এক খাতেই ৪০ বিলিয়ন ডলারের ১১ প্রকল্প

দেশের ২০টি বড় প্রকল্প বিশ্লেষণ করেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। এই প্রকল্পের তালিকার অন্যতম হলো পদ্মা সেতু, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে টানেল নির্মাণ, মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মেট্রোরেল, পদ্মা সেতুর রেল সংযোগ প্রকল্প ইত্যাদি। দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, এসব প্রকল্পে প্রায় ৫ লাখ ৫৬ হাজার ৯৫৫ কোটি টাকা বা ৭০ বিলিয়ন ডলার খরচ হচ্ছে। এর মধ্যে ৪০ বিলিয়ন ডলার খরচ করবে পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে।

এই খাতে একটি মন্ত্রণালয়ের ১১টি প্রকল্পে পাঁচ থেকে ছয় বছরে এত বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি মনে করেন, মেগা প্রকল্প নির্বাচনের ক্ষেত্রে সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা হয়নি। যদি সুষমভাবে প্রকল্প বণ্টন করা হতো, তাহলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য খাতের মতো প্রয়োজনীয় খাতে আরও বেশি বড় প্রকল্প নেওয়া যেত।

তবে ওই ২০ প্রকল্পের অর্থায়নের উৎসকে সঠিক বলেই মনে করেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। এগুলোতে সাশ্রয়ী অর্থায়ন হয়েছে বলে মনে করেন তিনি। ওই ২০ প্রকল্পে যত অর্থ খরচ হচ্ছে, এর মধ্যে প্রায় ৬২ শতাংশ বিদেশি ঋণ। রাশিয়া, চীন ও জাইকার অর্থায়ন বেশি। দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য আরও বলেন, ২০০৯ সাল থেকে বড় প্রকল্প নেওয়ার ক্ষেত্রে একধরনের জাতীয় ঐকমত্য আছে। মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করলে দৃশ্যমান উন্নয়ন দেখা যায় বলে রাজনীতিবিদেরা এতে আগ্রহ দেখান। ২০১৩ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বড় প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।

ওই ২০টি প্রকল্প ২০২৮ সালের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও চলতি দশকে প্রকল্পগুলো শেষ করা সম্ভব হবে না বলে মনে করেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। প্রকল্প বাস্তবায়নে একধরনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাব আছে বলে মনে করেন তিনি।

ঋণ পরিশোধ দ্বিগুণ হবে

বড় ২০টি প্রকল্পের দায়দেনা পরিশোধের পরিমাণ ধীরে ধীরে বাড়তে থাকবে। ২০১৮ সালের পর থেকেই পরিস্থিতি গুরুতর হচ্ছে। এ বিষয়ে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য আরও বলেন, বর্তমানে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অনুপাতে ১ দশমিক ১ শতাংশের মতো বিদেশি দায়দেনা পরিশোধ করা হয়। ২০২৬ সাল নাগাদ তা দ্বিগুণ হতে পার। এ হার ২ শতাংশের ঘরে পৌঁছানোর আশঙ্কা আছে।

দেনার সবচেয়ে বড় দাবিদার হবে রাশিয়া। এ ছাড়া চীন ও জাপানও বড় দাবিদার হবে। তবে চীনের ঋণ পরিশোধের সময়সীমা কম, সেটাও মনে রাখতে হবে। তখন বাংলাদেশ সমস্যায় পড়বে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটি আসলে নির্ভর করবে ওই সময় দেশের রিজার্ভ পরিস্থিতি কেমন থাকে; অর্থনীতি কতটা সুসংহত থাকে। অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ বৃদ্ধির পরামর্শ দেন তিনি।

সাশ্রয়ী হতে তিন পরামর্শ

বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে অর্থ সাশ্রয়ে তিনটি পরামর্শ দিয়েছেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। এগুলো হলো: যেসব প্রকল্পের কাজ শুরু হয়নি, সেসব প্রকল্প জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ না হলে সাময়িকভাবে স্থগিত করা; প্রকল্পের কেনাকাটা যেন অতিমূল্যায়িত না হয় ও বিদেশি দায়দেনা পরিশোধের সময়সীমা পুনর্নির্ধারণ করা।

আরেক প্রশ্নের জবাবে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘লোডশেডিং থেকে কবে নাগাদ বের হব, তার একটি ঘোষণা থাকা দরকার। কারণ, অনির্ধারিত সময়ের জন্য লোডশেডিং হলে ব্যক্তি বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। করোনার এই সময়ে কর্মসংস্থান জরুরি।’

আইএমএফের অর্থ নেওয়ার পক্ষে মত 

বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে আলোচনা শুরু ভালো দিক হিসেবে অভিহিত করেছেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, দুই বিলিয়ন ডলার হোক আর সাড়ে চার বিলিয়ন ডলার, আইএমএফের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার প্রয়োজন আছে। এটা মধ্য মেয়াদে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হবে। বিদেশি বিনিয়োগকারী ও উন্নয়ন সহযোগীরা একধরনের আস্থা পাবেন। তাঁরা মনে করেন, বাংলাদেশকে একধরনের পরিবীক্ষণ ও নজরদারিতে রাখছে আইএমএফ। তিনি এ প্রসঙ্গে সংকটে পড়া শ্রীলঙ্কার আইএমএফের অর্থ না নেওয়ার সিদ্ধান্তের উদাহরণ তুলে ধরেন।

গত বুধবার অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল সাংবাদিকদের বলেন, প্রয়োজন হলে আইএমএফের কাছ থেকে ঋণ নেওয়া হবে। এ মুহূর্তে বিদেশি ঋণের প্রয়োজন নেই।

অর্থনীতি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন