মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে সবজি রপ্তানি প্রায় বন্ধ
বাংলাদেশ থেকে প্রতিদিন মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কাঁচা মরিচ থেকে শুরু করে লাউ, কুমড়া, বেগুন, ঢ্যাঁড়স, পেঁপে, চিচিঙ্গা, কাঁকরোল, বরবটি, শিম, টমেটোসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি রপ্তানি হয়। গত শনিবার থেকে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সংঘাত শুরু হওয়ায় ওই অঞ্চলের আকাশপথ বন্ধ রয়েছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি ইউরোপের কয়েকটি দেশে বিমান যাচ্ছে না। এতে সবজি রপ্তানি প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।
একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, শনিবার থেকে সবজি রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশ বন্ধ রয়েছে। যতক্ষণ আকাশপথ সচল না হচ্ছে ততক্ষণ সবজি রপ্তানি স্বাভাবিক হওয়ার সুযোগ নেই। সংকট যদি দীর্ঘ সময় হয় তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের সবজির বাজারে বাংলাদেশের হিস্যা প্রতিযোগী দেশের ব্যবসায়ীদের দখলে চলে যাবে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শীত মৌসুমে বাংলাদেশ থেকে দিনে ৩৫-৪০ টন সবজি রপ্তানি হয়। এর মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশের গন্তব্য সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), কাতার, কুয়েত, বাহরাইন ও ওমান। এর বাইরে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ইতালি, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয় বাংলাদেশে সবজি। বর্তমানে ১৮০টি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান নিয়মিত সবজি রপ্তানি করে। সবজির পাশাপাশি মৌসুমি ফলমূলও রপ্তানি করেন এই ব্যবসায়ীরা।
জানতে চাইলে সবজি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান স্মরণিকা ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী মাসুদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা সপ্তাহে ১০-১২ টন সবজি ও ফল রপ্তানি করি। তবে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের কারণে এখন পণ্য যাচ্ছে না। পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে আমরা বিপদে পড়ব। বাজারে বেশি সময় গ্যাপ থাকবে না। কেউ না কেউ সুযোগ নিয়ে নেবে।’
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বাহিনী শনিবার সকালে ইরানে হামলা চালায়। পাল্টা জবাবে ইসরায়েলের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে ইরান। ফলে ইউএই, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, ওমান, সৌদি আরব ও ইরাকে সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে। এতে এ অঞ্চলের সব ফ্লাইট বন্ধ। সব ধরনের জাহাজের জন্য হরমুজ প্রণালিও বন্ধ করে দিয়েছে ইরান।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যানুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) ৫ কোটি ৭৭ লাখ ডলারের সবজি রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২৬ শতাংশ বেশি। গত অর্থবছরের প্রথম আট মাসে রপ্তানি হয়েছিল ৪ কোটি ৫৮ লাখ ডলারের সবজি।
বিদায়ী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে আট কোটি ডলারের সবজি রপ্তানি হয়। এর মধ্যে সৌদি আরবে ১ কোটি ১৬ লাখ ডলার, ইউএইতে ৯৯ লাখ ডলার, কাতারে ৪১ লাখ ডলার, কুয়েতে ৩১ লাখ ডলারের সবজি রপ্তানি হয়। এর বাইরে যুক্তরাজ্যে ১ কোটি ৫৫ লাখ ডলার, ইতালিতে ৩৬ লাখ ও কানাডায় ২৩ লাখ ডলারের সবজি রপ্তানি হয়েছে।
ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সূত্র জানায়, বর্তমান পরিস্থিতিতে ঢাকা থেকে মধ্যপ্রাচ্যগামী ৩৯টি ফ্লাইট গতকাল সোমবার এক দিনেই বাতিল হয়েছে। এই ফ্লাইটগুলোর দুবাই, বাহরাইন, কুয়েত ও কাতারে যাওয়ার কথা ছিল। ওমান, সৌদি আরবসহ অন্যান্য গন্তব্যে উড়োজাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। শনিবার দেশি-বিদেশি বিভিন্ন উড়োজাহাজ সংস্থার ২৩টি ফ্লাইট বাতিল হয়। পরদিন রোববার বাতিল হয় ৪০টি ফ্লাইট। সব মিলিয়ে গত তিন দিনে ১০২টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে।
একাধিক সবজি রপ্তানিকারক জানান, সৌদি আরবের জেদ্দা ও মদিনায় ফ্লাইট গেলেও রিয়াদে যাচ্ছে না। অথচ রিয়াদেই বেশি সবজি যায়। তা ছাড়া কাতার এয়ারওয়েজ ও এমিরেটস এয়ারলাইনসের ফ্লাইট স্থগিত হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন গন্তব্যে সবজি পাঠানো যাচ্ছে না। তবে যুক্তরাজ্য, ইতালির রোম ও কানাডায় বিমান বাংলাদেশের ফ্ল্যাট থাকায় দেশ তিনটিতে কিছু সবজি যাচ্ছে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ ফ্রুটস, ভেজিটেবল অ্যান্ড অ্যালায়েড প্রোডাক্টস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফভিএপিইএ) সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মনসুর প্রথম আলোকে বলেন, ‘শীতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে কিছু শাকসবজি উৎপাদন হয়। তবে গ্রীষ্মকালে তাদের উৎপাদন থাকে না বলে আমাদের সবজি রপ্তানি চার-পাঁচ গুণ বেড়ে যায়। সামনে ভরা মৌসুম আসছে। এমন সময় মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা আমাদের ব্যবসার জন্য বড় ধরনের দুশ্চিন্তার।’
মধ্যপ্রাচ্যের সমস্যা দীর্ঘায়িত না হলে বাংলাদেশের সবজি রপ্তানির বাজার টিকে থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেন মোহাম্মদ মনসুর। তিনি বলেন, ‘সবজি রপ্তানিতে আমাদের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ভারত। আকাশপথ বন্ধ থাকলেও তাদের জন্য কোনো সমস্যা নেই। কারণ মুম্বাই থেকে তিন দিনেই মধ্যপ্রাচ্যে পণ্য চলে যায়। আর আমাদের চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পাঠালে ২৫ দিন লেগে যায়। ফলে যুদ্ধ কবে বন্ধ হবে, সে অপেক্ষায় থাকা ছাড়া আমাদের কিছুই করার নেই।’