও প্যাসিফিক বিভাগের পরিচালক কৃষ্ণা শ্রীনিবাসন। নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে আজ মঙ্গলবার সচিবালয়ে তিনি সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন। এ সময় অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর অর্থবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এবং অর্থসচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে সচিবালয়ে আলাদা বৈঠক করেন কৃষ্ণা শ্রীনিবাসন। এ সময় আইএমএফের গবেষণা বিভাগের উন্নয়ন সামষ্টিক অর্থনীতি শাখার প্রধান ক্রিস পাপাজর্জিও এবং সংস্থাটির আবাসিক প্রতিনিধি ম্যাক্সিম ক্রিশকোও উপস্থিত ছিলেন।

আইএমএফের সঙ্গে বাংলাদেশের ৪৭০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণ কর্মসূচি শুরু হয় আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি। মাঝে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২০২৫ সালের জুনে ৮০ কোটি ডলার বেড়ে ঋণ কর্মসূচির আকার ৫৫০ কোটি ডলারে উন্নীত হয়। আইএমএফ থেকে এখন পর্যন্ত পাঁচ কিস্তিতে বাংলাদেশ পেয়েছে ৩৬৪ কোটি ডলার। বাকি আছে ১৮৬ কোটি ডলার। এর বাইরে বাংলাদেশ আরও অর্থ চাইতে পারে সংস্থাটির কাছে। আগামী মাসের মাঝামাঝি ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিতব্য বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বসন্তকালীন বৈঠকে এই বাড়তি সহায়তা চাওয়া হতে পারে।

আইএমএফের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী আজ সাংবাদিকদের বলেন, ‘ঋণ কর্মসূচির বিপরীতে যেসব শর্ত রয়েছে, সেগুলো বাংলাদেশের অর্থনীতির পরিপ্রেক্ষিতে ক্রমান্বয়ে বাস্তবায়ন করা হবে। সব একসঙ্গে করা যাবে না, আমরা আমাদের মতো করে করব।’

আগামী জুনের মধ্যে কিস্তি ছাড় হচ্ছে কি না এবং আইএমএফের কাছে বাড়তি সহায়তা চাওয়া হচ্ছে কি না, জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী বলেন, আগামী মাসে ওয়াশিংটনে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বসন্তকালীন বৈঠক হবে। সেখানে এসব নিয়ে আলোচনা হবে।

ওয়াশিংটনে আগামী ১৩ থেকে ১৮ এপ্রিল অনুষ্ঠেয় এ বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন একটি দল অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। অর্থমন্ত্রী ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান, অর্থসচিব খায়েরুজ্জামান মজুমদার প্রমুখও বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বসন্তকালীন বৈঠক শেষে ঢাকায় আইএমএফের আরেকটি মিশন আসবে। সেই মিশনের প্রতিবেদন দেবে আইএমএফের পরিচালনা পর্ষদে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হয়েছে জুনের পর্ষদে যেন কিস্তি ছাড়ের প্রস্তাবটি উপস্থাপন করা হয়। তবে আইএমএফ কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, জুনে না হলেও জুলাইয়ে বিষয়টি পর্ষদে তোলা হবে।

আজ মঙ্গলবার আইএমএফের সফররত প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠক করেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
অর্থ মন্ত্রণালয়

বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমরা দেশের অর্থনীতিকে খারাপ অবস্থায় পেয়েছি। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে অনেক সংস্কার দরকার। অর্থনীতি, ব্যাংক খাত, শেয়ারবাজার—সবই খারাপ অবস্থায় আছে। কর-জিডিপির হারও অনেক কম। নির্বাচনী ইশতেহারে যেসব কথা বলা হয়েছে, সেসব বাস্তবায়নে একাধিক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। আর্থিক সংস্কারের মাধ্যমে অর্থনীতিকে একটা জায়গায় নিয়ে যেতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, জ্বালানি আমদানির জন্য যে বাড়তি অর্থের দরকার পড়বে, সে বিষয়েও আইএমএফের সঙ্গে কথা হয়েছে।

বৈঠকের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন কৃষ্ণা শ্রীনিবাসনও। তিনি বলেন, অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সব দেশই অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষত যুদ্ধ পরিস্থিতি অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করছে, যার বাইরে নয় বাংলাদেশও। বাংলাদেশের সঙ্গে আইএমএফের চলমান অর্থায়ন ও নীতিগত আলোচনা অব্যাহত রয়েছে জানিয়ে শ্রীনিবাসন বলেন, আসলে অর্থায়ন–সংক্রান্ত আলোচনা সব সময়ই নীতিগত আলোচনার সঙ্গে সম্পর্কিত।

বাংলাদেশ বাড়তি ঋণ চেয়েছে কি না জানতে চাইলে শ্রীনিবাসন বলেন, অর্থায়ন ও নীতিগত আলোচনা একসঙ্গেই এগিয়ে চলছে। কৌশলগত আলোচনা ও সহযোগিতা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।

সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরে জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, পরের কিস্তি পেতে গেলে আইএমএফ থেকে শর্ত পূরণের ছাড় (ওয়েভার) লাগবে। মনে হয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড পৃথক্‌করণের অগ্রগতিসহ প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের অগ্রগতি জানতে চাইবে আইএমএফ। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে নমনীয় থাকলেও খেলাপি ঋণ পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া, ব্যাংক কোম্পানি আইন, বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার ইত্যাদি সংশোধন না হওয়া নিয়ে সংস্থাটি প্রশ্ন তুলতে পারে। মনে হচ্ছে ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠেয় বসন্তকালীন বৈঠকে এসব নিয়ে বিশদ আলোচনা হবে এবং পরে মিশন এসে যে প্রতিবেদন তৈরি করবে, তার ভিত্তিতেই পরের কিস্তি ছাড়ের একটা পথ বের হবে।