যশোর-খুলনার কুঁচিয়া যাচ্ছে চীন-তাইওয়ানে

— কুঁচিয়া ব্যবসায় ঘুরছে বহু মানুষের জীবিকার চাকা।
— বিপণনে বিক্রয়কেন্দ্র তৈরির উদ্যোগ নিচ্ছে মৎস্য বিভাগ।

কুঁচিয়াফাইল ছবি

যশোর ও খুলনা অঞ্চলের প্রাকৃতিক খাল-বিলের কুঁচিয়া এখন চীন, তাইওয়ানসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে। যশোরের অভয়নগর, মনিরামপুর ও চৌগাছা উপজেলায় এবং খুলনা-বাগেরহাট অঞ্চলে কুঁচিয়া শিকার করে এবং এই ব্যবসায়ে যুক্ত হয়ে লাখো মানুষ জীবিকা নির্বাহ করছেন। তাঁদের অনেকেই ইতিমধ্যে দারিদ্র্য কাটিয়ে স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছেন।

কুঁচিয়া রপ্তানিকারক বাবুল সরকার প্রথম আলোকে বলেন, ঢাকা থেকে নিয়মিত বিমানযোগে চীন ও তাইওয়ানে কুঁচিয়া রপ্তানি হয়। তবে দেশে এখনো কুঁচিয়ার বাণিজ্যিক চাষ সফল হয়নি। ফলে পুরো ব্যবসাই প্রাকৃতিক খাল-বিলের ওপর নির্ভরশীল। তাঁর ভাষ্য, কুঁচিয়া সম্ভাবনাময় একটি কৃষিপণ্য, যার বিদেশে কয়েক শ কোটি টাকার বাজার রয়েছে।

মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জীবন্ত কুঁচিয়া বিদেশে রপ্তানি হয়েছে ৮ হাজার ৪০৮ মেট্রিক টন, যার রপ্তানি মূল্য ৩৯৮ কোটি টাকা। এর আগের ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১৭ হাজার ৪৩৮ মেট্রিক টন রপ্তানি হয়, যার মূল্য ছিল ৯৯৩ কোটি ৭১ লাখ টাকা। এ ছাড়া ২০২২–২৩ অর্থবছরে রপ্তানি হয় ১২ হাজার ১০৮ মেট্রিক টন, যার রপ্তানি মূল্য ছিল ৬২০ কোটি টাকা।

অভয়নগর উপজেলার কচুয়া গ্রামের কুমার বৈরাগী একসময় কুঁচিয়া শিকার করে হাটবাজারে বিক্রি করে সংসার চালাতেন। সাত বছর আগে ১০ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে কুঁচিয়ার ব্যবসা শুরু করেন। বর্তমানে তাঁর বাড়িতেই রয়েছে কুঁচিয়া সংরক্ষণের হাউস। তিনি কুঁচিয়া সরবরাহ করেন খুলনার রূপসা ও ঢাকার কাঁকড়া-কুঁচিয়ার আড়তে। পাশাপাশি কুঁচিয়া প্রক্রিয়াজাত করে রান্নার উপযোগী করেও বিক্রি করেন।

কুমার বৈরাগী জানান, গত অর্থবছরে ১০০টি চালানের মাধ্যমে ১০ হাজার কেজি কুঁচিয়া পাইকারি বিক্রি করেছেন। খরচ বাদে লাভ হয়েছে তিন লাখ টাকার বেশি। গত পাঁচ বছরই তিনি লাভ করেছেন। লাভের টাকায় বসতভিটার সাত শতক জমির সঙ্গে আরও সাত শতক জমি কিনে প্রায় ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে আধা পাকা বাড়ি নির্মাণ করছেন।

৪৫ বছরের কুমার বৈরাগী জানান, বড় ছেলেকে নিয়ে আশপাশের অন্তত ৩০টি গ্রাম ঘুরে জীবিত কুঁচিয়া সংগ্রহ করে এনে বাড়ির সংরক্ষণ হাউসে রাখেন। পরে সুবিধাজনক সময়ে খুলনার রূপসা এলাকার মৃণাল কান্তি দের আড়তে পাঠান। কেউ চাইলে কুঁচিয়া কেটে রান্নার উপযোগী করেও দেন।

কুমার বৈরাগী জানান, গত বছর বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা নবলোক পরিষদ তাঁর বাড়ির আঙিনায় বিনা মূল্যে সংরক্ষণ হাউসটি নির্মাণ, কুঁচিয়া প্রক্রিয়াজাতকরণের উপকরণ ও প্রশিক্ষণও দিয়েছে।

নবলোক পরিষদের মৎস্য কর্মকর্তা তরুণ কুমার মোস্তফী প্রথম আলোকে বলেন, পল্লী কর্ম–সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) আর্থিক সহায়তায় একটি কর্মসূচির আওতায় কুমার বৈরাগীকে ব্যবসার উপকরণ দেওয়ার পাশাপাশি সংরক্ষণ হাউসের পানি নিয়মিত পরিবর্তন ও স্বাস্থ্যসম্মতভাবে কুঁচিয়া সংরক্ষণের বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। ফলে গত অর্থবছরে কুমার বৈরাগীর সবচেয়ে বেশি ব্যবসা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে অন্যদেরও একই ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে।

খুলনার রূপসা এলাকার নিউ মামা এন্টারপ্রাইজ আড়তের স্বত্বাধিকারী মৃণাল কান্তি দে বলেন, যশোরের অভয়নগর ও মনিরামপুর; খুলনার তেরখাদা এবং বাগেরহাটের চিতলমারিসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে কুঁচিয়া আড়তে আসে। সেখান থেকে ঢাকার রপ্তানিকারকদের কাছে বিক্রি করা হয়। পরে জীবন্ত অবস্থায় সেগুলো চীন, তাইওয়ানসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়।

মৃণাল কান্তি দে আরও জানান, গত বছর তিনি ১৫০ মেট্রিক টন কুঁচিয়া ঢাকার রপ্তানিকারকদের কাছে পাঠিয়েছেন। তাঁর ভাই প্রশান্ত কুমার দে ও বাবুল সরকার কুঁচিয়ার বড় রপ্তানিকারক।

জানতে চাইলে যশোর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মনিরুল মামুন বলেন, কুঁচিয়া অপ্রচলিত কৃষিপণ্য হলেও বিদেশে এটির চাহিদা রয়েছে। একটি প্রকল্পের আওতায় মনিরামপুর, অভয়নগরসহ বিভিন্ন মাছের বাজারে কুঁচিয়া বিক্রয়কেন্দ্র তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যাতে মৎস্যজীবীরা সহজে সেখানে কুঁচিয়া কেনাবেচা করতে পারেন।