ফারহান তৌসিফ একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতক ডিগ্রি নিয়েছেন। এক বছরের বেশি সময় ধরে মনমতো চাকরি পাচ্ছেন না। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরির জন্য আবেদন করে যাচ্ছেন।
ঢাকায় বন্ধুদের সঙ্গে মেসে থাকেন ফারহান তৌসিফ। তিনি প্রথম আলোকে জানান, ‘প্রতিমাসেই একাধিক চাকরির বিজ্ঞাপন দেখে আবেদন করি। কোনোটিতে ডাক পড়ে, কোনোটিতে পড়ে না। কিন্তু চাকরি আর হয় না। টিউশনি করে নিজের খরচ চালাচ্ছি।’ বেশির ভাগ চাকরির জন্য অভিজ্ঞতা চাওয়া হয় বলে তিনি জানান। এতে তিনি বিপাকে পড়ে যান।
ফারহান তৌসিফের মতো এমন অনেক তরুণ-তরুণী মাসের পর মাস চাকরি খুঁজেন। তাঁদের অপেক্ষা যেন আর কাটে না। অনেকে হতাশা হয়ে ছোটখাটো চাকরিতেও যোগদান করে ফেলেন।
২০২৪ সালে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সূত্রপাত বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে। শিক্ষার্থীরা সরকারি চাকরিতে কোটা তুলে দেওয়ার দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন। পরে তা গণ–অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশত্যাগ করতে হয়। গত দুই বছরে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বড় পরিবর্তন হয়নি।
এমন অবস্থায় আজ বুধবার আন্তর্জাতিক যুব দিবস পালন করা হচ্ছে। জাতিসংঘের আওতায় বিশ্বব্যাপী এই দিবস পালন করা হয়। দেশের হাজার হাজার উচ্চশিক্ষিত তরুণ-তরুণী স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে চাকরির অপেক্ষা করেন। আপনি কি জানেন, এমন শিক্ষিত তরুণ-তরুণীদের প্রতি তিনজনে একজনকে এক বছরের বেশি সময় ধরে বেকার থাকেন। এই দীর্ঘ সময় তাঁদের চাকরি খুঁজতে হয়।
এই তথ্য বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপের। জরিপটি ২০২৪ সালে করা হয়। পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন গত মাসে প্রকাশ করা হয়।
বিবিএসের তথ্য–উপাত্ত অনুসারে, দেশে ২৬ লাখ ২৪ হাজার বেকার আছেন। তাঁদের মধ্যে ২০ লাখ ৩২ হাজার তরুণ-তরুণী। যাঁদের বয়স ১৫ থেকে ২৯ বছর। এই বেকারদের মধ্যে প্রায় ২৯ শতাংশই উচ্চশিক্ষিত বা স্নাতক ডিগ্রিধারী।
চাকরির জন্য অপেক্ষা কত দিন
বিবিএসের তথ্য–উপাত্ত বলছে, ২৭ শতাংশের বেশি বেকার যুবকদের এক থেকে তিন মাস বেকার থাকতে হয়। আর ২ বছরের বেশি সময় কাজ খুঁজতে হয় ৮ শতাংশ বেকারকে। তবে শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকার থাকার সময়সীমা বেশি। কারণ, তুলনামূলক কম শিক্ষিত প্রার্থীরা মনমতো কাজ পেলেও যেনতেন কাজে ঢুকে যান। কিন্তু শিক্ষিত বেকারেরা মনমতো কাজ পাওয়াকে বেশি প্রাধান্য দেন।
বিবিএসের তথ্য–উপাত্ত বলছে, চাকরিপ্রত্যাশী ১৭ শতাংশের বেশি উচ্চ শিক্ষিত (স্নাতক ডিগ্রিধারী) তরুণ-তরুণী দুই বছরের বেশি সময় ধরে বেকার থাকেন। ১ বছর থেকে ২ বছর বেকার থাকেন ১৫ শতাংশের বেশি উচ্চশিক্ষিত তরুণ। এর মানে, উচ্চশিক্ষিত তরুণদের প্রতি তিনজনে একজনকে এক বছরের বেশি সময় বেকার থাকেন।
শিক্ষিতদের চাকরি খোঁজার ধরন বদল
