ইয়াসিন স্টোরের ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ আরমান বলেন, দুই সপ্তাহ ট্রাকটি কারখানার সামনে অপেক্ষায় থাকায় প্রতিদিন ট্রাকের ভাড়া বাবদ গুনতে হয়েছে দুই হাজার টাকা। আর ট্রাক যেদিন চিনি নিয়ে ফিরেছে, সেদিন ভাড়া দিতে হয়েছে আরও সাত হাজার টাকা। আনুষঙ্গিক অন্যান্য খরচ মিলিয়ে এক ট্রাক চিনি পেতে গত ১৪ দিনে খরচ করতে হয়েছে ৪০ হাজার টাকার মতো। পরিস্থিতি এমন যে চিনি তো নেই, আর চিনি পেলেও সেখানে ব্যবসা নেই।

তাহলে ব্যবসা টিকবে কীভাবে, এমন প্রশ্নের জবাবে মোহাম্মদ আরমান বলেন, এখন তবু বাজারে কয়েকটি দোকানে চিনি পাওয়া যাচ্ছে। কয়েক দিন আগে বাজার ছিল একেবারে চিনিশূন্য। মূলত, মিল থেকে চিনি না পাওয়ার ফলে বাজারের এই অবস্থা তৈরি হয়েছে। কয়েক দিন আগে প্রতি বস্তা (৫০ কেজি) চিনির দাম উঠেছিল ৫ হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত। তবে এখন পরিস্থিতি কিছুটা ভালোর দিকে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

গতকাল মৌলভীবাজারের পাইকারি চিনির বাজার ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ দোকানে চিনি নেই। হাতে গোনা কয়েকটি দোকানে কয়েক বস্তা চিনি আছে। ইয়াসিন স্টোরের মতো দু-একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বহুদিন অপেক্ষার পর চিনি পেয়েছে। তবে দাম বেশি। সরকার খুচরা পর্যায়ে প্রতি কেজি খোলা চিনির দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে ৯০ টাকা। তবে মৌলভীবাজারের ব্যবসায়ীরা জানালেন, এ দামে তাঁদের পক্ষে চিনি বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না।

মৌলভীবাজারে গতকাল প্রতি বস্তা খোলা চিনি বিক্রি হয়েছে ৪ হাজার ৯০০ টাকা থেকে ৫ হাজার টাকার মধ্যে। আর লাল চিনি বিক্রি হয়েছে প্রতি বস্তা ৫ হাজার ২০০ টাকা থেকে ৫ হাজার ৩০০ টাকায়। তবে কয়েকজন বিক্রেতা বলেন, চিনির দাম এখন ঘণ্টায় ঘণ্টায় পরিবর্তিত হচ্ছে। বাজারদর বলতে এখন কোনো কথা নেই, যে যার কাছ থেকে যেভাবে পারছে, চিনির দাম বাড়িয়ে রাখছে।

তবে চিনির দাম নিয়ে পাইকারি ক্রেতা বা বিক্রেতা কারও তেমন কথা নেই। চিনি পাওয়াটাই এখন তাদের কাছে বড় চ্যালেঞ্জের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজধানীর মিটফোর্ড এলাকার রাফিদ বেকারির কর্মচারী আমিনুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘চিনি না পাওয়ায় আমরা উৎপাদন করতে পারছি না। এর আগে একদিন এসে চিনি না পেয়ে ফিরে গিয়েছিলাম। আজ এসে অবশ্য চিনি পেয়েছি। তবে চিনির দাম বেড়ে যাওয়ায় বেকারি পণ্যের উৎপাদন খরচও বেড়ে গেছে।’

ঘুরতে ঘুরতে মৌলভীবাজারের ভেতর এক দোকানে গিয়ে দেখা গেল, চেয়ার–টেবিল পেতে বসে আছেন এক ব্যক্তি। দোকান ফাঁকা। পরে জানা গেল তিনি চিনি ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ফজলুর রহমান। মেসার্স ফজলুর রহমান এন্টারপ্রাইজের মালিক। কথা বলতে চাইলে খুব একটা আগ্রহ দেখালেন না। তবে দোকানে বসতে বলে কিছু ব্যবসায়িক কাজ সেরে অনেকক্ষণ পর মুখ খুললেন।

ফজলুর রহমান বলেন, ‘দোকানে চিনি নেই বেশ কয়েক দিন হলো। পণ্য বেচাকেনার সময় অনেক সময় হুট করে বড় কোনো ক্রেতা পেয়ে গেলে দোকান এমন খালি হয়। তখন নিয়মিত ক্রেতাদের অন্যদের থেকে চিনির ব্যবস্থা করে ক্রেতা ধরে রাখার কাজটা করি। এটা এখানে খুব সাধারণ অনুশীলন। তবে এবার এতটাই সংকট যে কারও থেকে চিনি ধার করে এনে বিক্রি করার অবস্থাও নেই। কারণ, অধিকাংশ ব্যবসায়ীর গুদামে কোনো চিনি নেই। এ জন্য অলস বসে থেকে সময় কাটছে।’

তবে বাজারে চিনির সরবরাহের চেষ্টায় ঘাটতি নেই উল্লেখ করে চিনি উৎপাদনকারী শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের (এমজিআই) জ্যেষ্ঠ মহাব্যবস্থাপক এস এম মুজিবুর রহমান বলেন, জ্বালানিসংকটের মধ্যেও যে পরিমাণ চিনি উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে, তার পুরোটাই সরবরাহ করা হচ্ছে।

বাজারে চিনির সংকট মেটাতে কয়েক দিন ধরে রাজধানীতে মেঘনাসহ চারটি শিল্প গ্রুপ নিজেদের গাড়িতে করে চিনি বিক্রি শুরু করেছে। অপর তিন শিল্প গ্রুপ হলো সিটি গ্রুপ, আবদুল মোনেম ও দেশবন্ধু গ্রুপ। রাজধানীর বেশ কয়েকটি এলাকায় গাড়িতে করে এসব শিল্প গ্রুপ প্যাকেটজাত চিনি বিক্রি করছে সরকার নির্ধারিত ৯৫ টাকা কেজি দরে।

সংকট কাটাতে সরকারি প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশও (টিসিবি) এক সপ্তাহ ধরে রাজধানীতে ট্রাকে করে চিনি বিক্রি করছে। সংস্থাটি প্রতি কেজি চিনি ৫৫ টাকা ভর্তুকি দামে বিক্রি করছে। সংস্থাটির মুখপাত্র মোহাম্মদ হ‌ুমায়ূন কবির বলেন, গত সাত দিনে এক লাখ টনের বেশি চিনি বিক্রি করেছে টিসিবি।

এদিকে টিসিবির বাজারদর অনুযায়ী, রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে এখন প্রতি কেজি চিনি বিক্রি হচ্ছে ১১০ থেকে ১১৫ টাকায়। এক সপ্তাহে দাম বেড়েছে কেজিতে ১০ থেকে ১৫ টাকা। সব মিলিয়ে এক মাসে চিনির দাম বেড়েছে প্রায় ২০ শতাংশের মতো।

বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের (বিটিটিসি) হিসাবে, দেশে বছরে চিনির চাহিদা ১৮ থেকে ২০ লাখ মেট্রিক টন। বর্তমানে সিটি, মেঘনা, এস আলম, আবদুল মোনেম ও দেশবন্ধু—পাঁচ গ্রুপের কাছে অপরিশোধিত চিনির মজুত আছে দেড় লাখ টনের মতো। আমদানির অপেক্ষায় আছে ৩ লাখ ৩০ হাজার টন।