নরসিংদীতে কাপড় উৎপাদন কমেছে

নরসিংদীতে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় পাঁচ হাজার বস্ত্রকল রয়েছে। এসব কারখানায় উৎপাদিত কাপড় সেকেরচর-বাবুরহাটের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যায়। তবে সাম্প্রতিক গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটের কারণে প্রতিটি কারখানা ভুগছে।

এ এলাকার শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, নরসিংদীতে প্রতিদিন ছয় থেকে আট ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। গ্যাসের সংকটও প্রকট। লোডশেডিংয়ের সময় উৎপাদন অব্যাহত রাখতে ডিজেলচালিত জেনারেটর চালানো হচ্ছে। এতে খরচ বাড়লেও পুরোদমে উৎপাদন হচ্ছে না। উৎপাদন অর্ধেকে নেমেছে। শ্রমিকদেরও আয় কমছে।

আবেদ টেক্সটাইল মিলের পরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, দিনে অন্তত ছয় ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। ফলে কারখানা এক শিফট বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এতে দিনের প্রায় অর্ধেকটা সময় কোনো উৎপাদনই হচ্ছে না। ফলে যাঁরা চুক্তিভিত্তিক কাজ করেন, তাঁদেরও মজুরিতে টান পড়েছে।

নরসিংদী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর ভারপ্রাপ্ত মহাব্যবস্থাপক আজিজুর রহমান বলেন, ‘সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে ঘোষণা দিয়েই পরিকল্পিত লোডশেডিং হচ্ছে। স্বাভাবিক সময়ে আমাদের বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ২০০ মেগাওয়াট। বর্তমানে আমরা বিদ্যুৎ সরবরাহ কম পাচ্ছি। তাতে ২০ বা ৩০ মেগাওয়াট লোডশেডিং হচ্ছে।’

গাজীপুরে বেশি কারখানা, বেশি সংকট

গাজীপুর মহানগরীর মালেকের বাড়ি এলাকায় স্ট্যান্ডার্ড সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের কারখানা। ১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই কারখানার তৈজসপত্র রপ্তানি হয়। কারখানার উৎপাদন কর্মকর্তা জিয়াউল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, বিদ্যুৎ এই আছে, এই নেই। লোডশেডিংয়ের কারণে ডিজেল কিনতেই মাসে ২০ লাখ টাকা খরচ বেড়ে গেছে। এভাবে খরচ বাড়তে থাকলে কারখানা চালানো কঠিন হবে।

গাজীপুরে চাহিদার তুলনায় বিদ্যুতের জোগানের ফারাক বেশি হওয়ায় স্ট্যান্ডার্ড সিরামিকের মতো জেলার অন্যান্য শিল্পকারখানার উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানা মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে।

গাজীপুরে মোট কারখানার সংখ্যা ২ হাজার ১৬৫। এর মধ্যে পোশাক কারখানা রয়েছে ১ হাজার ১৮৭টি। এ ছাড়া বেশ কিছু লাইসেন্সবিহীন কারখানাও রয়েছে। এখানকার কারখানার মধ্যে একটি বড় অংশই গ্যাসনির্ভর। তবে গ্যাসের চাপ কম থাকায় কয়েক মাস ধরেই কারখানাগুলোর উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

জেলার কাশিমপুর থানার বটতলা এলাকার এনএ নিটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটের কারণে আমাদের কারখানার উৎপাদন অর্ধেক কমে গেছে। গ্যাসের অভাবে ডাইং কারখানাগুলো সময়মতো কাপড় দিতে পারছে না। তা ছাড়া লোডশেডিং তো আছেই।’

গাজীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর আওতাধীন এলাকায় ১ নভেম্বর এক হিসাবে দেখা যায়, গাজীপুরের কড্ডা, টঙ্গী, জয়দেবপুর, কবিরপুর, ঘোড়াশাল গ্রিডে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ৩৬৭ মেগাওয়াট। তার বিপরীতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয় ১৮৭ মেগাওয়াট। আর লোডশেডিং দিতে হয়েছে ১৮০ মেগাওয়াট। বর্তমানে গড়ে ৪৯ দশমিক ৪ শতাংশ লোডশেডিং হচ্ছে, জানান গাজীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর মহাব্যবস্থাপক যুবরাজ চন্দ্র পাল।

গাজীপুর তিতাসের ব্যবস্থাপক (সিস্টেম অপারেশন) মো. রেদানুজ্জামান রেদওয়ান বলেন, গাজীপুরে প্রতিদিন যে পরিমাণে গ্যাসের চাহিদা থাকে, সে অনুযায়ী পাওয়া যায় না। এ কারণে গ্যাসনির্ভর কারখানাগুলোতে গ্যাসের চাপ কম। বর্তমানে গাজীপুরে ৬৩ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। তার বিপরীতে পাওয়া যাচ্ছে ৪০ কোটি ঘনফুট। তিনি দাবি করেন, কারখানাগুলোতে গ্যাসের সরবরাহ কখনোই বন্ধ থাকে না। তবে গ্যাস কম পাওয়ার কারণে চাপ কম থাকে।

