রিয়াদ ইউসুফ গোল্ডম্যান স্যাকসের ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা অঞ্চলের উপপ্রধান। ২০১১ সালে তিনি ডয়চে ব্যাংক থেকে গোল্ডম্যান স্যাকসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে যোগ দেন।

ইউসুফের বেড়ে ওঠা বাংলাদেশে। তাঁর বাবা-মা দুজনেই শিক্ষক। তাঁর বয়স যখন ১৬, তখন তাঁরা বাবা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গবেষণা করার সুযোগ পান। তখন তিনিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে চলে আসেন। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আবেদন করতে করতে শেষমেশ মেইনের বেটস কলেজে গণিত ও পদার্থবিদ্যা পড়ার সুযোগ পান। পড়াশোনার জন্য বৃত্তি পেলেও অন্যান্য খরচ চালাতে তাঁকে সপ্তাহে ২০ ঘণ্টা কাজ করতে হয়।

তৃতীয় বর্ষে পড়ার সময় রিয়াদ বেশ ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন। চার বছর ধরে দেশে আসতে পারছিলেন না। তখন কেউ একজন তাঁকে বলেন, সেবারের গ্রীষ্মে নিউইয়র্কে একটা কাজের সুযোগ আছে, তাতে ১০ হাজার ডলার মিলবে। সেই প্রতিষ্ঠান ছিল মেরিল লিঞ্চ। তিনি সাক্ষাৎকার দিয়ে কাজও পেয়ে যান।

এরপর গ্রীষ্মকালীন ইন্টার্নশিপ করে তিনি ১৯৯৯ সালে মেরিল লিঞ্চের বন্ড ট্রেডিং ফ্লোরে পূর্ণকালীন কাজ পান। সেখানে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে তাঁকে। এর বিকল্পও ছিল না তাঁর সামনে, কারণ সেখানে ভালো করতে না পারলে দেশে ফেরত যেতে হবে, সেটা তাঁর অভিপ্রেত ছিল না।

তবে ফাইন্যান্সের জগতে কাজ করেও পরিবারের দিক থেকে বিদ্যায়তনে যাওয়ার চাপ ছিল রিয়াদের ওপর। তাঁর ভাষ্য, এটি সাংস্কৃতিক বিষয়, বাংলাদেশের বাবা-মায়েরা সন্তানকে চিকিৎসক, প্রকৌশলী বা শিক্ষক হিসেবে দেখতে চান, ঠিক ব্যাংকার হিসেবে দেখতে চান না। এমনকি অংশীদার হিসেবে পদোন্নতি পাওয়ার পর তাঁর মা প্রথমে ঠিক বুঝতে পারেননি, তিনি কোন পদ পেয়েছেন। পরে অবশ্য গুগল করে তাঁর মা বুঝতে পেরেছেন, এই পদের মাহাত্ম্য কী। এখন অবশ্য তিনি যারপরনাই খুশি ও গর্বিত।

ফাইন্যন্সিয়াল নিউজের কাছে রিয়াদের আক্ষেপ, ভারত ও পাকিস্তানের মতো বাংলাদেশে বিশ্বমানের আর্থিক বিষয় পড়ানোর মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই। ফলে বাংলাদেশি তরুণ-তরুণীরা যাঁরা ট্রেডিং ফ্লোরে কাজ করেন, তাঁরা অক্সফোর্ড ও কেমব্রিজে যেতে না পারার কারণে একধরনের পরিচয়সংকটে ভোগেন। কিন্তু বিষয়টি এভাবে দেখার দিন শেষ হয়ে আসছে বলেই মনে করেন তিনি।

রিয়াদ ইউসুফের মা নাগরিক প্ল্যাটফর্মের সমন্বয়ক ও সিপিডির সংলাপ ও যোগাযোগ বিভাগের সাবেক পরিচালক আনিসাতুল ফাতেমা ইউসুফ। সন্তানের এমন সাফল্যে স্বাভাবিকভাবেই তিনি উচ্ছ্বসিত। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘রিয়াদের এই পদোন্নতির খবর পাওয়ার পর অনেক মানুষ শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন। ভালো লাগছে। তবে এই পদের মাহাত্ম্য কী, তা প্রকৃতপক্ষে বুঝতে পারলাম ছেলের কথা শোনার পর, মানে বিশ্বের কোন কোন মানুষ ওকে শুভেচ্ছা জানিয়েছে, তা জানার পর।’

সন্তানের আর্থিক খাতে কাজ করা প্রসঙ্গে ফাতেমা ইউসুফ বলেন, ‘পরিবারের মধ্যে কেবল আমার ভাইয়ের ছেলে আর্থিক খাতে কাজ করে, ফলে এই জগৎ সম্পর্কে আমাদের ধারণা ছিল না বললেই চলে। সেই মেরিল লিঞ্চে ইন্টার্নশিপের খবরটা দেয়। মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে ওঠার কারণে আমার ছেলেও প্রথমে এই কাজে খুব একটা স্বস্তি পায়নি। আবার আমরাও চাপ দিচ্ছিলাম, যাতে সে অন্তত স্নাতকোত্তর করে। তখন সে বড় বড় তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করে। শেষমেশ রিয়াদ স্ট্যানফোর্ড থেকে এমবিএ করে। তখন সে চাকরি ছেড়ে চলে যায়। তারপর লন্ডনে গিয়ে ডয়চে ব্যাংকে যোগ দেয়। সেখান থেকে গোল্ডম্যান স্যাকসে যোগ দেয়।’

তবে বড় পদে নিয়োগ পাওয়া মানে দায়িত্বভার আরও বেড়ে যাওয়া, সে কথা রিয়াদ ইউসুফের সন্তানও বোঝে। ফাতেমা ইউসুফ জানান, রিয়াদের সন্তান ইতিমধ্যে জিজ্ঞাসা করেছে, ‘বাবা, এই পদোন্নতির কারণে কি তোমাকে আরও বেশি কাজ করতে হবে?’

পদোন্নতির খবর প্রকাশের কিছুদিন আগেই দেশে এসেছিলেন রিয়াদ ইউসুফ। বস্তুত, লন্ডনে ফেরার দুই দিন পরেই এই খবর পান তিনি। ফলে অল্পের জন্য এই সুখবর বাবা-মায়ের সঙ্গে উদ্‌যাপন করার সুযোগ পাননি তিনি। তাঁর বাবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও ইউজিসির সাবেক সদস্য মো. ইউসুফ আলী মোল্লা।

ফাইন্যান্সিয়াল নিউজের খবর, ২০২০ সালে মার্কিন পুলিশের হাতে খুন হন জর্জ ফ্লয়েড নামের এক কৃষ্ণাঙ্গ। এরপর থেকে সেই কলঙ্ক ঘোচাতে ও সমতা প্রতিষ্ঠায় অনেক কৃষ্ণাঙ্গ ও অশ্বেতাঙ্গ মানুষকে নিয়োগ দিয়েছে মার্কিন ব্যাংকিং ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, বৈচিত্র্য আনতে অশ্বেতাঙ্গ মানুষদের আরও ক্ষমতায়ন করতে আরও অনেক অশ্বেতাঙ্গ কর্মী নিয়োগ দিতে হবে।