শিক্ষিত তরুণ-তরুণীদের মধ্যে চাকরি খোঁজার ধরন বদলে গেছে। চাকরি খোঁজার অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলো এখন তরুণদের মধ্যে বেশি জনপ্রিয়। এমন একটি প্ল্যাটফর্ম বিডিজবস ডটকম। এটি দেশের সবচেয়ে পুরোনো ও বড় চাকরি খোঁজার প্ল্যাটফর্ম।
বিডিজবস ডটকম সূত্রে জানা গেছে, বিডিজবস ডটকমে ৫০ লাখ চাকরিপ্রত্যাশীর প্রোফাইল আছে। প্রতিদিন গড়ে দুই লাখের মতো চাকরিপ্রত্যাশী এই প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করেন। নিজেদের পছন্দমতো চাকরি খুঁজেন। দুই বছরে আগে প্রতিদিন গড়ে দেড় লাখ চাকরিপ্রত্যাশী বিডিজবস ডটকমে চাকরি খুঁজতেন। এই সময়ের ব্যবধানে চাকরিপ্রত্যাশী বেড়েছে ৩৩ শতাংশের বেশি।
জানা গেছে, বিডিজবস ডটকমে সব সময়ে ছয় থেকে সাত হাজার নতুন চাকরির খোঁজ থাকে। প্রতি মাসে প্রায় ১০ হাজারের মতো নতুন চাকরির বিজ্ঞাপন দেন নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো।
বিডিজবস ডটকমের প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফাহিম মাশরুর প্রথম আলোকে বলেন, নতুন স্নাতকধারীদের জন্য চাকরির বাজারে সুযোগ কম। নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো অভিজ্ঞ জনবল চায়। নতুন স্নাতকধারীদের জন্য এই পরিস্থিতি বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি জানান, স্নাতকধারীদের ৪০ শতাংশের বেশি পাস করার পর ১ বছরের বেশি সময় ধরে চাকরি পান না, বেকার থাকেন।
যুব বেকার কত
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে, দেশের শ্রমবাজারে ২ কোটি ৪৮ লাখ তরুণ-তরুণী আছেন, যাঁদের বয়স ১৫ থেকে ২৯ বছর। তাঁদের কাজ পেয়েছেন ২ কোটি ২৮ লাখ তরুণ। বাকিরা বেকার। এই বেকার সংখ্যা ২০ লাখ ৩২ হাজার, যা মোট বেকারের ৭৬ শতাংশের বেশি।
দেশে মোট বেকার আছে ২৬ লাখ ২৪ হাজার। তাঁদের মধ্যে ২৯ শতাংশই উচ্চশিক্ষিত তরুণ-তরুণী। দেশে এমন প্রায় ৮ লাখ ৮৫ হাজার বেকার আছেন।
বাংলাদেশে বছরে গড়ে ২০–২২ লাখ তরুণ–তরুণী শ্রমবাজার প্রবেশ করে। কিন্তু তাদের জন্য প্রত্যাশা অনুসারে চাকরি বা কাজের সুযোগ সৃস্টি করা যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্টদের কথা বলে জানা গেছে, যে ধরনের চাকরি বা শোভন কাজ সৃস্টি হচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রেই সেই ধরনের দক্ষ জনবল সৃস্টি হচ্ছে না। আবার নতুন কর্মসংস্থানের জন্য পর্যাপ্ত বিনিয়োগও হচ্ছে না।
বেকারের সংজ্ঞা কী
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সংজ্ঞা অনুযায়ী, সপ্তাহে এক ঘণ্টা কাজ করে মজুরি পেলে তাঁকে বেকার হিসেবে ধরা হবে না। এক মাস ধরে কাজপ্রত্যাশী এবং সর্বশেষ এক সপ্তাহে কেউ যদি এক ঘণ্টা মজুরির বিনিময়ে কাজ করার সুযোগ না পান, তাঁদের বেকার হিসেবে গণ্য করা হবে। এটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সংজ্ঞা।
কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় সপ্তাহে এক ঘণ্টা কাজ করে জীবনধারণ অসম্ভব। এদিকে মনমতো কাজ না পাওয়া এমন ব্যক্তি আছেন প্রায় এক কোটি। তাঁদের ছদ্মবেকার হিসেবে ধরা হয়।