চামড়াশিল্প নগরী সংকটে

চামড়াশিল্প নগরীতে বর্তমানে ১৪২টি ট্যানারি উৎপাদনে রয়েছে। এসব ট্যানারিতে প্রতিদিন ১২ মেগাওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। ট্যানারির মালিকদের দাবি, বর্তমানে এ শিল্পনগরে চার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে।

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সাধারণ সম্পাদক মো. সাখাওয়াত উল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, ‘সাধারণত কোরবানির ঈদের সময় ৬০ শতাংশ চামড়া প্রক্রিয়াজাত করা হয়। এরপর ক্রেতাদের সঙ্গে চুক্তিপত্র ও ঋণপত্র (এলসি) করা হয়। এখন এসে আমাদের বিদ্যুতের সংকটের মুখে পড়তে হচ্ছে। তিন দিন ধরে অবস্থা একটু ভালো। তিন দিন আগে লোডশেডিং হতো ছয়-সাত ঘণ্টা। এতে উৎপাদন কমে ২০ শতাংশে চলে এসেছে।’

গ্যাসের অভাবে কারখানা বন্ধ নারায়ণগঞ্জে

নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার টোটাল ফ্যাশনে কাজ করেন ২ হাজার ১০০ শ্রমিক। লোডশেডিংয়ের কারণে প্রতিষ্ঠানটির পোশাক উৎপাদন অর্ধেকে নেমেছে। অন্যদিকে গ্যাস-সংকটে দুই মাস ধরে ডাইং কারখানা বন্ধ। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক (প্রশাসন) কবীরুল ইসলাম বলেন, গ্যাসের চাপের ১৫ পিএসআই পাওয়ার কথা থাকলেও, পাচ্ছি শূন্য। এ কারণে দুই মাস ধরে ডাইং কারখানা বন্ধ। এতে প্রতি মাসে দুই কোটি টাকা লোকসান হচ্ছে।

নারায়ণগঞ্জে পোশাক কারখানাসহ শিল্পকারখানা রয়েছে ১ হাজার ৭৮৫টি। এসব প্রতিষ্ঠানে মোট সাত লাখ শ্রমিক কাজ করে। জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলায় বর্তমানে প্রতিদিন তিন থেকে চারবার বিদ্যুতের লোডশেডিং হচ্ছে। অন্যদিকে পঞ্চবটী বিসিক শিল্পনগরীতে ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের আগে ছয়-আট ঘণ্টা লোডশেডিং হলেও সেটি বর্তমানে কমে চার-পাঁচ ঘণ্টায় দাঁড়িয়েছে। বন্দর উপজেলায় গ্যাস-সংকটে কারখানা বন্ধের ঘটনাও আছে। ফতুল্লায় অবশ্য রাতে ৮-১০ ঘণ্টা কারখানা চালাতে পারছেন উদ্যোক্তারা।

চাহিদার বিপরীতে গ্যাসের সরবরাহ কম থাকাকে সংকট বলে জানিয়েছেন তিতাস গ্যাস নারায়ণগঞ্জের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মামুনুর রশিদ। তিনি বলেন, ‘জেলায় গ্যাসের চাহিদা আট কোটি ঘনফুট। তার বিপরীতে পাচ্ছি গড়ে ৬ কোটি ৮০ লাখ ঘনফুট।’

ভালুকায় চাহিদার তুলনায় অর্ধেক বিদ্যুৎ

ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলায় ছোট-বড় প্রায় ৩৫০ কারখানা রয়েছে। এ এলাকায় দিনে ৮-৯ ঘণ্টা বিদ্যুৎ মিলছে না বলে জানান উদ্যোক্তারা। তাঁরা জানান, লোডশেডিংয়ের কারণে কারখানার উৎপাদন কমেছে ৩০-৪০ শতাংশ।

শেফার্ড গ্রুপের উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) মো. মোকলেসুর রহমান জানান, লোডশেডিংয়ে কারণে খুবই সমস্যা হচ্ছে। উৎপাদন কমে গেছে ৩০ শতাংশ। লোডশেডিংয়ের কারণে ডিজেল দিয়ে উৎপাদন ধরে রাখতে প্রায় প্রতিদিন ১ লাখ ২০ হাজার টাকা বাড়তি খরচ হচ্ছে।

ইকরাম সোয়েটার নামের আরেক কারখানার কর্মকর্তা মিলন বালা বলেন, লোডশেডিংয়ের সময় বাড়তি খরচ কমাতে প্রতিদিন রাতে ১ হাজার ২০০ এবং দিনে ৬০০ মেশিন বন্ধ রাখা হচ্ছে। তাতে উৎপাদন কমেছে ৩৫ শতাংশ।

[প্রতিবেদনটির জন্য তথ্য দিয়েছেন প্রণব কুমার দেবনাথ, নরসিংদী; মাসুদ রানা, গাজীপুর; মজিবুল হক, নারায়ণগঞ্জ; মাহমুদুল হাসান, ভালুকা এবং প্রতিনিধি, সাভার]