উৎসে কর তদারকির উদ্যোগ বন্ধের দাবি শীর্ষ ৮ বাণিজ্য সংগঠনের, এনবিআরের নির্দেশে কী আছে
উৎসে কর তদারকিতে কর কর্মকর্তাদের যেকোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বিনা বাধায় প্রবেশ, কাগজপত্র তলব ও জব্দ করাসহ পাঁচ দফা নির্দেশ দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। ১৯ জুলাই দেশের সব কর অঞ্চলে এসব নির্দেশনা পাঠানো হয়। এর পর থেকে ব্যবসায়ী সমাজে তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়। অনেকে এনবিআরের এই উদ্যোগের সমালোচনা করেন।
এর অংশ হিসেবে গতকাল বুধবার জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যানের কাছে এই আদেশ স্থগিত বা প্রত্যাহার চেয়ে দেশের শীর্ষ আটটি বাণিজ্য সংগঠন ও চেম্বারের সভাপতি চিঠি দিয়েছেন। চিঠিতে সই করেন ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স বাংলাদেশের (আইসিসিবি) সভাপতি মাহবুবুর রহমান, মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সভাপতি কামরান টি রহমান, চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (সিসিসিআই) সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক, বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার–উল আলম চৌধুরী পারভেজ, তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান, নিট পোশাক মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম, ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ ও বাংলাদেশ সিরামিক ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএমইএ) সভাপতি মইনুল ইসলাম।
চিঠিতে বলা হয়, এনবিআরের আয়কর আইন, ২০২৩–এর ১৪৭ ধারার বিধান অনুযায়ী কর কর্মকর্তাদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, আর্থিক ও হিসাবসংক্রান্ত কাগজপত্র সরেজমিন পরিদর্শনবিষয়ক ১৯ জুলাই সংবাদ বিজ্ঞপ্তি আমাদের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছে। ওই সংবাদ বিজ্ঞপ্তির শেষ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিষয়টি স্পষ্ট যে, ২০২৩ সালের আয়কর আইনের ১৪৭ ধারার প্রয়োগ এখনো শুরু হয়নি এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ী নেতারা ক্ষুদ্র থেকে বড় কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান বা ব্যবসায়ীরা আইনের এ ধারাটি সম্পর্কে অবহিত নন।
চিঠিতে আরও বলা হয়, এনবিআরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি জারির পর উৎপাদন ও সেবা খাতের ব্যবসায়ীদের মধ্যে একটি আকস্মিক ভীতি ও আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। ব্যবসায়ী সমাজ কর ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা সব সময় সমর্থন করে এবং মনে করে, আয়কর প্রদানে ভীতি দূর করে ব্যবসা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিক ও আয়কর কর্মকর্তাদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতামূলক সম্পর্ক বিদ্যমান থাকা আবশ্যক। বর্তমান সরকারের লক্ষ্য অনুযায়ী ২০৩৪ সালে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি ও এক কোটি লোকের কর্মসংস্থানের জন্য আমাদের বর্তমান স্থবির অর্থনীতিতে গতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে আমাদের ব্যবসার আকার ও ধরন ব্যাপক হারে বাড়াতে হবে। সে ক্ষেত্রে সরকার ও ব্যবসায়ী সমাজ পরস্পরকে আস্থায় নিয়ে একসঙ্গে এগিয়ে যেতে হবে।
চিঠিতে আরও বলা হয়, কোম্পানি আইন ১৯৯৪ অনুযায়ী করপোরেট রেকর্ডের গোপনীয়তা, বাংলাদেশ বিনিয়োগ কর্তৃপক্ষ আইন ২০১৬ অনুযায়ী ব্যবসা পরিচালনার স্বাধীনতা ও বিনিয়োগ সুরক্ষার প্রশ্ন এবং সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩১ ও ৪২ অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের আইনগত অধিকার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আয়কর আইন, ২০২৩–এর ১৪৭ ধারার প্রয়োগের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা আবশ্যক। তাই ব্যবসায়ী সমাজের মধ্যে সৃষ্ট আতঙ্ক ও ভীতি দূর করার জন্য অবিলম্বে বিজ্ঞপ্তি স্থগিত বা প্রত্যাহারের অনুরোধ করছি।
ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বিনা বাধায় প্রবেশ করতে পারবেন কর কর্মকর্তারা
গত রোববার উৎসে কর আদায় ও তদারকি জোরদার করতে কর কর্মকর্তাদের পাঁচটি নির্দেশনা দিয়েছে এনবিআর। এ নিয়ে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দেয় এনবিআর।
আয়কর আইন, ২০২৩–এর ধারা ১৪৭ অনুসারে কর কর্মকর্তারা যেসব কাজ করতে পারবেন, সেই নির্দেশনাগুলো হলো—
১. যেকোনো বাণিজ্যিক বা অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের প্রাঙ্গণ, ব্যবসাকেন্দ্র বা দপ্তরে বিনা বাধায় প্রবেশ ও সরেজমিনে পরিদর্শন।
২. প্রতিষ্ঠানের হিসাবের বই, ভাউচার, ব্যাংক হিসাব বিবরণী, রসিদ ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমসম্পর্কিত যেকোনো নথিপত্র পরীক্ষা ও তলব করা।
৩. প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার সিস্টেম, ক্লাউড সার্ভার, ডিজিটাল রেকর্ড বা ইলেকট্রনিক ডিভাইসে সংরক্ষিত তথ্য পরীক্ষা এবং প্রয়োজনে পাসওয়ার্ড বা এনক্রিপশন ভাঙার মাধ্যমে প্রবেশ করা।
৪. উৎসে কর্তিত করের সত্যতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় হিসাবের খাতা, নথিপত্র, ইলেকট্রনিক রেকর্ড বা ডিভাইস সাময়িকভাবে জব্দ করা ও নিজস্ব হেফাজতে রাখা।
৫. যেকোনো নথিপত্র, ইমেজ বা অ্যাকাউন্টের কপি সংগ্রহ করা এবং তাতে শনাক্তকরণ চিহ্ন বা সিলমোহর ব্যবহার করা।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, রাজস্ব আহরণের জন্য এসব কার্যক্রমে কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি বা অসহযোগিতার জন্য ১৪৭ (২) ধারায় জরিমানার বিধান রয়েছে।